Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০৪
মেয়েদের পোশাক নিয়ে লোকের এত মাথাব্যথা কেন?
তসলিমা নাসরিন
মেয়েদের পোশাক নিয়ে লোকের এত মাথাব্যথা কেন?

সেদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বললেন, হোয়াইট হাউসে যে মেয়েরা কাজ করবে, তাদের সবাইকে ‘মেয়েদের মতো পোশাক’ পরতে হবে। মেয়েদের মতো পোশাক বলতে ট্রাম্প বুঝিয়েছেন যে পোশাক পরলে মেয়েদের যৌনাবেদন বাড়ে।

এদিকে উল্টো ঘটনা ঘটেছে ভারতে। মুম্বাই-এর গভরমেন্ট পলিটেকনিক কলেজের প্রিন্সিপাল স্বাতী দেশপান্ডে বলেছেন, ‘আমি শুনেছি কেন মেয়েরা অল্প বয়সে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান রোগে ভোগে। পুরুষের পোশাক পরলে মেয়েরা পুরুষের মতো চিন্তা করে, পুরুষের মতো আচার ব্যবহার করে। নিজেকে পুরুষ বলেই মনে করতে থাকে। এ কারণেই, অল্প বয়স থেকেই তাদের সন্তান জন্ম দেওয়ার স্বাভাবিক ইচ্ছেটা নষ্ট হয়ে যায়, তারা ভুগতে থাকে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান রোগে। ’ স্বাতী দেশপাণ্ডে এর মধ্যে ‘ইভ টিজিং’ বন্ধ করার নামে কলেজ ক্যান্টিনে ছাত্র আর ছাত্রীদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করেছেন। ছাত্রীদের ‘সুইটেবল’ পোশাক পরার অর্থাৎ সালোয়ার কামিজ পরার আদেশ দিয়েছেন। পুরুষের পোশাক পরলে কী ক্ষতি হয় তা তো বলেই দিয়েছেন। এখন, আমার প্রশ্ন, এত অজ্ঞতা নিয়ে কী করে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন, আর কী করে স্বাতী দেশপান্ডে একটি কলেজের প্রিন্সিপাল হন? প্রিন্সিপালের উদ্ভট মন্তব্যের প্রতিবাদে টুইটারে আর ফেসবুকে মানুষ নানা রকম পোশাক পরা মেয়েদের ছবি পোস্ট করছে। ভারতীয় মেয়ে— যারা বিজ্ঞানী, বৈমানিক, সাঁতারু, ফুটবলার, রেসলার, রানার, হাইকার, পুলিশ, মিলিটারি তাদের ছবি। মেয়েদের এসব পোশাক পুরুষের পোশাকের চেয়ে পৃথক নয়। ড্রেসলাইকএনইন্ডিয়ানউওম্যান হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে মেয়েরা শর্টস আর টিশার্ট পরা নিজেদের ছবিও প্রচুর পোস্ট করছে। এসব পোশাক পরা মেয়েরা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান রোগে ভুগছে না। সন্তান জন্ম দেওয়ার কোনও ইচ্ছে এই রোগের কারণে নষ্ট হয়ে যায় না। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম বলে একটি রোগ আছে, এই রোগে মেয়েদের হরমোনের গণ্ডগোল দেখা দেয়। পরীক্ষা করলে দেখা যায় জরায়ুর পাশে যে ডিমের থলি থাকে, সেখানকার ডিমগুলো বেশ ফুলে উঠেছে। এই সিন্ড্রোমটা কী কারণে হয়, তা এখনও সঠিক জানা যায়নি, তবে দেখা গেছে ডায়াবেটিস এবং উচ্চরক্তচাপ থাকলে, প্রচুর ইনসুলিন নিলে, ওজন খুব বেড়ে গেলে, জরায়ুতে ক্যান্সার হলে এটি হয়। হলে ঋতুচক্র স্বাভাবিক থাকে না, গোঁফ দাড়ি গজাতে থাকে, ব্রণও। গর্ভবতী হওয়াও কঠিন হয়ে ওঠে। এটির চিকিৎসা আছে। অনেক মেয়েই এই রোগে ভোগে, আবার সেরেও ওঠে। এই রোগের সঙ্গে কিন্তু মেয়েরা কী পোশাক পরলো, কী চিন্তা করলো, কী ভাবলো— তার সম্পর্ক নেই। একেবারেই নেই।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে কলেজের প্রিন্সিপালের এমন অদ্ভুত বিশ্বাস কী করে এলো যে, মেয়েরা পুরুষের পোশাক পরলে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমে ভুগবে এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা হারাবে! সম্ভবত তিনি কোনও মেয়েকে ওই রোগে ভুগতে দেখেছিলেন, যে মেয়ের পরনে পুরুষের পোশাক ছিল। তাই তিনি ভেবে নিয়েছেন, পুরুষের পোশাক পরলে ওই রোগ হয়। যে মেয়েকে ওই রোগে ভুগতে দেখেছিলেন, সেই মেয়ে যদি মার্সিডিজ গাড়ি চালাতো, তাহলে জানি না বলতেন কিনা, মেয়েরা মার্সিডিজ গাড়ি চালালে ওই রোগ হয়। আসলে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম কোনও বিষয় নয়, মেয়েদের পোশাক নিয়েই প্রিন্সিপালের আপত্তি। আপত্তিটার কারণ তাঁর মানসিক সমস্যা অথবা তাঁর মূর্খতা।

 

 

মূর্খতা প্রচুর মানুষের মধ্যে দেখি। মূর্খতা ট্রাম্পের মধ্যেও। ট্রাম্প ভাবেন, মেয়েরা যৌনবস্তু ছাড়া খুব বেশি কিছু নয়, যৌনবস্তুদের এমনভাবে পোশাক আশাক পরতে হবে যেন তাদের দেখে পুরুষের যৌন উত্তেজনা জাগে। ট্রাম্পের মতো স্বাতী দেশপাণ্ডেও মেয়েদের যেমন ইচ্ছে তেমন পোশাক পরার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। স্বাতী দেশপান্ডের মতো মানুষেরাও ভাবেন মেয়েরা যৌনবস্তু, তাই মেয়েদের তাঁরা এমন পোশাক পরাতে চান, যে পোশাক পরলে মেয়েদের শরীর প্রদর্শিত হবে না, পুরুষদের যৌন উত্তেজনা জাগবে না। স্বাতী দেশপাণ্ডে আর মৌলবাদী যারা মেয়েদের বোরখা পরতে বাধ্য করেন— একই মানসিকতার লোক। একই উদ্দেশে তাঁরা মেয়েদের শরীর আবৃত করেন। তাঁরা নিশ্চিত মেয়েদের শরীরের খাঁজভাঁজ দেখলে পুরুষেরা এমন উত্তেজিত হবে যে সমাজে ভয়ানক বিচ্ছৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাঁরা নিশ্চিত পুরুষেরা নিজেদের যৌন উত্তেজনা শামাল দিতে অক্ষম। আর ওদিকে মেয়েদের শরীর অনাবৃত করতে চান ট্রাম্প। ট্রাম্পের মতো লোকেরা ভেবেই নিয়েছেন যৌন উত্তেজনা জাগানোই মেয়েদের কাজ।

ওঁরা ভিন্ন মানসিকতার মানুষ। কিন্তু দু’পক্ষের মানসিকতাই মেয়েদের ভোগায়। ওঁরা কেউই মেয়েদের মানুষ হিসেবে সম্মান করে না। ওঁদের এক পক্ষ মেয়েদের আবৃত করে, আরেক পক্ষ অনাবৃত করে। দু’পক্ষই সমান নারীবিদ্বেষী। মেয়েরা যারা আত্মসম্মান আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে চায়, তাদের উপায় একটিই, ওই দু’পক্ষকেই গ্রাহ্য না করা, নিজের মতো চলা, নিজের যা করতে ভালো লাগে তা করা, নিজের যা পরতে ভালো লাগে তা পরা। যদি শাড়ি পরতে ইচ্ছে হয়, শাড়ি; সালোয়ার, কামিজ, শার্ট, প্যান্ট, শর্টস টিশার্ট, বিকিনি, স্কার্ট যা কিছু। এখন অনেকে বলতে পারেন, যদি বোরখা পরতে ইচ্ছে হয় বোরখাও। হ্যাঁ বোরখাও। তবে বোরখা পরতে আদৌ কোনও মেয়ে চায় কিনা এই ব্যাপারে আমার কিন্তু যথেষ্ট সংশয়। বোরখা মেয়েরা পরে, পরতে বাধ্য হয় বলে পরে। ভালোবেসে, শখ করে কেউ বোরখা পরে বলে আমি বিশ্বাস করি না। কিছু না পরতে ইচ্ছে হলে কিছু না পরার স্বাধীনতাও কি মানুষের থাকা উচিত নয়? হ্যাঁ সেটিও থাকা উচিত।

যে পোশাকগুলোকে এক সময় পুরুষের পোশাক বলে চিহ্নিত করা হতো সে পোশাকগুলো এখন আর শুধু পুরুষের পোশাক নয়, ঠিক যেমন যে কাজগুলোকে এক সময় পুরুষের কাজ বলে চিহ্নিত করা হতো, সেগুলো আর শুধু পুরুষের কাজ নয়। মেয়েরা প্রমাণ করেছে পুরুষেরা যে কাজ করতে পারে, সে কাজ মেয়েরাও করতে পারে। মেয়েরা অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে পারে, মেয়েরা পুলিশ হয়ে চোর ডাকাত ধরতে পারে, মেয়েরা বিমান চালাতে জানে, মহাশূন্যে ভাসতে পারে, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে, বড় বড় বিজ্ঞানী হতে পারে, মেয়েরা শ্রমিক হতে পারে, কেরানিগিরিও করতে পারে। যে কোনও পেশার নির্ধারিত পোশাকই মেয়েদের পোশাক। মেয়েরা যেহেতু সর্ববিদ্যায় পারদর্শী, মেয়েদের পোশাকও তাই সর্বরকম। মেয়েদের পোশাক কোনও নির্দিষ্ট পোশাকে সীমাবদ্ধ নয়। তারা যে কোনও পোশাক পরার অধিকার জন্মগতভাবে রাখে, পেশাগতভাবেও রাখে।

মেয়েদের পোশাককে পুরুষেরা তাদের রাজনীতির বিষয় করেছে। মেয়েরা যৌন হেনস্থার শিকার হলে তারা মেয়েদের পোশাককে দোষ দেয়। সমাজ যে সভ্য হয়নি, শিক্ষিত হয়নি, সমাজ যে এখনও মেয়েদের দ্বিতীয় লিঙ্গ বলে বিচার করে, মেয়েদের যৌনবস্তু বলে মনে করে— এ কথা স্বীকার করে না, এ নিয়ে উদ্বিগ্নও হয় না। বরং মেয়েদের আদেশ বা উপদেশ দেয় ছোট পোশাক ছেড়ে বড় পোশাক পরার, এ পোশাক না পরে সে পোশাক পরার। জিন্স না পরে সালোয়ার পরার, সালোয়ার না পরে শাড়ি পরার। বিশেষজ্ঞরা এই যে এত বলছেন যে মেয়েদের পোশাকের কারণে ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটে না, তারপরও কেউ বিশ্বাস করতে চায় না যে মেয়েরা বা মেয়েদের পোশাক ধর্ষণের জন্য দায়ী নয়, দায়ী ধর্ষক, দায়ী ধর্ষকের নারীবিদ্বেষ, দায়ী ধর্ষকের অজ্ঞতা, মূর্খতা, পুরুষতান্ত্রিকতা।

আচ্ছা, পুরুষের ওপর ঘটা কোনও যৌন হেনস্থার দায় কি পুরুষের কোনও পোশাকের ওপর দেওয়া হয়? দেওয়া হলে পোশাক বদলানোর উপদেশ কি মুহুর্মুহু বর্ষণ করা হয় পুরুষের ওপর? মেয়েদের ওপর চলা অন্যায়ের, সত্যিই, কোনও সীমা নেই, শেষ নেই।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা

এই পাতার আরো খবর
up-arrow