Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১৫
শেখ হাসিনার কথা বলছি
শফী আহমেদ
শেখ হাসিনার কথা বলছি

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের পরাজিত শক্তির নীলনকশায় এবং দলের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতালিপ্সু কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নৃশংসভাবে সপরিবারে নিহত হন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সামরিক শাসনের জাঁতাকলে বাঙালি জাতি নিষ্পেষিত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতেগড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উপদলীয় কোন্দলে জর্জরিত হয় এবং একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়ে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দলের নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বজনহারা বাংলায় আওয়ামী লীগের হাল ধরেন, এরপর একে একে কেটে গেল ৩৫ বছর। শেখ হাসিনা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত মোকাবিলা করে আজ উঠে এসেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। বাঙালি জাতিকে ভিখারির জাতি থেকে উঠিয়ে দিয়েছেন উন্নয়নের মহাসোপানে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শুধু নিজ দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। কীভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন, আমরা সে আলোচনায় আসি।

দেশ ও মানুষের জন্য তার চ্যালেঞ্জের সাফল্য তাকে দেশের মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক দুনিয়াতেও প্রবল আত্মবিশ্বাসের জায়গায় উঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-সামরিক শাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র মুক্তি। ১৯৮১ সালে খুনি জিয়া খুন হয়ে যান এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে। প্রতিষ্ঠিত হয় একেবারেই দুর্বল, ষড়যন্ত্রকারীদের ক্রীড়নক বিচারপতি ছাত্তারের পুতুল সরকার। সেই সরকারকে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হয়ে সামরিক শাসন জারি করে। জাতির বুকে আবারও চেপে বসে সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক ছাত্র-গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হয়। এ আন্দোলন সংগ্রামে শেখ হাসিনার দূরদর্শী অবিচল নেতৃত্ব জনগণকে গণতন্ত্র মুক্তির পথ দেখায়।

১৯৯১ সালে তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা হয়। স্বাধীনতার পরাজিত শক্তির সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। নব্বইয়ের আন্দোলনের সব অর্জন বিএনপি সরকার জলাঞ্জলি দেয়। কিন্তু আমাদের নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই অব্যাহত রাখেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত মেয়াদে সরকারের উল্লেযোগ্য সাফল্য হচ্ছে ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করা এবং জজ আদালতে এর বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন করা।

কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য এই যে, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ২০০১ সালে নীলনকশার নির্বাচনে পুনরায় বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতাসীন হয়। বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান হাওয়া ভবন খ্যাত বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে তুলে দেশের মানুষকে এক অবর্ণনীয় দুর্যোগের মধ্যে ফেলে দেয়। ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার জন্য বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে সংবিধান সংশোধন করা হয়। এর বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, চৌদ্দ দল, মহাজোট, তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে। এ প্রেক্ষাপটে ইয়াজউদ্দীন সরকারকে হটিয়ে সেনা সমর্থিত মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার গঠিত হয়। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে বাধা দেয়, কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে জনগণের টানে দেশে ফিরে আসেন। এরপর তাকে কারান্তরীণ করা হয়। জনগণের আন্দোলনের চাপে সেনা সমর্থিত সরকার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়ে, ২০০৮ সালে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত বক্তব্য অনুযায়ী একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় যা এখনো অব্যাহত আছে। কোনো কোনো বিচারের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং রায় কার্যকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা সর্বোচ্চ আদালত থেকে রায় হওয়ার পর হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে সমুদ্র-বিজয় সম্ভব হয়েছে, দেশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুলে দিয়েছেন উন্নয়নের মহা-সোপানে। কিন্তু ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিয়ে আগুন সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে দেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দেয় যা ২০১৪ সালে অব্যাহত ছিল। সারা বিশ্বে আল-কায়েদা, নব্য সন্ত্রাসী আইএস ও বিভিন্ন নামে যে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, এ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে যা কিনা সারা বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্য ঈর্ষণীয়। সদ্য সফরকারী চীনা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, বিভিন্ন স্মারক ও ২৭টি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে এসেছেন। এ সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেন। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য হয়। বাংলাদেশ এক চীন নীতির প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন ঘোষণা করে।

জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলার জনগণের নেত্রী নন, সারা বিশ্বেও সমাদৃত সফল রাষ্ট্রনায়কদের একজন। এ জন্যই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অপ্রতিরোধ্য এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

লেখক : কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতা

এই পাতার আরো খবর
up-arrow