Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০৬
আব্বাকে মনে পড়ে খুব
সাগুফতা ইয়াসমিন
আব্বাকে মনে পড়ে খুব

আমার আব্বা, মরহুম মো. নুরুল ইসলাম খান, ছিলেন আমার জীবনের শক্তি ও সাহসের উৎস। তিনি জন্মেছিলেন ইংরেজি ১৯৩৮ সালের ১৬ মার্চ বিক্রমপুরের লৌহজং থানার সামুরবাড়ি গ্রামে। ব্রিটিশরাজের শাসন-শোষণের দাপট তখন নিষ্প্রভ। স্বাধীনতার লক্ষ্যে গণজোয়ারে প্রকম্পিত ভারতবর্ষ। আব্বার শৈশব কাটে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডামাডোলে। দাদা চাঁন খান কলকাতায় বই বাইন্ডিংয়ের ব্যবসা করতেন। তিনি ওই সময়ই আব্বাকে কলকাতা নিয়ে যান লেখাপড়ার লক্ষ্যে। ১৯৪৭ এ দেশভাগ হয়ে গেলে আব্বা আর কলকাতা রইলেন না। তিনি দাদার সঙ্গে ওই অল্প বয়সেই দেশে ফিরে আসেন। নিজ গ্রামেই ছিল তার আসল ঠিকানা। স্বজন-পরিজনদের মতোই তিনি ভালোবাসতেন তার গ্রামবাসীকে।

আব্বার লালিত স্বপ্ন ছিল আমাদের গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার। তাই তার জন্মভূমি ‘সামুরবাড়ি’ গ্রামের প্রথম বিদ্যালয়টি তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘আদর্শ বিদ্যাপীঠ’ নামে। তখন তিনি তারুণ্যের দীপ্তিতে পূর্ববাংলার পশ্চাদপদ এক গ্রামে বাতিঘর হয়ে দাঁড়ালেন। সেই ছিল শুরু। তারপর থেকে অগণিত জনহিতকর কাজে উৎসর্গ করেছিলেন তার আদর্শ-আলোকিত প্রাণশক্তি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

আব্বার পেশাজীবী জীবন শুরু হয় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরির মাধ্যমে আর তার ব্যবসায়িক জীবনের সূচনা হয় পাবনায় হাবিব এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরবর্তীকালে তিনি নিক্সন’স ইন্টারন্যাশনাল নামে এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। একজন সফল ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীর পাশাপাশি তার বড় একটি কর্মসাফল্য ছিল এই যে, তিনি দেশের প্রথম বেসরকারি বার্তা সংস্থা ‘এনা’ (ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান বার্তা সংস্থা ‘পিপিআই’ (পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল)-এর পাল্টা জবাবদানের কলমি-প্রতিরোধের প্রতিভূ হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে গোলাম রসুল মল্লিক চাচা ও আব্বা আরও কয়েকজন সুধীজন নিয়ে ১৯৬৮ সালে ‘এনা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আসমা লুপিনা চাচি (গোলাম রসুল মল্লিক চাচার স্ত্রী) প্রায়শই গর্ব করে বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কালে বিশ্বমহলে পিপিআই-এর প্রপাগান্ডার মুখোমুখি গণসংগ্রামী প্রচারণায় ‘এনা’ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল। বাঙালির চেতনায় উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত ‘এনা’ স্বাধীন দেশে পুনরায় সক্রিয় হয়।   

জীবনে প্রথম কবে আব্বা বলে ডেকেছি তা মনে নেই, তবে আব্বার সঙ্গে আমার শেষ কথা হয় আমাদের ঢাকার ৩৭, পুরানা পল্টনের বাসায়। গত বছরের ২৩ নভেম্বর সোমবার। ওই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত-ক্ষণ আমার কাছে বিস্ময় আর বেদনাভারে চিরভাস্বর। মানুষের মৃত্যু অনিবার্য জানি, কিন্তু ছিন্নসূত্রের সেই বিভীষিকা সইতে পারার শক্তি কি সবার থাকে! সপ্তাহের ওই দিনটিতে ঢাকার ওই বাসায় আমি নিয়মিত আমার নির্বাচনী এলাকা লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ি উপজেলার মানুষের সঙ্গে দেখা ও আলাপ-আলোচনা করি। সেই দিনটিতেও আমি আমার নেতা-কর্মী ও প্রাণপ্রিয় এলাকাবাসীর সঙ্গে বৈঠক করছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে এলো এলাকার নেতা-কর্মীদের চিৎকার— ‘আপা...!’ মুহূর্তেই অকুস্থলে ছুটে গিয়ে দেখি আব্বা মাটিতে শুয়ে তাকিয়ে আছেন অপলক দৃষ্টিতে, মুখ থেকে অস্পষ্ট আওয়াজ বেরুতে গিয়েও যেন আটকে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তে আমার সময় থমকে গেল... পাথর হয়ে গেল পা। আমার এলাকার যে ভাইয়েরা সেখানে উপস্থিত ছিল সবার সহযোগিতায় আব্বাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে ছুটে চললাম। বারডেমে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার জানালো, ‘ব্রেন স্ট্রোক করেছে’! ছুটে চললাম নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তার-নার্সদের সহযোগিতায় বিশেষ করে দ্বীন মোহাম্মদ স্যারের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা এগিয়ে চলল। রাতদিন একাকার করে দোয়া করছি আব্বার জন্য। সেই দিশাহারা সময়ে আমার এবং আমার পরিবারের পাশে ছায়া হয়ে ছিল আমার এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীবৃন্দ এবং আত্মীয়-পরিজন ও বহু সাধারণ মানুষ। হৃদয় দিয়ে আমি তাদের ভালোবাসাকে উপলব্ধি করি। তাদের কাছে আমি চিরঋণী। নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে তিন দিন থাকার পর ডাক্তারদের পরামর্শে আব্বাকে আমরা নিয়ে যাই ইউনাইটেড হাসপাতালে। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটে ১২ দিন অবস্থানের পর আমাদের এতিম করে অনন্তের পথে পাড়ি দেন তিনি। যত সহজে কথা কটি বললাম- ঠিক ততখানি কষ্ট বুকে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছি।

আব্বা আপন পেশায় নিবিষ্ট থেকেও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই স্বাধীনতার জন্য নীরবে অনেক ভূমিকা রাখেন। দেশের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর স্বাধীনতার মহান লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্নভাবে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করতে থাকেন। পাকিস্তানিদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষায় বহু লোক যুদ্ধ চলাকালীন নিক্সন’স ইন্টারন্যাশনালসহ উনার অন্যান্য ব্যবসায়িক কাগজপত্র ও সার্টিফিকেট ব্যবহার করেছিল। সেই প্রয়াসেরই এক উদাহরণ দিতে গিয়ে, গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ঢুলুগাঁও গ্রামের মাঠে, আব্বার জানাজায় হাজার হাজার মানুষের সামনে, তৎকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মানিত সভাপতি মো. মহিউদ্দিন চাচার চোখে পানি চলে আসে। জানাজা অনুষ্ঠানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মহিউদ্দিন চাচা বললেন, ‘আমি ২৬ মার্চে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাত থেকে নিজের জীবন রক্ষার্থে যখন দিশাহারা হয়ে ঘুরছিলাম, তখন আমার বড় ভাই মো. নুরুল ইসলাম খান, নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে আমার জীবন বাঁচায়। ’ চাচা জানান, আব্বা অনেক ঝুঁকি নিয়ে, এনা ও ওয়াজের আলী ইন্ডাস্ট্রিজ-পরিচয়পত্র ব্যবহার করে, নিজে গাড়ি চালিয়ে প্রথমে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী আপাকে (প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সংসদ উপনেতা বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ) তার দুই বাচ্চাসহ কলাবাগান থেকে বনানীতে পৌঁছে দেন। তারপর চাচাকে কেরানীগঞ্জের এক নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পৌঁছে দেন। ওই সময় পথে আব্বা ও মহিউদ্দিন চাচা পাকিস্তানি সেনাদের হাতে লাঞ্ছিত হন নিউমার্কেটের সামনে। আব্বার মৃত্যুর পরের দিন এলাহী চাচা অশ্রুসিক্ত চোখে আমার ও আমার ভাইদের হাত ধরে বলেন, ‘ভাতিজা, ভাবতে অবাক লাগে নুরুল ইসলাম ভাই আর নেই। ’ সৈয়দ ফজলে এলাহী চাচা ছিলেন মুক্তিবাহিনীর একজন এফএফ কমান্ডার (মুন্সীগঞ্জ মহকুমা), স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাকে ঢাকা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব দেন। বর্তমানে তিনি মুন্সীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সভাপতি। চাচা আরও বলেন, ‘ইসলাম ভাই ছিলেন অসহযোগ আন্দোলনসহ স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন নীরব যোদ্ধা। তিনি তার সাদা রঙের বক্স-ওয়্যান গাড়ি দিয়ে এনা ও অন্যান্য ব্যবসায়িক কাগজপত্র দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাদের নিরাপদ স্থান ও ক্ষেত্রবিশেষে অপারেশন স্পটে পৌঁছে দিতেন। তাছাড়া যুদ্ধকালীন প্রতিনিয়ত অর্থের প্রয়োজন হতো, তখন একটি চিরকুট দিয়ে পাঠিয়ে দিতাম নুরুল ইসলাম খান ভাইয়ের কাছে। তিনি তার সাধ্যমতো অর্থ জোগান দিতেন। ’ চাচা আরও জানান, বঙ্গবন্ধু যখন মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন তহবিল গঠন করেন, তখন আব্বা জাতির জনকের সঙ্গে দেখা করেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। আব্বা জীবিত থাকতে তার কাছেও শুনেছিলাম এবং এলাহী চাচাও ওই দিন বললেন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রথম অস্থায়ীভাবে বসার স্থান ছিল আমাদের পল্টনের বাসা-৩৭, পুরানা পল্টন। তখন সেখানে কমান্ডার হায়দার চাচা, মরহুম মাহমুদুল হাসান, জনাব আজিজ, জনাব নজরুল, জনাব ভিপি আজিজ, জনাব মঈন ও জনাব জাহাঙ্গীরসহ অনেকে নিয়মিত বসতেন। তারা সবাই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। পরবর্তীতে এই সংসদ পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নিলে অন্যত্র কার্যালয় নেওয়া হয়। আমাদের ৩৭, পুরানা পল্টনের বাসাটি অনেক রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী। এ বাসাটি বিশেষভাবে বিক্রমপুরের সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জন্য এক মিলনাশ্রম। আব্বা কখনো কাউকে না খাইয়ে আমাদের বাসা থেকে যেতে দেননি। তাই তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার বাসার দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়েছেন। ইমদাদের (আমার স্বামী) সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকে আমরা পল্টনের বাসাতেই থাকি। ৩৭, পুরানা পল্টনের এই বাড়িটি বিগত অনেক বছর ধরেই আওয়ামী লীগের একটি পার্টি অফিস হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। আমার ভাইবোনেরা প্রায় সবাই প্রবাসী, দেশে শুধু আমি ও আমার আরেক বোন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকে এই বাড়িটি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অনেক অন্যায় ও অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।

এলাহী চাচা চলে যাওয়ার আগে শেষ কথা বলে যান এই বলে যে, যুদ্ধের সময় কোরবান আলী চাচা চার দিন আমাদের বাসায় অবস্থান করেন। আব্বা পরে তাকে কিছু অর্থ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে সীমানা পার হয়ে ভারত যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু আব্বা আমার কাছে একদিন দুঃখ করে বলেছেন, ‘তোর কোরবান আলী চাচা একপর্যায়ে নমিনেশন কিংবা অন্য কোনো কারণে আমার প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন হয়ে যায়। তবে ভাগ্যের কি নিদারুণ পরিহাস শেষ পর্যন্ত তিনিই আওয়ামী লীগ ও জাতির জনকের কন্যাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আর এত বছর পর আমার মেয়ে, বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার কর্মী হওয়ার সুযোগ পেল। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ মহান বিচারক। ’

আব্বার স্মরণকথা লিখতে গিয়ে পুরনো আরও অনেক স্মৃতিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমার দাদা আব্বাকে অল্প বয়সে বিয়ে করিয়ে দেন। বিয়ের পর ব্যবসার জন্য আব্বা সপরিবার পাবনার ঈশ্বরদীতে চলে যান এবং হাবিব এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিটিসি (ব্রিটিশ টোব্যাকো কোম্পানি)-এর এজেন্সিশিপ নেন। তার অফিস ছিল দিলালপুরে ভবানীসাহ ভবনের চার তলায়। ঈশ্বরদীতেই আমিসহ আমাদের চার বোনের জন্ম হয়। এ ঈশ্বরদীতে আমাদের পরিবারের অনেক স্মৃতি আজো অম্লান। বিশেষ করে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ঈশ্বরদী ও পাবনা শহরের অনেক ঘটনাবহুল লোমহর্ষ মুহূর্তের কথা নিয়ে আব্বা প্রায়ই স্মৃতিচারণ করতেন। সেই ঈশ্বরদীতেই যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা আব্বার মামা নওশের আলী দাদাসহ তার ছয় ছেলেকে কী নৃশংসভাবেই না হত্যা করেছিল। দাদি তখন পাগল হয়ে যান। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নওশের দাদার মেয়ে আসমাকে জননেত্রী শেখ হাসিনা আর্থিকভাবে সাহায্য করেন। এভাবে কত যে যুদ্ধে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের নেত্রী খুঁজে খুঁজে পুনর্বাসন করেছেন এবং এখনো করছেন এর কোনো হিসাব নেই। ঈশ্বরদী ও পাবনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন ভাইয়ের (আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সংসদ সদস্য, জয়পুরহাট-২) সঙ্গে আমার কিছু কথোপকথনের কথা মনে পড়ছে। গত বছর সংসদ চলাকালীন এক সময় স্বপন ভাই আমাকে বললেন, ‘নেত্রীর নির্দেশে উত্তরবঙ্গের স্বাধীনতাসহ অন্যান্য কিছু বিষয়ের ইতিহাসের ওপর কাজ করতে গিয়ে নুরুল ইসলাম খান নামে একজন ব্যক্তির অনেক অবদানের কথা উঠে এসেছে। ’ আমি তখন স্বপন ভাইকে জানালাম উনিই আমার আব্বা। যুদ্ধকালীন আব্বার ভূমিকার তথ্য তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারেন। ওই সময় হাবিব এন্টারপ্রাইজে কর্মরত আমার ছোট চাচার দুটি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। যুদ্ধ শুরু হতেই আব্বা ছোট চাচাকে নির্দেশ দেন ওই অস্ত্র দুটি ও অফিসে থাকা নগদ টাকা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী চাচার কাছে জমা দিতে। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সন্তান বতর্মান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। দেশপ্রেমিক ত্যাগী রাজনীতিক মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক মরহুম ক্যাপ্টেন মনসুর আলীসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ তখন প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রাথমিক ধাপ তৈরিতে ব্যস্ত।

স্বাধীনতা যুদ্ধে আব্বার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথা জানতে পারি বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম ফকির ভাইয়ের কাছে। তিনি কলমা ইউনিয়নের সন্তান এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতা। আব্বার মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারি, কীভাবে তাকে এবং তার সঙ্গীদের সীমান্ত পার হতে সাহায্য করেছেন। শুধু তাই নয়, যুদ্ধশেষে জাহাঙ্গীর ফকিরসহ আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে নিরাপদ আশ্রয়ের লক্ষ্যে প্রেস ক্লাবের সামনে পিনম্যান দি প্যারিস লন্ড্রির পাশে তিনি বাসা ভাড়া করে দেন। জাহাঙ্গীর ভাই আরও বললেন, ‘যুদ্ধ শেষে একপর্যায়ে মিরপুর তখনো উদ্ধার হয়নি, মিরপুর উদ্ধারের জন্য তিনি আমাদের সাহস ও অনুপ্রেরণার সঙ্গে সঙ্গে তিনটি গাড়ি দিয়েও সাহায্য করেছিলেন। ’

আব্বা বেঁচে থাকতে তার উদ্যমী জীবনগাথা, জাতীয় জীবনের পাতায় বিন্দুসম অবদান থাকলেও কাগজে-কলমে সেসব লেখা হয়নি, কারণ তিনি তা চাননি। তিনি মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর জন্য নিজের গুণগান শুনতে-গাইতে চাইতেন না। কিন্তু আজ আব্বার মৃত্যুর পর কত জানা-অজানা কথা চারদিক থেকে ভেসে আসছে। তিনি আজ নেই বটে, কিন্তু তার স্মৃতি, তার কথা, তার আদেশ-উপদেশ এখন আমার জীবন পাথেয়। আমার স্বামীর সড়ক দুর্ঘটনার পর আমি যখন স্বামীর চিকিৎসা শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমার কোলের দুই শিশু সন্তান নিয়ে ফেরত আসি, তখন সিদ্দিক চাচার (জাতির জনকের কনিষ্ঠ কন্যা, আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন শেখ রেহানা আপার শ্বশুর) পরামর্শে আব্বা আমাকে সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বলেন। সিদ্দিক চাচা ছিলেন আব্বার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন গুরুজন। ১৯৯৬ সালে মহিলা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আব্বা আমাকে বলেছিলেন, ‘এ পদটা মানুষের সেবা করার জন্য এবং তাকে যেন কখনই শুনতে না হয় যে, কোনো প্রকার লোভ ও লালসা আমাকে স্পর্শ করেছে’।   সব সন্তানের কাছেই ‘বাবা’ পরম নির্ভরতার মূর্ত প্রতীক ও সব কাজের প্রেরণার উৎস। আজ তার পুণ্যস্মৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য।   তার বাড়ির দরজা চিরকাল ছিল খোলা। আজ এবং আগামীতেও ওই বাড়ির দরজা সবার জন্য উন্মুক্তই থাকবে, ইনশাল্লাহ।

লেখক : সংসদ সদস্য।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow