Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০৮
ভাষা আন্দোলনের নানা প্রসঙ্গ
হাসান-উজ-জামান

পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পর ঢাকায় আয়োজিত এক সম্মেলনে গঠিত হয় গণতান্ত্রিক যুবলীগ। সম্মেলনে ভাষা বিষয়ক কিছু প্রস্তাব সিদ্ধান্ত আকারে গৃহীত হয়, যা পাঠ করেন তৎকালীন যুব নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

ওই প্রস্তাবে তিনি উল্লেখ করেন— ‘বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখার বাহন এবং আইন আদালতের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হোক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে সে সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়া হোক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গৃহীত হোক। ’ পাকিস্তানের সৃষ্টির পর এভাবেই সর্বপ্রথম মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার দাবি উচ্চারিত হয়েছিল। ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের লেখা ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা’ পুস্তকে এর বর্ণনা পাওয়া যায়।

১৯৪৭-এ ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির পর জিন্নাহ কর্তৃক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তথা বাঙালিদের প্রতি আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বৈষম্য উপলব্ধি করে ওই বছরের (১৯৪৭) শুরুতে কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলে এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় যুবনেতা শেখ মুজিবসহ কতিপয় নেতা কর্তৃক অসাম্প্রদায়িক ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ৪৭-এর ডিসেম্বরে শেখ মুজিবসহ ১৪ জন ভাষাপ্রেমিক বাংলা ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন দাবি সংবলিত ২১ দফা ইশতেহার প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন যা পুস্তক আকারে প্রকাশ হয়ে নামকরণ হয়— ‘রাষ্ট্রভাষা ২১ দফা ইশতেহার-ঐতিহাসিক দলিল। ’ শেখ মুজিব তমদ্দুন মজলিশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং এর পক্ষে গণস্বাক্ষর গ্রহণ করেন, যা আগামী প্রকাশনী প্রকাশিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মাযহারুল ইসলামের গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র-যুব আন্দোলনের অংশ হিসেবে ভাষা আন্দোলনে মোগলটুলীর ১৫০ নম্বর বাড়িটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। এখান থেকে মাতৃভাষাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত প্রচার-প্রচারণা চালানো হতো। শেখ মুজিব, কমরুদ্দিন, জহিরুদ্দিন, নঈমুদ্দিন, শওকত আলী প্রমুখ ছিলেন এর সংগঠক। ১৯৪৮ এর ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা আদায়ের জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়, যার অন্যতম কুশীলব ছিলেন শেখ মুজিব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তৎকালীন প্রকৌশল মহাবিদ্যালয় এবং ঢাকা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন ও দলে দলে যোগদানের মধ্যে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধর্মঘটের মধ্যে ১৯৪৮-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম বাংলা ভাষার পক্ষে অনুষ্ঠিত এই সফল ধর্মঘট ও সমাবেশের ব্যবস্থাপনা এবং সফলতার কৃতিত্ব দেন তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিবসহ প্রগতিবাদী ছাত্র ও যুব নেতৃবৃন্দ এ সমাবেশে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার এবং সর্বাত্মক সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিশের যৌথসভায় ফজলুল হক মুসলিম ছাত্র হলে ১৯৪৮-এর ২ মার্চ অনুষ্ঠিত যৌথসভায় নতুন করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। শেখ মুজিবসহ অন্যান্যের মধ্যে এ সভায় উপস্থিত ছিলেন সামছুল হক, আবুল কাশেম, রনেশ দাস গুপ্ত, অর্জিত গুহ, অলি আহাদ ও মোহাম্মদ তোয়াহা। ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার ও তাদের দল মুসলিম লীগ কর্তৃক বাংলা ভাষাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়। তমদ্দুন মজলিশ গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ সমন্বয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর চালিকাশক্তি ছিলেন শেখ মুজিব।

১৯৪৮-এর ১ মার্চ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রদত্ত বিবৃতিতে ১১ মার্চের হরতাল যে কোনো মূল্যে সফল করার আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে স্বাক্ষর দেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান, তমদ্দুন মজলিশের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম, মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দিন আহমেদ এবং আবদুর রহমান চৌধুরী। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্ব ঘোষণা অনুসারে ১১ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই হরতাল প্রথম বারের মতো পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর ভিতকে নাড়া দেয়। এ হরতাল সফল করার নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিব, যিনি তখন পুলিশি হামলায় আহত ও গ্রেফতার হন। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা অলি আহাদ তার লিখিত গ্রন্থে উল্লিখিত ঘটনায় শেখ মুজিবের সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। সম্ভবত শেখ মুজিবই প্রথম রাজবন্দী যিনি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে মাতৃভাষা আন্দোলনের জন্য সর্বপ্রথম গ্রেফতার হন। রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধুর উত্থানের পেছনে এই গ্রেফতারের ঘটনা তাকে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে যুগোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সহায়তা করেছে।   পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ১৯৪৮-এর ১৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শেখ মুজিবের অংশগ্রহণে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুসারে ওইদিন দেশব্যাপী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূলত ভাষার দাবিতে সফল ধর্মঘট পালিত হয়। দৃঢ় প্রত্যয়ী এবং আন্দোলনের প্রশ্নে অবিচল শেখ মুজিব ক্রমেই ছাত্র-যুব সমাজের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় ১৯৪৯-এ শেখ মুজিব দুবার কারারুদ্ধ হন। ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনো তিনি কারাগারে ছিলেন। শারীরিকভাবে তিনি অনুপস্থিত থাকলেও কারা অভ্যন্তরে থেকেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন ও দিকনির্দেশনা পাঠাতেন। বিশিষ্ট কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা ‘কিছু স্মৃতি কিছু কথা’ প্রবন্ধে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, বায়ান্নর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শেখ মুজিবকে ঢাকা কারাগার থেকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয় এবং ভাষা সংগ্রামীদের উদ্দেশ্যে তিনি তখন উৎসাহ প্রদানের জন্য চিরকুট পাঠাতেন। ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের ভাষ্যমতে বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারারুদ্ধ থাকায় তার পক্ষে তখন প্রকাশ্যে বা শারীরিকভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি।

লেখক : মহাসচিব, হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ

এই পাতার আরো খবর
up-arrow