Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩২
ট্রাম্পের আমেরিকা ও চীনের সম্পর্ক কোন দিকে গড়াবে
মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)
ট্রাম্পের আমেরিকা ও চীনের সম্পর্ক কোন দিকে গড়াবে

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই চীনের সঙ্গে আমেরিকা বাগ্যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। বাগ্যুদ্ধটা শুরু হয়েছে ট্রাম্প শপথ নেওয়ারও বেশ কয়েক দিন আগে।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের টেলিফোনে কথা বলাকে কেন্দ্র করে। গত শতকের সত্তর দশকের শুরুতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর থেকে এবারই প্রথম কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সরাসরি তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বললেন। শুধু টেলিফোনে কথা বলেই ট্রাম্প থেমে থাকেননি। সমালোচকদের মুখের ওপর বলেছেন, আগামীতে আমেরিকা এক চীন নীতিতে অটল থাকবে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। চীনের গণমাধ্যম এবং সরকারি মুখপাত্র ট্রাম্পের কথার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, এটা স্পষ্টই উসকানিমূলক এবং চীনের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বেইজিং সফরের সময়ে মাও সেতুংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ও যৌথ ঘোষণায় নিক্সনও মেনে নেন যে, দুই দেশের সম্পর্কের মূল প্রতিপাদ্যে থাকবে এখন থেকে এক চীন নীতি। সে সময় মাও সেতুং নিক্সনকে বলেছিলেন তাইওয়ানকে সব সময়ই রিপাবলিক অব চায়নার অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে। ভবিষ্যতে সুবিধাজনক সময়ে তাইওয়ানকে আবার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, সেটা শান্তিপূর্ণ হলে ভালো, আর নয়তো শক্তি প্রয়োগ করার অধিকার সব সময়ই চীনের থাকবে। এরপর থেকে সম্পর্কের যাত্রাপথে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি কখনো কখনো তৈরি হলেও গত ৪৭ বছরে পারস্পরিক অংশীদারিত্ব ও একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ বাধলে তা উভয় দেশের জন্য অসহনীয় সংকট সৃষ্টি করবে এবং পুরো এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। হেনরি কিসিঞ্জার তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘চীন মার্কিন সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে একপক্ষের সম্পূর্ণ জয়-পরাজয়ের মনস্তাত্ত্বিকতায় টেনে নেওয়া উচিত হবে না। দ্বন্দ্বমূলক সব ইস্যুগুলোর বৈশিষ্ট্য ও ডায়মেনশন বিশ্ব প্রকৃতির। সব ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন কাজ। তবে সামরিক সংঘর্ষ দুই দেশের জন্যই আত্মঘাতী হবে। ’ যার কারণে, ট্রাম্প প্রশাসনের আক্রমণাত্মক ও উত্তেজনাকর বক্তব্যে খোদ আমেরিকার মিডিয়াসহ বিশ্বের চিন্তাশীল মানুষ উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের অভিষেক ভাষণ শোনার পর গত ২১ জানুয়ারি গার্ডিয়ান পত্রিকার সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল— ‘অসবত্রপধহং ধহফ ঃযব ড়িত্ষফ ংযড়ঁষফ নব াবৎু ধভত্ধরফ.’ ট্রাম্প বলেছেন, চীনের বর্তমান মুদ্রানীতি ও বাণিজ্য নীতিতে আমেরিকার স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটি পরিবর্তন না করলে আমেরিকা এক চীন নীতি থেকে সরে যেতে পারে। ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিনারসন ও সেক্রেটারি অব ডিফেন্স জেনারেল জেমস ম্যাটিস বলেছেন, দক্ষিণ চীন, সাগরের কৃত্রিম দ্বীপ থেকে চীনের সব সামরিক স্থাপনা অবিলম্বে সরিয়ে নিতে হবে। তা না হলে ওইসব দ্বীপে চীনকে যাওয়া-আসা করতে দেওয়া হবে না। এ ঘোষণায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং চীনও পাল্টা হুমকি দিয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে নির্মিত কৃত্রিম দ্বীপে যদি চীনকে যেতে বাধা দেওয়া হয় তাহলে তা ভয়ঙ্কর সংঘাতে রূপ নেবে। চীনের গ্লোবাল টাইমস বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র এরকম কিছু করলে বড় আকারের যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। হুমকি পাল্টা হুমকির প্রেক্ষাপটে আসলে কী হতে যাচ্ছে তা এ পর্যায়ে আমাদের মতো বিশ্লেষক ও কলামিস্টদের পক্ষে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। তবে বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সংযোগ ঘটালে ভবিষ্যতের রূপরেখা অনুমান করা যায়। তাই অতীতের ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে দুই রাষ্ট্র ও জনগণের ভিতরে যে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে একটা যৌক্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা যায়। আমেরিকা ও চীনের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর তিনবার বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রথমবার গত শতকের আশির দশকের শুরুতে কট্টরপন্থি রোনাল্ড রিগান প্রেসিডেন্ট হয়ে ঘোষণা দেন, ‘কমিউনিস্ট বিশ্ব হলো শয়তানের রাজ্য, যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে দুনিয়া থেকে উত্খাত করতে হবে, যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করা যাবে না। ’ একই সঙ্গে বলেন, ‘এক চীন নীতি তিনি মানবেন না এবং তাইওয়ানকেও চীনের সঙ্গে একই মর্যাদা দেবেন। ’ তাইওয়ানের কাছে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র বিক্রিরও ঘোষণা দেন। চীনও পাল্টা হুমকি দেয় এবং তাইওয়ান প্রণালিতে সামরিক মহড়া শুরু করে। শেষমেশ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রিগান এক চীন নীতি মেনে নেন এবং চীনও তাইওয়ানের কাছে ওই সময়ের জন্য আপত হিসেবে যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি মেনে নেয়।

এ জায়গায় একটা বিষয় স্মরণে রাখতে হবে, তখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে আছে এবং চীন-মার্কিন সম্পর্কের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটানো। দ্বিতীয়বার দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে ১৯৮৯ সালে ৪ জুন বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন স্কয়ারে ছাত্র বিক্ষোভ ও তা দমনে চীনের সরকারের পক্ষ থেকে নিষ্ঠুর ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। চীনের ধারণা হয় ছাত্র বিক্ষোভের পেছনে আমেরিকার হাত আছে। আর আমেরিকা মনে করে স্বতঃস্ফূর্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর ট্যাংক চালিয়ে নিরীহ ছাত্রদের হত্যা মেনে নেওয়া যায় না। আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং বিক্ষোভের প্রধান নেতা ফ্যাং লিজহিকে বেইজিংয়ে আমেরিকান দূতাবাসে আশ্রয় দেয়। শুরু হয় প্রচণ্ড বাগ্যুদ্ধ। আমেরিকায় তখন সিনিয়র বুশ প্রেসিডেন্ট, আর চীনে মাও সেতুংয়ের কাল শেষে বিশাল সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের সফলতায় শক্তিশালী অবস্থানে দেং জিয়াওপিং। আমেরিকার কট্টরপন্থি অংশ মনে করে চীনকে আর ছাড় দেওয়া যায় না, প্রয়োজন হলে সব রকম ঝুঁকি নিয়ে হলেও চীনকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাধ্য করতে হবে। অন্যদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে বুশ তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেন্ট স্কাউক্রফটকে বেইজিংয়ে পাঠান। দেং সরাসরি স্কাউক্রফটকে বলেন, ‘২ কোটি মানুষের জীবনের বিনিময়ে ২২ বছর যুদ্ধ করে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাই  কমিউনিস্ট পার্টির বিকল্প চীনে হবে না। আমরা কারও রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না। বিক্ষোভের নেতা ফ্যাং লিজহি, যিনি আমেরিকান দূতাবাসে লুকিয়ে আছে তাকে শর্তহীনভাবে আমাদের কাছে ফেরত দিতে হবে এবং চীনের প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। ’ এভাবে এক বছর ধরে বাগ্যুদ্ধ চলে এবং গোপনে কূটনৈতিক তত্পরতাও চলে। তারপর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হয়। ১৯৯০ সালের জুলাই মাসে এসে আমেরিকা অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয় এবং চীনও ফ্যাং লিজহিকে তার স্ত্রীসহ চীন ত্যাগের অনুমতি দেয়।

 

 

এই জায়গায়ও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন তার পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট ব্লকসহ পতনোন্মুখ পরিস্থিতিতে পড়ায় উভয়পক্ষের দৃষ্টি ছিল সেদিকে। তৃতীয়বার চীন-মার্কিন সম্পর্কের বাগ্যুদ্ধ হয় ১৯৯৯ সালের মে মাসে বলকানে কসভো যুদ্ধের সময়। আমেরিকার যুদ্ধ বিমানের বোমা বর্ষণে বেলগ্রেডে চীনের দূতাবাস প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। চীনের অভ্যন্তরে প্রচণ্ড উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তখনকার সেক্রেটারি অব স্টেট ম্যাডলিন অলব্রাইট ওয়াশিংটনস্থ চায়নিজ দূতাবাসে ছুটে যান, আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ করেন এবং চীনকে আশ্বস্ত করেন, ভুলবশত ঘটনা ঘটেছে বিধায় এর জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ যুক্তরাষ্ট্র বহন করবে। তারপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এত সময়ে আধুনিককালের চীনের সঙ্গে সংঘটিত তিনটি ঘটনার উল্লেখ করলাম। এগুলো ছাড়াও অতীতের, তবে খুব বেশি পুরনো নয়, কতকগুলো চরম অপমানজনক দুঃসহ স্মৃতি চায়নিজ থিঙ্কট্যাংক ও বুদ্ধিজীবীদের এখনো তাড়িয়ে ফেরে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে কিং ডাইনেস্টির শাসনামলে চায়নিজ উপকূলীয় বন্দরে পশ্চিমা ব্যবসায়ীদের আফিম ব্যবসা বন্ধ করার হুকুম দেয় চীনের সম্রাট। ব্রিটেন তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, সে যুদ্ধ ইতিহাসের প্রথম আফিম যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধ চলে ১৮৩৯-১৮৪২ পর্যন্ত এবং তাতে চীন পরাজিত হয়। পরিণতিতে ব্রিটেন হংকং দখল করে নেয় এবং ছয় মিলিয়ন পাউন্ড জরিমানা ও নতুন করে আরও ছয়টি বন্দরে ব্যবসার অনুমতি দিতে চীনকে বাধ্য করে। দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ হয় ১৮৫৬-১৮৬০ পর্যন্ত। এবার ব্রিটেন ও ফ্রান্স এক হয়ে বেইজিং শহর তছনছ করে, ঐতিহাসিক সামার প্যালেস আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। মূল্যবান শিল্পকর্ম ধ্বংস করে। দুই শক্তি মিলে পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ডিকটেশন চীনের ওপর চাপিয়ে দেয়। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রযুক্তির অভাবে এবং ডাইনেস্টি শাসনের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা ও ভগ্নদশার কারণে চীনকে অপমানজনক পরাজয়বরণ করতে হয়। অসম ও অসম্মানজনক বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে চীনের জনগণ ১৮৯৮ সালে বিদ্রোহ করে, যা বক্সার বিদ্রোহ নামে পরিচিত। বিদ্রোহীরা পশ্চিমা বিশ্বের স্থানীয় অফিস ও স্থাপনার ওপর আক্রমণ চালায়। যার ফলে ১৯০০ সালের আগস্ট মাসে ফ্রান্স, ব্রিটেন, আমেরিকা, জাপান, রাশিয়া, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি, আট জাতির ফোর্স একসঙ্গে বেইজিং দখল করে নেয় এবং চীনকে আরও অসম ও অপমানজনক চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করে। পূর্ব দিক থেকে ১৮৯৪ সালে জাপান চীনের ওপর আক্রমণ চালায় এবং কোরিয়া, তাইওয়ান ও মাঞ্চুরিয়ার বিশাল অংশ দখল করে নেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে পশ্চিমা বিশ্বের অযৌক্তিক আগ্রাসন, তাতে পরাজয় এবং অন্যান্য অসম অপমানজনক চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনাবলি চায়নিজ থিঙ্কট্যাংক ও বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা-চেতনাকে এখনো বিশালভাবে প্রভাবিত করে। এর প্রতিফলন পাওয়া যায় কর্নেল লিউ মিংফু কর্তৃক লিখিত চায়না ড্রিম গ্রন্থে। কর্নেল মিংফুর মতে চায়না যতই শান্তিপূর্ণ উপায়ে বৃহৎ শক্তি হওয়ার চেষ্টা চালাক না কেন, আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য। অন্যদিকে আমেরিকার নীতি নির্ধারকদের একাংশের ধারণা চীনের উত্থান প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্ব অঙ্গনে আমেরিকার স্বার্থের পরিপন্থী। বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উভয় দেশের স্ট্যাটেজিক টেনশনের একটা চিত্র পাওয়া যায়। চীন মনে করছে আমেরিকা তাদের উত্থান প্রতিহত করার চেষ্টা করছে এবং তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছে। আর আমেরিকার উদ্বেগ, এশিয়া থেকে আমেরিকাকে হটাতে কাজ করছে চীন। বিল ক্লিনটনের সেক্রেটারি অব স্টেট ম্যাডলিন অলব্রাইটের কিছু মন্তব্য আজকে নিবন্ধের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি মনে করেন, ‘এত বড় বিশাল দেশ চীনকে উপেক্ষা করা যেমন যায় না, তেমনি আলিঙ্গন করাও সহজ নয়, আবার এমন গর্বিত জাতির ওপর প্রভাব বিস্তার করাও কঠিন।

অন্যদিকে আমেরিকার মতো পরাশক্তির ভীরুতা প্রদর্শন মানায় না, যদিও চীনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। তাই বিশ্ব ব্যবস্থার ভরকেন্দ্র যখন আটলান্টিক কেন্দ্রিকতা থেকে ক্রমশ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে পরিবর্তন হচ্ছে, তখন পরাশক্তি আমেরিকা ও অপ্রতিরোধ্য উত্থানমুখী চীনের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আবশ্যক। ’ পূর্বের তিনটি বড় বিস্ফোরণোন্মুখ ঘটনায় চীনের অবস্থান বিশ্লেষণে মনে হয় আপাতত চীনের লক্ষ্য সর্বাত্মক সামরিক সংঘাত এড়িয়ে আধুনিক বৃহৎ শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা যাতে বিশ্ব অঙ্গনে ডোমিন্যান্ট ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়। আমেরিকা এতদিন প্রাক্তন সেক্রেটারি অব স্টেট ম্যাডলিন অলব্রাইটের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে চীনের সঙ্গে একটা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এখন দেখার বিষয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকার নতুন প্রশাসন তাহলে কি চীন নীতিতে প্যারাডিম শিফট আনবেন এবং প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্বকে সামরিক সংঘাতে রূপ দেবেন। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ট্রাম্পের অতি আগ্রহ কি ক্ষমতা বলয়ের নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দেয়? তবে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিকসহ অন্যান্য সব কিছু নিয়ে দুই দেশের অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এখন স্ট্র্যাটেজি পর্যায়ে আছে। তাই বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে বড় সামরিক সংঘাত উভয়ের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে, যেমনটি আশঙ্কা করেছেন হেনরি কিসিঞ্জার। তবে দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়ার নামে দুই দেশই বড় আকারের সামরিক শোডাউন ঘটাতে পারে। এ রকম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে যে কোনো এক পক্ষের ভ্রমাত্মক হিসাব। হঠাৎ করে পরিস্থিতিকে সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। তবে অতি সতর্ক মানসিকতা থেকে চীন কূটনৈতিক চ্যানেলে মুদ্রানীতি ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে একটা আপস-রফায় আসতে পারে এবং সেটাই বোধহয় হুমকি ধমকির পিছনে ট্রাম্প প্রশাসনেরও আপাত লক্ষ্য।

পুনশ্চ : নিবন্ধের তথ্যের সূত্র হেনরি কিসিঞ্জার লিখিত-হেনরি কিসিঞ্জার অন চায়না এবং কর্নেল লিউ মিংফু লিখিত-চায়না ড্রিম গ্রন্থ।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com

নিউ অরলিনস, ইউএসএ

এই পাতার আরো খবর
up-arrow