Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০৭
তরুণ চিকিৎসকদের কথাও ভাবুন
তপন কুমার ঘোষ
তরুণ চিকিৎসকদের কথাও ভাবুন

আমাদের দেশের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। চিকিৎসকরা ঠিকমতো কর্মস্থলে থাকেন না, মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনেন না।

  রোগীদের ভালোভাবে পরীক্ষা করেন না। রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল নন। ভুল চিকিৎসা করেন। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন। কিছু বললে রেগে যান। সমস্যার কথা না শুনেই একগাদা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেন। চিকিৎসকরা অর্থপিশাচ— এমনি অনেক অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগ একেবারেই অমূলক নয়। এসব অভিযোগ সব চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারও কারও বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই কিছু সংখ্যকের কারণে ডাক্তারকুলের বদনাম হচ্ছে। আমাদের দেশে অনেক চিকিৎসক আছেন যারা ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে সর্বজন শ্রদ্ধেয়। ‘অর্থপিশাচ’ এই অপবাদ তাদের জন্য খাটে না। প্রবাসে গিয়ে আমাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, গবেষকরা ভালো করছেন। দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করছেন। কাজেই মেধার অভাব আছে, এ কথা মানা যায় না। তবে ডাক্তারদের আচরণগত দুর্বলতা আছে, এটা অস্বীকার করার জো নেই। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কিছু কিছু হাসপাতালের বেহাল দশার সচিত্র প্রতিবেদন মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে প্রচার হয়। রুগ্ন হাসপাতালেরই চিকিৎসা প্রয়োজন—এমন তির্যক মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে। শুধু ভবন, চিকিৎসক আর সেবিকা থাকলেই তো হবে না। অনেক হাসপাতালে চিকিৎসার সরঞ্জামাদি সীমিত। আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। থাকলেও অধিকাংশ অকেজো। যেখানে সেখানে ডায়াগনস্টিক সেন্টার গজিয়ে উঠেছে। অনেক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ আছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রেই এদের রিপোর্ট নির্ভরযোগ্য নয়। ভেজাল বা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে বাজার সয়লাব। এমনি নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে তরুণ চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তারপরও ভুল চিকিৎসা অথবা চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগে হাসপাতাল ভাঙচুর করা হয়। উত্তেজিত স্বজনদের হাতে লাঞ্ছিত হন কর্তব্যরত চিকিৎসক। রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের বচসা প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। যত যুক্তিই দাঁড় করানো হোক না কেন, চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু হলে তা মেনে নেওয়া যায় না। মৃত্যুর আসল কারণ কী? ভুল চিকিৎসা, না অন্য কিছু? উপযুক্ত তদন্তের পরই তা জানা যায়। আর হামলা-ভাঙচুর তো এসবের শাস্তি হতে পারে না। চিকিৎসকদের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার জন্য মামলা হতে পারে, হামলা হবে কেন? হাসপাতাল গোলযোগের জায়গা নয়। হাসপাতালের কাছে গাড়ির হর্ন বাজানো পর্যন্ত নিষেধ। এই তাৎক্ষণিক বিচার কোনো যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। অনেক সময় সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জীবনের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু। প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা এতটাই শোকাহত হয়ে পড়ি যে, এই সত্যটিকে আমরা মেনে নিতে পারি না। প্রসঙ্গত, উন্নত দেশের হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসকদের ভুল হয়। ভুলের জন্য মামলা হয়। প্রমাণিত হলে চড়া মাসুল গুনতে হয়। তরুণ চিকিৎসকদের মাঝে হতাশা আছে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যয়নের সুযোগ পান। ইঞ্জিনিয়ারদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ আছে। বৃত্তি নিয়ে অনেকে এমএস ও পিএইচডি করতে বিদেশে যান। কত স্বপ্ন তাদের! কিন্তু চিকিৎসকদের এই সুযোগ নেই। জুনিয়র চিকিৎসকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ধাপে ধাপে পদোন্নতির সুযোগ আছে। কিন্তু সাধারণ এমবিবিএস চিকিৎসকদের পদোন্নতির সুযোগ নেই বললেই চলে। বহু বছর ধরে একই পদে আটকে থাকায় সঙ্গত কারণেই তারা হতাশায় ভোগেন। এফসিপিএস ডিগ্রি যেন আকাশের চাঁদ। ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেকেই ‘আবু ভাই’ বনে গেছেন। অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা পরীক্ষা পাসে কেন কাজে আসছে না তা এক রহস্য বটে! এফসিপিএস পরীক্ষা পদ্ধতিতে কোনো গলদ আছে কি-না তা একটু পর্যালোচনা করে দেখা মন্দ কী! সব কিছুই সময়োপযোগী হতে হবে। গোটা পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন। ব্যবস্থার পরিবর্তন না ঘটিয়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। বিবিএ চার বছরের প্রোগ্রাম। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নিতে চার বছর পড়াশোনা করতে হয়। কিন্তু এমবিবিএস পাঁচ বছরের কোর্স।

এরপর আরও এক বছরের ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম। মোট ছয় বছর পড়াশোনার পর জোটে এই ডিগ্রি। চিকিৎসকদের অতিরিক্ত দুই বছর পড়াশোনা করতে হয়। কিন্তু বেতন কাঠামোর ক্ষেত্রে আলাদা প্যাকেজ নেই। যোগ্যতা অনুসারে কাজ, কাজ অনুযায়ী বেতন। সরকারি চাকরিতে এ নিয়ম কবে চালু হবে? ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মাসিক ভাতা পান সাকল্যে ১৫ হাজার টাকা। এই সেদিনও ভাতার পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। প্রচণ্ড খাটুনি। কখনো কখনো একটানা দুই শিফটে কাজ করতে হয়। রাত জেগে ডিউটি করতে হয়। রোগীদের নিয়ে টেনশন তো আছেই। আর আছে হামলার আশঙ্কা।

সন্তানের শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা ও চাকরির সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করে সবাই এখন রাজধানীমুখী। কিন্তু তরুণ চিকিৎসকদের আমরা গ্রামমুখী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। নিঃসন্দেহে ভালো পরামর্শ। কিন্তু প্রণোদনা হিসেবে তারা বাড়তি কী পাচ্ছেন, কেন তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে উৎসাহী হবেন? কর্মজীবনের শুরুতেই যদি হতাশা গ্রাস করে ফেলে তাহলে সব সম্ভাবনাই অঙ্কুরে বিনষ্ট হবে। এখন তো স্বপ্ন দেখার সময়।   বিদেশে উন্নত জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে, দেশকে ভালোবেসে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণে রেখে গ্রামে-গঞ্জে যেসব তরুণ চিকিৎসক সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের সমস্যা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ।

লেখক : সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক লিমিটেড।

ই-মেইল : tapon1952@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow