Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১৩
না গণমিছিল নয়, রাজপথে মৃত্যুর মিছিল
লে. জে. মাহবুবুর রহমান (অব.)
না গণমিছিল নয়, রাজপথে মৃত্যুর মিছিল

বিষয়টি নিয়ে বড় কোনো আন্দোলন হয়নি। বড় একটা আলোচনা, গোলটেবিল, সেমিনার, মতবিনিময়ও হয়নি।

বিষয়টি মৃত্যুর। জীবন হরণের। মৃত্যু তো কোনো কৌতুক নয়। কবির ভাষায়, ‘নহে নহে নহে। এ নহে কৌতুক’! পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া, হঠাৎ অদৃশ্যে বিলীন হয়ে যাওয়া এসব তো মারাত্মক কথা। কবি লিখেছেন,

Any man ‘s death diminishes me 

Because I am involved in mankind

So, don’t send to know for whom the bell tolls

It tolls for thee. 

এমন হয়ে গেছে বাংলাদেশে মৃত্যু এখন কোনো ঘটনাই নয়। মানব হত্যা যেন মনে হয় কোনো ব্যাপারই নয়। এটা কাউকে এতটুকুও বিচলিত করে না, কেউ এতটুকুও উদ্বিগ্ন হয় না। কাউকে দুঃখও দেয় না। কোনো মৃত্যুই কাউকে এতটুকুও diminish করে না। ক্ষয় আনে না। না, আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা বলছি না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে, প্লাবনে, ভূমিকম্পে, ঝড়-তুফানে মৃত্যুর কথা বলছি না। রোগ ও শয্যাশায়িত মানুষের মৃত্যুর কথা, তাও বলছি না। আমি বলছি আকস্মিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, চলতে ফিরতে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর ঘটনা, যা মুহূর্ত আগেও মৃত ব্যক্তি ভাবেনি। পরিজনরা, আত্মজনরাও ভাবেনি। হঠাৎ করে যেন জীবন প্রদীপ দমকা হাওয়ায় নিভে গেল। আমি রাজপথে মানুষের মৃত্যুর কথা বলছি। বাসে, ট্রাকে, গাড়িতে সড়কে, রাজপথে মানুষের মৃত্যু। নৌকায়, লঞ্চে, স্টিমারে নদীতে মৃত্যু, সাগরে মৃত্যু। এ তো নিত্য হয়েই চলেছে। এই তো গত ১৫ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত অ্যাম্বুলেন্স শিশু-গর্ভবতী মহিলাসহ চারজনকে মেডিকেল কলেজের গেটে পিষে মেরে ফেলে। প্রতিদিন এত মৃত্যু, এত বড় মৃত্যু মিছিল। আমরা জানি না, জানতেও চাই না, নির্লিপ্ত উদাসীন। নির্লিপ্ত উদাসীন পৃথ্বী। যার মৃত্যু হলো সে তো চলেই গেল। সে তো সব জানার অতীতে চলে গেল। জানে তার স্বজনরা। জানে তার পরিজনরা। জানে সে মা যার কোল খালি হলো। জানে সে পত্নী যে বিধবা হলো। মর্মান্তিক সব দৃশ্য। জলজ্যান্ত মানুষ মুহূর্তের মধ্যেই স্তব্ধ হয়ে গেল। হয়তোবা পা হারাল, হাত হারাল। জীবন যারা হারাল তারা তো বেঁচেই গেল। যারা হারাল না তারা তো পঙ্গু হয়ে সারা জীবনটাই হারাল। ধুঁকে ধুঁকে একদিন মরে গেল। এ মৃত্যু আরও মর্মান্তিক, আরও বেদনাদায়ক, আরও নির্মম।

আজ বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল চলছে। দেশের প্রতিটি পথ, রাজপথ মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এগুলো সব death trap। গোটা বাংলাদেশটাই একটা বড় মৃত্যুপুরী। লাশ আর লাশ, পথেঘাটে, বাটে, নদীতে, সাগরে সর্বত্র মানুষের লাশ, মহিলার লাশ, কিশোর-কিশোরীর লাশ, শিশুর লাশ। লাশ লাশ আর লাশ।

সিনেমা অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন মাঝে মাঝে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয় নিয়ে মিডিয়ায় আসেন, সমবেদনা জানান, প্রতিবাদ করেন। টিভি চ্যানেলে দেখি। তিনি তার প্রিয়তমা পত্নীকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন। পরিচালক আলমগীর কবির, মিশুক মুনির, তারেক মাসুদ এরা প্রতিশ্রুতিশীল মেধাসমৃদ্ধ মানুষ। এরা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে চিত্র জগৎ থেকে, পৃথিবী থেকে। কে জানে হয়তো এরাই বাংলাদেশের জন্য সিনেমা জগতের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অস্কার নিয়ে আসত। বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের একজন সফল অর্থমন্ত্রী আমার প্রিয় মানুষ সাইফুর রহমানও ঢাকা-সিলেট সড়কে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আমার প্রিয় শিক্ষক বুয়েটের ভাইস চ্যাঞ্জেলর প্রফেসর ড. রশিদও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এমনি আরও অনেক বরেণ্য খ্যাতনামা ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছেন।

এখন নিজের কথা বলছি। আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম, সঙ্গে আমার স্ত্রীও প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। মাত্র চার মাস আগের কথা। এখনো আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটি। চার মাস শয্যাশায়ী ছিলাম। না কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হইনি। আমি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সিএমএইচে এখনো চিকিৎসা নিচ্ছি। আমি নির্দোষ। তেমনি নির্দোষ আমার গাড়ি, আমার ড্রাইভার। তাদের কোনো অপরাধ ছিল না। আমার অপরাধ আমি আমার নিজের গাড়িতে বসেছিলাম। আমি আমার বাড়ি দিনাজপুর থেকে ঢাকা ফিরছি। শহর থেকে ১০ মাইল দূরে প্রশস্ত হাইওয়েতে হঠাৎ ভীষণ ধাক্কা খেয়ে আমার গাড়িটি ভেঙে তছনছ হয়। এক মহিলা এসে প্রচণ্ড বেগে আচড়ে পড়ে, head on collision। মহিলার কথা বললাম। না কোনো মনুষ্য মহিলা নয়। মহিলা নামধারী এক যানবাহন। নাম তার নসিমন। সে ছিল লোহা লক্কড়ে বোঝাই। আমি জ্ঞান হারাই। দীর্ঘক্ষণ অজ্ঞান থাকি। আমাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা সিএমএইচে তাত্ক্ষণিক ইভাকুয়েট করা হয়। মস্তিষ্কে আঘাত পাই। হেড ইনজুরি। আমি সিএমএইচের আইসিইউতে দীর্ঘদিন থাকি। সেনাবাহিনীর ডাক্তারদের চিকিৎসা ও পরিচর্যায় আরোগ্য লাভ করি। চার মাস অতিবাহিত। এখনো চিকিৎসা চলছে। প্রতিদিন সিএমএইচে আমাকে থেরাপি নিতে হয়। আমি বেশ দীর্ঘদিন হুইল চেয়ারে আসীন ছিলাম। বিষয়টি খারাপ লেগেছে। একজন জেনারেল। একজন সেনাবাহিনী প্রধানকে এটা মোটেও মানায় না। এমন লাচার তো হওয়া যায় না। লোকচক্ষুর দৃষ্টিতে এমন প্রকাশিত হওয়া চলে না। হাসপাতালের ডাক্তাররা আমাকে ক্রাচ হাতে ধরিয়ে  দেয়। লাঠি এগিয়ে দেয়। প্রায় চার মাস ধরে তাই নিয়ে আছি। কিন্তু মানতে পারছি না। আমার মা একশ বছরেরও বেশি বয়স। আল্লাহ তাকে আরও দীর্ঘজীবী করুক। আমাদের আশীর্বাদ হয়ে আমার পরম স্নেহময়ী মা, মা জননী আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুক। এই তো কয়েকদিন আগেও তার হাতে জোর করেও আমি লাঠি ধরাতে পারিনি। সে বলে আমি হাতে লাঠি নেব না। প্রয়োজনে তোমার কাঁধে ভর দিব। চাকাওয়ালা চেয়ারে সে বসেনি। তারই সন্তান আমি। সৈনিক সন্তান। একি করুণ অবস্থা আমার!

যোগাযোগমন্ত্রীকে মাঝে মাঝে বাসে আরোহী হিসেবে টেলিভিশনে দেখি। অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য ভালো কথা। কিন্তু রাস্তা ঠিক হয় না কেন? গাড়ি চালকরা পাগলের মতো গাড়ি চালায় কেন? আর তাদের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। শুনেছি,  এক  মন্ত্রী বলেছিলেন, গাড়ি চালাতে লাইসেন্স লাগে না। ড্রাইভার হতে মানুষ আর গরু চিনলেই হয়। কী দারুণ কথা। মারাত্মক উক্তি। বিদেশে একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে দীর্ঘ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। শক্ত পরীক্ষা দিতে হয়। তার aptitude, তার uptake, reaction time, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করা হয়, পরীক্ষা করা হয়। মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞ ও সাইকোলজিস্টদের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়। চালক হিসেবে যে গ্রহণযোগ্য নয় সে সারা জীবনেও ড্রাইভিং লাইসেন্স পায় না। প্রশিক্ষিত শোফার ড্রাইভার নিয়োগ করে।

বাংলাদেশের প্রতিটি বাস চালক, ট্রাক চালক, ভীষণ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাদের ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, আহার নেই। ২৪ ঘণ্টা, ৩৬ ঘণ্টা, ৪৮ ঘণ্টা একনাগাড়ে গাড়ি চালায়। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বসে থাকে। শরীর ছেড়ে দেয়, ক্লান্তিতে ঘুম চলে আসে। এমনও শুনেছি দায়িত্বজ্ঞানহীন অনেক চালক একটা ইট অথবা ভারী বস্তু এক্সলেটরে রেখে দেয় আর পা দুটো সিটের ওপরে তুলে নিদ্রা যায়। বাস, ট্রাক, নসিমন, করিমন, সমিরন, সালেহা, মালেকা সবারই এক এবং অভিন্ন চিত্র।

আইনের শাসন নেই। Free road, free for everything। অবারিত রাজপথ, উন্মুক্ত সবকিছুর জন্য। রাজপথে হাট বসে, বাজার বসে, রাজনীতির সভা হয়, সম্মেলন হয়, কৃষকরা ধান মেলে দেয়, খড় শুকায়, দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়। বাস, ট্রাক ও ভারী যানবাহনগুলো মনে হয় যেন যুদ্ধক্ষেত্রে চলমান ট্যাংক। চালক বলছে আমি মরণযান। আসছি। সবাই তফাৎ যাও। রাস্তা ছাড়। এটা একমাত্র আমার। একচ্ছত্র আমার। না মানলে তোমরা চিড়া চ্যাপ্টা হয়ে যাবে, চুরমার হয়ে যাবে।

আমরা এসব থেকে পরিত্রাণ চাই। বৈধ যানবাহন চাই। ফিট গাড়ি চাই। বৈধ লাইসেন্সধারী, যোগ্য চালক চাই। বালক চালক চাই না। রাস্তার সংস্কার চাই। ভালো সড়ক চাই। ভালো রাজপথ চাই। যুদ্ধের সময় রোড ডিনায়াল একটা অপরিহার্য যুদ্ধ কৌশল। শত্রুর আক্রমণের আগে রাজপথগুলোকে এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে তছনছ করা হয়। ব্রিজ ধ্বংস করা হয়। রোড ব্লক দেওয়া হয়। রাজপথকে চলাচলের সম্পূর্ণ অযোগ্য করা হয়। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে আমরা এখন কেন এসব করছি। তাহলে কি দেশে শত্রু অভিযান আসন্ন?

একটি বিশেষ মানব গোষ্ঠীকে, একটি গোত্রকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার যে সহিংস হত্যাকাণ্ড তাকেই গণহত্যা (genocide) বলা হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চে তাই হয়েছিল। পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানি মিলিটারি শাসকরা হত্যাযজ্ঞ সৃষ্টি করেছিল অপারেশন সার্চলাইট নামে। সব বস্তিবাসী, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসে কামান চালানো হয়, ট্যাংক চালানো হয়, হাজার হাজার মানুষ হত্যা করা হয়, সেটা ছিল genocide। সেটা ছিল গণহত্যা। আর তা ৯ মাস ধরে চলেছিল। বাংলাদেশের শহরে বন্দরে, পথেপ্রান্তরে, গ্রামেগঞ্জে, অব্যাহতভাবে চলেছিল। দেশের দামাল ছেলেরা, সেনাবাহিনীর সৈনিকরা, বিডিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনীর সদস্যরা গণহত্যার প্রতিশোধ নেয়। রক্তক্ষয়ী দীর্ঘ যুদ্ধ করে। দেশকে স্বাধীন করে।

আমি রাজপথের এই লাশের মিছিল, দেশজুড়ে যে মৃত্যুপুরী, প্রতিদিন প্রতিরাত্রি প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার নামে এই যে হত্যা হয়েই চলেছে এটাকে কী বলব? আক্ষরিক অর্থে এটাও তো গণহত্যা, জনহত্যা, মানবহত্যা। এটাও তো মহাঅপরাধ। মানবতাবিরোধী অপরাধ এক অর্থে। প্রত্যেক অপরাধেরই বিচার হয় এবং বিচার হয় এই পৃথিবীতেই। অপরাধীর জীবদ্দশায়। Every crime is punished and punished in this very world. কালজয়ী রুশ সাহিত্যিক দস্তভয়েস্কি তার অমর উপন্যাস crime and punishment উপন্যাসে এমন সব কথাই লিখেছেন।

অগণিত মানুষের নিত্যনিয়ত নিহত হওয়ার যে বিশাল ঘটনাপঞ্জি, বেশুমার এমন অন্যায় হত্যা অন্যায় মৃত্যু। দায়ী কে? দায়ী কারা? চরম দায়িত্বহীন, কর্তব্যে জ্ঞানহীন চালকরা? অর্থলোভী বাস, ট্রাকের মালিকরা? দায়ী কি নয় সঙ্গে জড়িত সরকারের কর্তব্যরত বিভাগ কর্মচারীরা, কর্মকর্তারা, মন্ত্রণালয়ের উঁচু আসনে অধিষ্ঠিত আমলারা, সরকারের ড্রাইভিং সিটে আসীন রাষ্ট্র চালকরা? এদের বিচার কে করবে? এদের বিচার কারা করবে? কবে করবে? নাকি আল্লাহর বিচারের জন্য কেয়ামতের অপেক্ষায় আমাদের থাকতে হবে? আল্লাহর বিচার তো নিশ্চয়ই আছে। এটা অবধারিত সত্য। তার থেকে কারও পরিত্রাণ নেই। তবে কি দস্তভয়েস্কি crime and punishment এ wrong lesson দিয়ে গেছেন? বলে গেছেন আমাদের ভুল কথা?

লেখক : সাবেক সেনাপ্রধান

এই পাতার আরো খবর
up-arrow