Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৩৬
বায়তুল মোকাররমের খুতবা
ইসলাম প্রচারে সাহাবাদের অবদান
মুফতি এহসানুল হক জিলানী পেশ ইমাম, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল হিসেবে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন। তৎকালীন সময়ে বিদ্যমান এবং অনাগত ভবিষ্যতে দুনিয়ার শেষ দিনটি পর্যন্ত সমস্ত মানব জাতির হিদায়াত ও একত্ববাদ প্রচার-প্রতিষ্ঠার জন্যই তাকে আল্লাহপাক বিশ্বনবী হিসেবে প্রেরণ করেন।

ইসলামের বিধি-বিধান ও শরিয়তের আহকামসহ মানব জাতির সামগ্রিক প্রয়োজনের দিক-নির্দেশনা প্রদানের জন্য মহানবী (সা.)-এর কাছে নাজিল করেন মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। নবুওয়ত লাভের পর দীর্ঘ ২৩ বছরে মোট ২৪ হাজার বার আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে হজরত জিব্রাইল (আ.) পবিত্র কোরআনে বাণী নিয়ে নবী করিম (সা.)-এর কাছে আগমন করেন। সমগ্র কোরআন মজিদ তথা ইসলামের সমস্ত আহ্বান ও বিধি-বিধান মূলত রসুলে করিম (সা.)-এর কাছে নাজিল হয়েছে। কোরআনে কারিমে হজরত রসুলে করিম (সা.)-কে উদ্দেশ করে আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম ওহি নাজিল করেন— পাঠ কর তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক (রক্তপিণ্ড) থেকে। পাঠ কর আর তোমার প্রতিপালক মহা মহিমান্বিত যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা আলাক, আয়াত ১-৫)।

এই পাঁচটি আয়াতে আল্লাহতায়ালা প্রথমেই পড়ালেখা করা এবং মানব সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে জানার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। অর্থাৎ পবিত্র কোরআন পাঠ করার মাধ্যমে সৃষ্টির অনেক অজানা রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আল্লাহতায়ালা এ আয়াতসমূহে নির্দেশ দিয়েছেন।

কোরআন মজিদ নাজিলের সময় হজরত জিব্রাইল (আ.)-এর কাছ থেকে শ্রবণ করার সঙ্গে সঙ্গে হজরত নবী করিম (সা.)-এর মুখস্থ হয়ে যেত এবং সাহাবায়ে কেরাম নবী করিম (সা.)-এর পবিত্র জবান থেকে শুনে শুনে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করে ফেলেন।

পূর্ববর্তী নবীগণের আবির্ভাব বিশেষ বিশেষ জাতির প্রতি, নির্দিষ্ট শহর, নগর বা এলাকা ও অঞ্চলে হয়েছে। তাদের ইন্তেকালের পর নিয়মানুযায়ী তাদের নবুওয়াত সমাপ্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কিয়ামত পর্যন্ত আগত বিশ্বের সমস্ত মানব জাতির জন্য রসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। সুতরাং আরব, অনারব, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব মানুষ এবং নবী করিম (সা.)-এর যুগে যারা বিদ্যমান ছিলেন, কিয়ামত পর্যন্ত যারা আগমন করবেন সবাই উম্মতে মুহাম্মাদির অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, (হে নবী) তুমি বল! আমি তোমাদের সবার কাছে ওই আল্লাহর পক্ষ থেকে রসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি যিনি সমস্ত আসমান-জমিনের মালিক। (সূরা আরাফ : আয়াত-১৫৮)।

অন্য এক আয়াতে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন— (হে নবী) আমি তোমাকে সমস্ত মানুষের কাছে সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। (সূরা সাবা : আয়াত-২৮)। এই আয়াত দুটোর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নবী করিম (সা.) সারা বিশ্বজাহানের সমস্ত মানুষের জন্য নবী ও রসুল হিসেবে আগমন করেছেন। কিন্তু আরব দেশে তৎকালীন বৈরী পরিবেশে যাদের সঙ্গে নিয়ে দীন ও ইসলাম প্রচার করলেন তারাই হলেন সাহাবায়ে কেরাম। নবুওয়াত লাভের পর রসুলে করিম (সা.)-এর দাওয়াতে সর্বপ্রথম হজরত খাদিজা (রা.), হজরত আবু বকর (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত জায়দ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু নবী করিম (সা.)-এর ইসলাম প্রচারের কাজ চলত গোপনে। কারণ মক্কার কাফের, মুশরেক ও কুরাইশরা তখন হাতে তৈরি দেব-দেবী ও মূর্তিপূজায় অভ্যস্ত ছিল। এ অবস্থায় রসুলে করিম (সা.) মূর্তিপূজার পরিবর্তে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে তাদের আহ্বান জানালেন। বাপ-দাদার ধর্ম ও দেব-দেবীর বিরুদ্ধে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নতুন ধর্মের কথা শুনে মক্কার কাফের, মুশরিকরা নবী করিম (সা.)-এর ঘোর দুশমনে পরিণত হয়। ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের ওপর তারা অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও নবী করিম (সা.)-এর দাওয়াতে ক্রমেই মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। হজরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণে মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে ইসলাম প্রচারের কাজ দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। মূলত, নবী করিম (সা.) ইসলাম প্রচারের জন্য স্বীয় জীবন উৎসর্গকারী সাহাবা কেরামের এমন একটি দল গঠন করলেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সন্তুষ্টির জন্য কাফের মুশরিকদের যে কোনো জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে প্রস্তুত ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের ফলে হজরত বেলাল (রা.) ও হজরত খাব্বাব (রা.)-এর ওপর কাফেরদের সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও তারা তাওহীদ তথা ইসলাম পরিত্যাগ করেননি। এমনিভাবে নবুওয়ত লাভের পর ১৩ বছর পর্যন্ত নবী করিম (সা.)-এর মক্কায় অবস্থানকালে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি দেখে কাফের মুশরেকরা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধি করতে থাকে। ফলে নবী করিম (সা.) মুসলমানদের মাতৃভূমি ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেন। ফলে আল্লাহতালার সন্তুষ্টির উদ্দেশে দীন ও ইমান রক্ষার খাতিরে প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি ও ঘরবাড়ি ছেড়ে সাহাবিগণ মদিনায় হিজরত করেন। মদিনাবাসী মুসলমানগণ মক্কা থেকে আগত মুহাজিরগণকে হাসিমুখে বরণ করে তাদের থাকার জন্য নিজের বসতবাড়ির অর্ধেক ছেড়ে দিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। অবশেষে নবী করিম (সা.) হজরত আবু বকর (রা.)-সহ মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন। আল্লাহতায়ালা মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হলেন যখন তারা বক্তৃতাকালে তোমার কাছে বায়াত গ্রহণ করল, তাদের (সাহাবাদের) অন্তরে যা ছিল তা তিনি অবগত ছিলেন, তাদের তিনি দান করলেন প্রশান্তি এবং তাদের দান করলেন প্রকাশ্য বিজয়। (সূরা ফাত্হ : আয়াত ১৮)

মাতৃভূমি মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ দিয়ে আল্লাহ বলেন— নিশ্চয়ই আমি তোমাদের দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়। যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন এবং তোমাকে সত্পথে পরিচালিত করেন। (সূরা ফাত্হ আয়াত ১-২)

আল্লাহতায়ালা আমাদের তাঁর সন্তুষ্টি কামনায় রসলে করিম (সা.) এবং তাঁর সাহাবাগণের আদর্শ অনুযায়ী জীবন গঠন করার তৌফিক দান করুন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow