Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:১৮
ধর্মতত্ত্ব
‘বাংলা ভাষা’ আল্লাহর নেয়ামত
মুফতি আমজাদ হোসাইন
‘বাংলা ভাষা’ আল্লাহর নেয়ামত

বাংলা ভাষাসহ সব কিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহতায়ালা। তাঁর সৃষ্টিরাজি যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি বিস্ময়কর।

বান্দার ওপর তাঁর নেয়ামত অফুরন্ত। তাঁর নেয়ামতের সীমা পরিসীমা নেই। পৃথিবীর সূচনা থেকে কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষ একত্রিত হয়েও সেই নেয়ামত গুনে শেষ করতে পারবে না। কোনো যুক্তিবাদী কিংবা বস্তুবাদী যদি অজ্ঞতাবশত আল্লাহর দানকৃত নেয়ামতসমূহ গুনতে চায়, তাহলে নির্ঘাত কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে ব্যর্থ হবে, তাঁর নেয়ামতের কোনো কূলকিনারা, আদি-অন্ত খুঁজে পাবে না।   এটাই শত বাস্তব। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন : ‘সেসব বস্তু তোমরা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি থেকেই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন। যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে গুনে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ অত্যন্ত অন্যায়কারী, অকৃতজ্ঞ। ’ (মানুষ আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করে অথচ তাঁর আনুগত্য করতে চায় না) (সূরা-ইবরাহীম : ৩৪)। সর্বোচ্চ দাতার সেই অসংখ্য-অগণিত নেয়ামতসমূহের অন্যতম এবং বিশেষ নেয়ামত হলো ‘ভাষা’। মানব জাতিকে আল্লাহর সঠিক পথে আনার জন্য তিনি যুগে যুগে নবী-রসুলদের বিশাল জামাতকে পাঠিয়েছেন স্বজাতীয় ভাষা দিয়ে। সুরা ইব্রাহীমের ৪নং আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের পরিষ্কার বোঝাতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎ পথ প্রদর্শন করেন। তিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়’। সূরা আর-রাহমানের ০১, ০২, ০৩ এবং ০৪নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন : ‘করুণাময় আল্লাহ। শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন বর্ণনা। সূরা আর-রাহমানের আয়াতসমূহ দ্বারা বোঝা গেল মানব জাতির সৃষ্টির পর তাদের অসংখ্য-অগণিত নেয়ামত দান করা হয়েছে। তন্মধ্যে কোরআন ও ভাষার শিক্ষা অন্যতম। কারণ কোরআন শিক্ষা করা ও অপরকে শিক্ষা দেওয়া বর্ণনাশক্তির ওপর নির্ভরশীল। এ শিক্ষা পদ্ধতি সাধারণত দুইভাবে হয়ে থাকে : ১. মৌখিক পদ্ধতিতে শিক্ষা। ২. কলম বা লেখার মাধ্যমে শিক্ষা। সূরা আলাক-এর চতুর্থ আয়াতে কলম বা লেখনীর মাধ্যমে শিক্ষাকে অগ্রগণ্য করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন’। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে : ‘আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম বিশেষ এক কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে লেখার আদেশ করেন। আদেশ মতে কলম কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু পৃথিবীতে

ঘটবে সব লিখে ফেলে। ’ (মাআরিফুল কোরআন, মুফতি শফী, খণ্ড-৮, পৃ: ৯৬৭) (মাআরিফুল কোরআন, খণ্ড-১, পৃ: ২০০), এখন আমাদের জানতে হবে বর্ণময় ভাষার লিখিত আকারে আবিষ্কার কখন থেকে হয় বা কে এ পদ্ধতির আবিষ্কার করেন? মানুষ পৃথিবীতে এসে ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টির মাধ্যমে বহুকাল যাবৎ পরস্পরে ভাষা বিনিময় করে আসছিল। অবশেষে কালের আবর্তনে এক সময় মানুষ ভাষার লিখিত রূপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। কিন্তু ধ্বনিময় ভাষার লিখিত রূপ দেওয়া কীভাবে সম্ভব? মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত মেধা ও চিন্তাশক্তি খাটিয়ে আবিষ্কার করল। যেসব ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টি উচ্চারণ করে তারা মনের ভাব প্রকাশ করে, সেই প্রত্যেকটি ধ্বনি লিখিত আকারে প্রকাশ করার জন্য দরকার ভিন্ন ভিন্ন সংকেত আলামত। অতঃপর একাধিক সংকেত চিহ্নের পরস্পর মিলন ঘটানোর দ্বারা উচ্চারিত অথবা অনুচ্চারিত মনের ভাব লিখিত আকারে প্রকাশ করা যেতে পারে। হ্যাঁ, এ প্রক্রিয়ায়ই মানুষ প্রথমত বর্ণ, তারপর শব্দ এবং সবশেষে শব্দের সমষ্টিতে লিখিত বাক্যের মাধ্যমে ভাষাকে দৃশ্যমান ও স্থায়ী করতে সক্ষম হয়েছে। ঐতিহাসিকদের ভাষ্য মতে, এ পদ্ধতির আবিষ্কারক হজরত আদম (আ.)-এর নিকটতম নবী হজরত ইদরিস (আ.)-ই বর্ণের প্রথম আবিষ্কারক। কেননা তিনি পৃথিবীতে প্রথম নগর সভ্যতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেন। এ নগর সভ্যতার প্রসারের জন্যই তাকে বর্ণ আবিষ্কার করতে হয়। অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, হজরত নূহ (আ.)-এর পুত্র ‘সাম’-এর উসিলায় যাদের সেমেটিক জাতি বলা হয়, তারাই বর্ণের প্রথম আবিষ্কারক। তাদের পরে ধীরে ধীরে ভাষার লিখিত রূপ ক্রমশ উন্নতি লাভ করে এবং হিবরু, তুরিয়ানি, সুরিয়ানি, আরবি ইত্যাদি ভাষার লিখিত রূপ প্রকাশ পায়। অতঃপর কয়েক হাজার বছর আগে আবিষ্কার হয় বাংলা ভাষার বর্ণ বা লিখিত রূপ। এক বাংলা ভাষার কথাই ধরুন : বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ভাষা ৬৪ রকম। অথচ প্রত্যেকটিই বাংলা। বাংলার মতো অন্যান্য ভাষার বিভিন্নতাও বহু রকমের। এ বহু রকমের ভাষার বহু রকম ভিন্নতার স্বাদ যে কত মধুর তা প্রত্যেক আঞ্চলিক ভাষীই অনুভব করে থাকেন। মাতৃভাষায় স্বাদের তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে থাকেন। হ্যাঁ, প্রত্যেক অঞ্চলের অধিবাসীই সেই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত থাকেন এবং তৃপ্তি লাভ করেন। সত্যিই এ বহুরূপী ভাষা নিয়ে, ভাষার এ বিস্ময়কর বৈচিত্র্য নিয়ে আমরা যদি একটু ভাবতে বসি, তাহলে আমরা চিনতে পারব আমাদের, চিনতে পারব আমাদের জীবনদাতাকে। সারা জগত্ময় কেন এত বৈচিত্র্যের সমাহার? কেন এত বিচিত্র হয় মানুষের চেহারা, রং-বর্ণ-চরিত্র-ব্যবহার? বিচিত্র সব রং-বর্ণ ও গন্ধের ফুলের সমাহার, বিচিত্র সব পাখিকুলের মাতামাতি আমাকে কোনদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে?  পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন : ‘তাঁর আরও নিদর্শন হচ্ছে, আকাশসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি, তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এত জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনবলী রয়েছে’। (সূরা রূম : ২২)। আল্লাহপাক ভাষাজ্ঞানের মাধ্যমে আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন।   আমরা যেন মাতৃভাষার মাধ্যমে দীন-ইসলামের খেদমত করতে পারি আল্লাহপাক আমাদের সেই তৌফিক দান করুন।   আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও খতিব বারিধারা ঢাকা।

up-arrow