Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১০ নভেম্বর, ২০১৬ ২৩:০১
ধর্মতত্ত্ব
কী বলেছেন আল্লাহ করছি কী আমরা
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
কী বলেছেন আল্লাহ করছি কী আমরা

আল কোরআন এমন একটি গ্রন্থ, যে গ্রন্থে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি এবং অবনতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  অতীতের জাতিগুলো ঈর্ষণীয় প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হয়েও কেন ধ্বংস হয়ে গেছে এ সম্পর্কেও কোরআন সবিস্তারে আলোচনা করেছে। উম্মতে মুহাম্মাদী যেন আগের জাতির মতো ভুল না করে— মূলত এ কারণেই আগের উম্মতদের আলোচনা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য! অতীতের উম্মতদের ধ্বংসকারী সব আমলই উম্মতে মুহাম্মাদীর মাঝে আজ বাসা বেঁধেছে। এমনই একটি ধ্বংসকারী কাজ হলো ওজনে কম দেওয়া। ওজনে কম দেওয়ার কারণে অতীতে অনেক জনগোষ্ঠীকে আল্লাহতায়ালা ধ্বংস করে দিয়েছেন। হজরত শোয়াইবের (আ.) জাতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা অন্যান্য পাপের সঙ্গে ওজনে কম দেওয়ার পাপে সীমা ছাড়িয়ে যায়। এ কারণে আল্লাহ আজাব দিয়ে তাদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মাদায়েনবাসীর কাছে তাদের ভাই শোয়াইবকে পাঠিয়েছি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের রবের সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এসে গেছে। কাজেই ওজন ও পরিমাপ পুরোপুরি দাও।’ (সূরা আরাফ : ৮৫) শোয়াইবের (আ.) উম্মত তার কথা শোনেনি। আল্লাহতায়ালা তাদের কঠিন আজাব দিলেন। সূরা আরাফের ভাষায়— ‘সহসা একটি প্রলয়ঙ্করী বিপদ তাদের পাকড়াও করল। তারা নিজেদের ঘরের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকল।’ (সূরা আরাফ : ৯১।)

বিশ্বব্যাপী চোখ বুলালে দেখা যায়, আজ ওজন-পরিমাপে কম দেওয়ার চর্চায় বেশ এগিয়ে রয়েছি আমরা। কেউ মাল কম দিয়ে, কেউ কাজে সময় কম দিয়ে অর্থাৎ যে যেভাবে পারে প্রাপ্য বস্তু কম দেওয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত রয়েছে। এদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্য দুর্ভোগ। এরা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণমাত্রায় নেয় এবং যখন মেপে দেয় তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে? সেই মহাদিবসে যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব প্রতিপালকের সামনে।’ (সূরা মুতাফফিফিন : ১-৬)। যারা ওজনে কম দেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তারা কি কোরআনের এ আয়াত বিশ্বাস করে না— আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন দাঁড়িপাল্লা। যাতে তোমরা সীমা লঙ্ঘন না কর দাঁড়িপাল্লায়। তোমরা সঠিক ওজন কায়েম কর এবং ওজনে কম দিও না।’ (সূরা রহমান : ৭-৯)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করে দাও ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে। আমরা কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট দিই না।’ (সূরা আনআম : ১৫২)।

 

 

সম্প্রতি আমাদের দেশে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ নিয়ে নানান ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, গরিবদের চাল ধনীরা খেয়ে ফেলছে এবং সঠিক ওজনে চাল বিতরণ হচ্ছে না। সারা দেশের চিত্রই এমন। শুধু চাল নয়, সব পণ্যই কম দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের দেশে। এর ভয়াবহতা সম্পর্কে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো জনগোষ্ঠী মাপ ও ওজনে কম দেয়, তখন তাদের দুর্ভিক্ষ, খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি ও অত্যাচারী শাসকের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়।’ (বুখারি)। রসুল (সা.) আরও বলেন, কোনো জাতি মাপে বা ওজনে কম দিলে তাদের জন্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুর্ভিক্ষ তাদের গ্রাস করে। (কুরতুবি) অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে জাতির মধ্যে খেয়ানত অর্থাৎ আত্মসাতের ব্যাধি বেড়ে যায়, সে জাতির অন্তরে আল্লাহ শত্রুর ভয় সৃষ্টি করে দেন। যে জাতির মধ্যে ব্যভিচার বিস্তার লাভ করে, সে জাতির মধ্যে মৃত্যুহার বেড়ে যায়। যে জাতি মাপে ও ওজনে কম দেয়, তাদের রিজিক উঠিয়ে নেওয়া হয়। (মুওয়াত্তা মালেক)।

দেশজুড়ে যেভাবে ওজনে কম দেওয়া এবং কাজে ফাঁকি দেওয়ার সংস্কৃতি চর্চা হচ্চে, যে কোনো সময় আল্লাহর শাস্তি আমাদের কাঁধে এসে পড়তে পারে। দরিদ্রতা তো আমাদের প্রধান সমস্যার একটি। এর ওপর যদি দুর্ভিক্ষ শুরু হয় তবে সোনার বাংলাদেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তাই দরিদ্র ও দুর্ভিক্ষ থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে ওজনে কম দেওয়া থেকে আমাদের বিরত হতে হবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।  সরকার যদি কৌশলে মানুষকে পাপ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে তবে আল্লাহর রহমত অবশ্যই তাদের ওপর এবং জনগণের ওপর অঝোর ধারায় বর্ষিত হবে।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসিসরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow