Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২০ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, রবিবার, ২০ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০৫
বিশ্বব্যাংকের মিথ্যাচার ও প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক সংস্কৃতি
পীর হাবিবুর রহমান
বিশ্বব্যাংকের মিথ্যাচার ও প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক সংস্কৃতি

এক বিষয় নিয়ে লিখতে লিখতে আরেক বিষয় চলে আসে। লিখতে বসেছি সুলতান মনসুরের কন্যার বিয়েতে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-নেতাদের অংশগ্রহণ না করা নিয়ে।

কিন্তু বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু নিয়ে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতি, ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ এনেছিল কানাডার আদালত তার প্রমাণ না পেয়ে নাকচ করে দেওয়ায় দেশে এখন এটিই ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।   কানাডার আদালত গত কয়েক বছরেও আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ পায়নি। এতে করে দুনিয়ার বুকে বাংলাদেশ যে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ফিরে পেল, সেটি আর বলতে হয় না।   টিআইবি বলেছে, বিশ্বব্যাংকের কাছে সরকারের জবাব চাওয়া উচিত। সুজন বলছে, বহির্বিশ্বে এই রায় দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে সহায়ক হবে। এই মামলা ঘিরে যাকে নিয়ে সর্বোচ্চ সমালোচনা ও বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে, রাজনীতি ও মন্ত্রিত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে তিনি সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। তিনি বলেছেন, এই মামলায় শুধু তিনি নন, দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, এ অভিযোগ মিথ্যা। বিশ্বব্যাংক এ অভিযোগে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন না করায় তিনিও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু সেই সময় শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর পদ্মা সেতু দুর্নীতি নিয়ে বিরোধী দলই নয়, গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটি যে অবস্থান নিয়েছিল তাতে জনগণের গরম নিঃশ্বাস সরকারের ঘাড়ে পড়েছিল।

২০১২ সালে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি ঘটেছিল। প্রধানমন্ত্রী পুত্র, বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় যথার্থই বলেছেন, যারা পদ্মা সেতু নিয়ে সেদিন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন, তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। এই রায় আওয়ামী লীগ সরকার বা দেশকে কলঙ্কমুক্তই করেনি; দেশের ইমেজ যে এখন অন্য উচ্চতায় সেটিরও প্রমাণ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুরুতে যা বলেছিলেন, কানাডার আদালতের রায় তারই স্বীকৃতি দিয়েছে। তার প্রজ্ঞা, মেধা, সাহস ও নেতৃত্বের মহিমা উজ্জ্বল হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ বা তৃতীয় বিশ্বের গণমাধ্যমই নয়, পশ্চিমা দুনিয়ায়ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম মার্কিন নির্বাচনে কে হবেন প্রেসিডেন্ট এই প্রশ্নে হিলারি ক্লিনটনকেই জিতিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভোটযুদ্ধে ট্রাম্পের বিজয় বিশ্ব গণমাধ্যমকে পরাস্ত করেছে। সব হিসাব-নিকাশ ভুল প্রমাণ হয়েছে। গণমাধ্যম বড় ধরনের ঝাঁকুনি খেয়েছে।

পদ্মা সেতুর এই মামলা ঘিরে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ও অর্থ সহায়তা না করায় দেশে যে বিতর্কের ঝড় বইছিল, তাতে শুধু সরকারের ইমেজই ক্ষুণ্ন হয়নি; দেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, জনগণ হয়েছে ব্যথিত। সেই সঙ্গে সরকারের জনপ্রিয়তায় আঘাতই হয়নি, একজন দক্ষ মন্ত্রী হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেনের ক্যারিয়ারও তছনছ হয়ে গেছে। এতসব ক্ষতি কে পুষিয়ে দিতে পারে? আওয়ামী লীগের ’৯৬ শাসনামলে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মহিবুর রহমান মানিকের ছাতকের বাড়িতে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে তার কর্মীরা মারা গিয়েছিল। সেই মামলায় মানিককে অনেক দিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে। কাশিমপুর কারাগারে তাকে দেখতেও গিয়েছি। তার বাড়িতে বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়েছিল, এটি যেমন সত্য তেমনি মানিক কখনো গুলতি দিয়েও কাউকে মারেননি বা সন্ত্রাসের রাজনীতি করেননি সেটিও সত্য। সেদিন মানিক সংসদে ছিলেন। কিন্তু একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক অব্যাহতভাবে তাকে ‘বোমা মানিক’ বানিয়েছিল গোটা দেশবাসীর সামনে। তার কন্যা স্কুলে ভর্তি হলে বাবার কথা জানতে চাইলে সে বলত বাবা বিদেশ আছেন। পরবর্তীতে সর্বোচ্চ আদালত মানিককে বেকসুর খালাস দিলেও তাকে ‘বোমা মানিক’ বানানোর জন্য গণমাধ্যমের প্রতি বুকের ভিতরে যে দগদগে ঘা সেখানকার যন্ত্রণা কখনো প্রশমিত হয়নি। এখানে আমাদের গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার সময় এসেছে। বিশ্ব গণমাধ্যম মার্কিন নির্বাচন নিয়ে প্রবল ঝাঁকুনি খেয়েছে।

পদ্মা সেতুর সেই বিতর্কের পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বাসভবনে এক নৈশভোজে গিয়েছিলাম। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শীর্ষ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা, সাংবাদিকরা তো ছিলেনই। সেখানে এক সম্পাদক হঠাৎ বলে উঠলেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি থেকে পরোক্ষভাবে হলেও লাভবান হয়েছেন। অক্সফোর্ড পাস উচ্চশিক্ষিত, বিনয়ী, সৎ আবুল হাসান চৌধুরীকে দীর্ঘদিন কাছে থেকে দেখেছি। রাষ্ট্রপতি মরহুম আবু সাঈদ চৌধুরীর পুত্র আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার বঙ্গবন্ধু পরিবারের স্নেহ কুড়িয়েছেন ছোটবেলা থেকেই। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাও তাকে ভাইয়ের মমতায় জড়িয়ে ছিলেন। লোভ, মোহের ঊর্ধ্বে থাকা, সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত আবুল হাসান চৌধুরী নামটি নিতেই প্রতিবাদ করেছিলাম। এ নিয়ে অনেক যুক্তিতর্কও হয়েছিল। কানাডার আদালত আগেই তাকে খালাস দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সৈয়দ আবুল হোসেনও কিছু দিন আগে ঢাকা বিমানবন্দরে বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে একদল সংবাদকর্মীর সামনে বলেছিলেন, তিনি নির্দোষ। এ কথাটিই তখনো বারবার বলেছেন। কিন্তু গণমাধ্যম থেকে সিভিল সোসাইটি তির্যক বাক্যবাণে সমালোচনায় তার ঘুম হারাম করে দিয়েছিল।

সজীব ওয়াজেদ জয় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যারা সুর মিলিয়েছিলেন তাদের ক্ষমা চাইতে বলাটা অন্যায় নয়, কারণ তাদের সরকারের ইমেজে এটি বড় ক্ষত তৈরি করেছিল। গণমাধ্যম বা সিভিল সোসাইটির যারা সেই সময় সরকারকে এই ইস্যু নিয়ে যেভাবে সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত করেছেন, তাতে ক্ষমা চাওয়াও অন্যায় কিছু নয়। কারণ ভুলটি গণমাধ্যম বা সিভিল সোসাইটি করেনি, করেছিল বিশ্বব্যাংক ও কানাডার আদালত। তবে সবারই যে কোনো ঘটনা বিচার বিশ্লেষণ ও তার গভীরে গিয়ে মন্তব্য করা প্রয়োজন। ভুলের ঊর্ধ্বে কেউ নন। কি রাজনীতিবিদ, কি ব্যবসায়ী, কি আমলা, কি সিভিল সোসাইটি বা গণমাধ্যম। আমরা আনন্দিত যে, একটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উত্থাপিত মিথ্যা অভিযোগের দায় থেকে মুক্ত হলাম, কিন্তু বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে সরকারের জবাব আদায় করাই উচিত। সরকারের ভাবমূর্তি, বাংলাদেশের ভাবমূর্তির কথা বাদই দিলাম। একজন আবুল হোসেন ও আবুল হাসান চৌধুরীকে যেভাবে বিতর্কিত করা হয়েছিল, বিশ্বব্যাংক কতটাই বা ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে জানি না? কিন্তু সরকারের অবশ্যই জবাব চাওয়া উচিত। শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাতেই হয়, শুরু থেকে তিনি বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে যে কথা বলেছিলেন, কানাডার আদালত তাকেই জয়ী করেছে। সরকারের অনেকেও সেদিন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন। সেই ’৯৪ সালের শীতকালে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম শাশুড়ি হয়েছিলেন। পার্লামেন্ট মেম্বার্স ক্লাবে কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিয়ের অনুষ্ঠানে সব মহলের এক মহামিলন ঘটেছিল। গণতন্ত্রের নবযাত্রার সেই পঞ্চম সংসদ ছিল প্রাণবন্ত। যদিও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রাশেদ খান মেনন ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছাড়া সব বিরোধী দলের সদস্যরা একযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সংসদ বর্জন থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সেই সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিয়ের অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও গিয়েছিলেন। যেমন খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তখনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেক সৌহার্দ্যের ছিল।

গণতন্ত্র দিন দিন কতটা বিকশিত হয়েছে, কতটাইবা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী হয়েছে দেশের মানুষ তা জানেন। তবে ক্ষমতার পালা বদলে নির্বাসিত হয়েছে রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের সেই সংস্কৃতি। ক্ষমতার পালা বদলে আওয়ামী লীগ-বিএনপির হাত ঘুরেফিরে এসেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তাদের রাজনৈতিক সংঘাতের পথ ধরে এসেছে ওয়ান-ইলেভেন। রাজনীতিতে আপন হয়েছে পর। শেখ হাসিনাকে দলীয় নেতাদেরসহ উড়িয়ে দিতে চালানো বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা, বোমা সন্ত্রাসের পথে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মতো দগদগে ক্ষতস্থানের যন্ত্রণা এতটাই তীব্র হয়েছে আস্থা ও বিশ্বাস শেষ হয়ে গেছে রাজনীতিতে। শোধ-পাল্টা শোধের যাত্রাপথে আজকের জাতীয় রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্যের জায়গাটি হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্নের মতো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ দুই সীমারেখায় অবস্থান নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার না করায় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র শক্তি প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সীমানায় দাঁড় করিয়েছে। এমনি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদের কন্যা রিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়ে গেল সিলেটেরই এক সুদর্শন পাত্রের সঙ্গে।

’৮৯ সালে ডাকসু ভিপি সুলতান মনসুর বিয়ে করেছিলেন সুনামগঞ্জের মরমী কবি হাছন রাজা পরিবারের সুন্দরী কন্যা স্নেহভাজন জ্যাকলিনকে। সেই সময়ে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বরযাত্রী হয়েছিলেন। সেটি ছিল বিশাল বহর। সিলেটের বৌভাত অনুষ্ঠানে নেমেছিল অতিথির ঢল। বৌভাত অনুষ্ঠানকে আলোকিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা উপস্থিত হয়ে। ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসু ভিপি সুলতান মনসুর ও তার নববধূকে দোয়া করে তিনি সিলেটে কৃষক সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। সেই কৃষক সমাবেশটির আয়োজন করেছিলেন আজকের জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আতিকুর রহমান আতিক। সুলতানকন্যা রিয়া ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনারও স্নেহ পেয়েছেন। অতিথিদের কার্ড বিলি করতে গিয়ে সুলতান মনসুর ভিতরে ভিতরে অস্থির, ছটফট করছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাকে ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। তিনি মনে করেন, তার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে দলের অভ্যন্তরের একটি চক্র। এ নিয়ে তার বেদনাবোধও রয়েছে। কারণ দলে সংস্কারপন্থি প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ, সরকার, সংসদে ঠাঁই পেলেও তার ঠাঁই হয়নি কেন? এ হিসাব তিনি মিলাতে পারছেন না।

স্কুল জীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে দীর্ঘ সংগ্রামের সিঁড়িপথ অতিক্রম করে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে। ছাত্রলীগের জনপ্রিয় এ সাবেক সভাপতি তোফায়েল আহমেদের পর শেষ ডাকসু ভিপি হয়েছিলেন ছাত্রলীগ থেকে। ষাটের দশকের গৌরবময় ছাত্ররাজনীতির উত্তরাধিকারিত্ব বহন করা সুলতান সেই সময়কার ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের বাঁধন রেখেছিলেন। গভীর সম্পর্কে বেঁধেছিলেন সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত নানা মত ও পথের সাথীদের। তিনি চেয়েছিলেন, তার কন্যার বিয়ের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে দাওয়াত করতে। চেষ্টা করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাননি। তিনি চেয়েছিলেন, তার জীবন-যৌবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে যে দলে কাটিয়েছেন সেই আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, নেতা ও সতীর্থরা প্রথম মেয়েটির বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকুন।

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ছাড়া সব মন্ত্রী ও নেতাদের তিনি দাওয়াত করেছিলেন। তার ডাকসুর সতীর্থ এবং মধুর ক্যান্টিন ও ডাকসুর স্মৃতি সংগ্রহশালার অরুণকেও দাওয়াত করেছিলেন। অরুণ এসেছিলেন, আসেননি কেবল আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-নেতারা। এমনকি যে সংস্কারপন্থি নেতাদের সঙ্গে গিয়ে নিজের রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটিয়েছেন, তারাও আসেননি। বিয়ের অনুষ্ঠানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোকিত দেশের সন্তান স্যার ফজলে হাসান আবেদ, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, সি এম শফি সামী, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, সুজনের বদিউল আলম মজুমদার, সিপিডির সম্মানিত ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, সাবেক ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারুজ্জামান, আমানউল্লাহ আমান, সাবেক ডাকসু জিএস ডা. মোসতাক হোসেন, খায়রুল কবীর খোকন, সাবেক রাকসু জিএস খন্দকার জাহাঙ্গীর কবির রানা, সাবেক চাকসু ভিপি নাজিম উদ্দিনসহ ষাট থেকে নব্বই দশকের ছাত্র নেতাদের মহামিলন ঘটেছিল। মিলনমেলা ঘটেছিল সাবেক কূটনীতিক ফারুক চৌধুরী, বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. মঈন খান, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ শহিদুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী, ষাটের ছাত্র আন্দোলনের সাহসী মানিকজোড় বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা মহসিন মন্টু, কামরুল আলম খান খসরু, পঁচাত্তর-উত্তর ছাত্রলীগের জনপ্রিয় বক্তা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, জাতীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নুরুল ফজল বুলবুল, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মহিবুর রহমান বাবু, রুহিন হোসেন প্রিন্স, চিত্রনায়িকা ও সাবেক সংসদ সদস্য কবরী সারোয়ারসহ বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, সাবেক ও বর্তমান বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষক-সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, বিচারপতিসহ নানা পেশার আলোকিত মানুষদের মিলনমেলা ঘটেছিল।

রিয়ার বিয়ে ঘিরে স্নেহময়ী মা জ্যাকলিনের অশ্রু ঝরছিল অনেক আগে থেকেই। কন্যাদানের সময় রিয়া বাবার বুকে আছড়ে বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। ভিতর ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিল সুলতান মনসুরের। পরিবারের সবার চোখ অশ্রুসজল। সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিয়ের সময় আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, শাশুড়ি হওয়ার অনুভূতি কি? তিনি থেমে গিয়েছিলেন। তারপর প্রশ্ন করেছিলেন মেয়ে আছে? তখন আমার অন্তরের জন্ম হয়েছে বা হবে। উত্তরে বললাম-না, নেই। তিনি বললেন, মেয়ে হোক। মেয়ের বিয়ের দিন অনুভূতি বুঝতে পারবে। রিয়া যখন বাবার বুকে কান্নায় আছড়ে পড়েছিল, আমি তখন পাশে থাকা আমার চন্দ্রস্মিতাকে বুকে টানছিলাম। মনে হচ্ছিল— মেয়েটি একদিন এভাবেই চলে যাবে। একে একে অতিথিরা বিদায় হলেন। বরের সঙ্গে কন্যাকে গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার পর তারাও চলে গেলেন। শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম সুলতান মনসুরের সঙ্গে। আরও ছিলেন অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন ও সিলেটের ব্যবসায়ী সাব্বির আহমদ। বিয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠান নিখুঁত, সুন্দর ও আনন্দময় হলেও সুলতান মনসুরের বুকভরা বেদনা— যেন তার কন্যা অশ্রুজলে ভেসে যাচ্ছিল। একে একে সবাই চলে গেলেন। সুলতান মনসুরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- সারা জীবন যে দল করেছিলেন সেই দলটির নেতা-মন্ত্রীরা কেউ এলেন না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুলতান মনসুর বললেন, কি আর করা! আশা করেছিলাম, আসবেন। মনে হলো, কন্যা বিদায়ের চেয়েও তার প্রিয় দলের নেতারা না আসায়, তার নেত্রীকে দাওয়াত করতে না পারায় বেশি দুঃখ পেয়েছেন।

পঁচাত্তরে পরিবার-পরিজনসহ বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী (বীরউত্তম) যে প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, মুজিবঅন্তঃপ্রাণ তরুণদের সঙ্গে নিয়ে সুলতান অস্ত্র হাতে ছুটে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুর রহমান মারুফও সেই যুদ্ধে ছিলেন। ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সুবাদে শেখ মারুফ এসেছিলেন। এসেছিলেন প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

বিষয়টা আমাকে খুব ভাবিয়েছে, এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর মতো উদার গণতন্ত্রী রাজনীতিবিদ আর কখনো আসবেন না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মওলানা ভাসানীকে শুধু শ্রদ্ধা করতেন না, মাসে মাসে কুড়ি হাজার টাকা পাঠাতেন। কারাবন্দী মুসলিম লীগার বন্ধু শাহ আজিজুর রহমানকে মুক্তিই দেননি; গাড়ি ও মাসোয়ারাও দিতেন। তার অগ্রজ আরেক মুসলিম লীগার সবুর খানের চিরকুট পেয়ে কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। আতাউর রহমান খানসহ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সম্মান করতেন, বুকে টানতেন। জীবনের পঞ্চাশটি বছর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করে সুলতান মনসুর যে দলে ঘাম ঝরানো শ্রম দিলেন, যৌবন থেকেই ব্যক্তিগত জীবনের ভোগ-বিলাসের মোহ ছেড়ে রাজনীতিকেই সাধনা করেছিলেন, সেই মানুষটি তার প্রিয় দলে রাজনীতি করার সুযোগ তো পাচ্ছেনই না; উল্টা তার কন্যার বিয়ের অনুষ্ঠানে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও দলের নেতা-মন্ত্রীরা উপস্থিত হননি। একজন সুলতান মনসুর হয়তো এই বেদনা ভোগ করছেন।   কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা আমাদের অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বন্ধন ছিঁড়ে এ কোন সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছি?  বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতার হৃদয়ের বিশালতা থেকে আজকের রাজনীতিবিদরা কী শিক্ষা নিচ্ছেন?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।

ইমেইল: peerhabib.rahman@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow