Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:১৭
বিশুদ্ধ ভাষাজ্ঞান নবীদের আদর্শ
মুফতি আমজাদ হোসাইন
বিশুদ্ধ ভাষাজ্ঞান নবীদের আদর্শ

হজরত রসুলে আরাবি (সা.) বলেন, ‘আমি আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধভাষী’ রসুল (সা.)। তিনি পুরো জীবনে এক মুহূর্তের জন্য কখনো অশুদ্ধ শব্দ উচ্চারণ করেননি বা অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলেননি।

কখনো অপরিচিত কোনো ব্যক্তি তাঁর মোবারক মুখের কথাবার্তা শুনলে বিমোহিত হয়ে জিজ্ঞাসা করত তিনি কোন ঘরের সন্তান। কার কাছে তিনি এত সুন্দর বিশুদ্ধ ভাষা শিখেছেন? তিনি আজীবন বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য বিশুদ্ধ ভাষায় কথাবার্তা বলা ও দীনি দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাষা প্রয়োগে একটি অনুসরণীয় আদর্শ রেখে গেছেন। নবুয়তি জমানা থেকে বিশুদ্ধ ভাষায় কথা শুনে অনেক লোক ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন। তার অসংখ্য প্রমাণ ইতিহাসের কিতাবে রয়েছে। কারণ ভাষা হচ্ছে একে অপরের কাছে স্বীয় মনোভাব অর্থবোধকভাবে ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। আর ভাষা বিশুদ্ধ, উন্নত এবং সুবিন্যস্ত পর্যায়ে উন্নীত হলে তাকে সাহিত্য বলা হয়। এখন যদি কোনো ব্যক্তি বিশুদ্ধ ভাষা না জানে বা ভাষাজ্ঞান না থাকে তাহলে সে কীভাবে নিজের মনোভাব অপরের কাছে সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরবেন? দীন তথা ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের জন্যও ভাষাজ্ঞান থাকা অতীব জরুরি। আমরা যেহেতু বাংলাদেশের নাগরিক। অবশ্যই স্বীয় মাতৃভাষার ওপর গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। বিশুদ্ধ ভাষা উচ্চারণ, প্রয়োগ ও সাবলীল ভাষায় কথাবার্তা বলার ব্যাপারে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভাষা-সৌন্দর্য ও বর্ণনা-মাধুর্যের কথা তো লিখে শেষ করা যাাবে না। এ ছাড়া আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশী গ্রন্থ আল-কোরআন হলো নবী (সা.)-এর প্রধান-অকাট্য মুজিজা। যার সাহিত্য-সৌন্দর্য, বর্ণনা-নৈপুণ্য, বিন্যাস-বিশিষ্টতা ইত্যাদি দেখে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরা চমকিত, বিস্মিত, অভিভূত ও পরাভূত হয়েছিলেন। অপরদিকে কোরআন ছিল তখনকার সাহিত্যপূর্ণ অবস্থার জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সমকালীন সাহিত্যিকরা অকুণ্ঠে স্বীকার করেছিলেন, ‘এ কোরআন কিছুতেই মানব রচিত গ্রন্থ হতে পারে না’। এক কথায় কোরআন সাহিত্যপূর্ণ এক ঐশী গ্রন্থ। নবীজী যেহেতু আরবি ছিলেন। তাই মহান রাব্বুল আলামিন মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআনকেও নবীজীর মাতৃভাষা আরবিতে নাজিল করেছেন। নিজ ভাষা শিক্ষা ও বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা নবীদের আদর্শ। বিশুদ্ধ ভাষা আল্লাহর দান। ভাষাজ্ঞান আল্লাহপাক যাকে পছন্দ করেন তাকেই দান করেন। যেমন আল্লাহতায়ালা নবীদের মাতৃভাষার জ্ঞান দান করে মাতৃভাষায় স্ব-স্ব উম্মতদের দীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য নির্দেশ করেছেন। হজরত মূসা (আ.) ছিলেন নবীদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর আলোচনা পবিত্র কোরআনের অনেক স্থানে আলোচিত হয়েছে। ভাষার দক্ষতা ও বর্ণনার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি অধিক বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষার জন্য ও জবানের জড়তা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে— (তিনি বলেছিলেন) ‘হে আমার প্রভু! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও, আমার কাজ (দাওয়াতের কাজ) সহজ করে দাও। এবং আমার জিহ্বার জড়তা খুলে দাও যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। এবং আমার পরিবারের মধ্য হতে আমার একজন সাহায্যকারী করে দাও। আমার ভাই হারুনকে। (সূরা তাহা:২৫-৩০) অপর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে— ‘আর আমার ভাই হারুন, সে আমার চেয়ে অধিক সাবলীলভাষী। অতএব, তাকে আমার সহযোগী হিসেবে প্রেরণ কর। সে আমাকে সমর্থন করবে। আমি আশঙ্কা করি যে, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে। আল্লাহ বললেন, আমি তোমার বাহুকে তোমার ভাই দ্বারা শক্তিশালী করে দেব এবং তোমাদের প্রাধান্যতা দান করব। (সূরা কাসাস:৩৪-৩৫) আলোচ্য আয়াতগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, হজরত মূসা (আ.) ভাষার ওপর গভীর জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও জড়তামুক্ত ভাষা ও ছোট ভাই হারুন (আ.)কে দাওয়াতের কাজে নিজের সহযোগী হিসেবে আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন। আল্লাহতায়ালা তা সঙ্গে সঙ্গে কবুলও করেছিলেন। দীনি কাজে ভাষাজ্ঞানের বিকল্প নেই। আমাদের বাংলা ভাষা অন্যান্য ভাষা থেকে বহুদিক থেকে ভিন্ন এবং অনন্য। অনেক ভাষা থেকে মর্যাদা ও প্রাধান্যতার দাবি রাখে। বাংলা ভাষা বহু ত্যাগ, কোরবানি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। বাংলা ভাষাভাষী কোটি কোটি মানুষ এ দেশে বাস করে তাদের কাছে যদি বক্তা বিষয় ও বক্তব্যে গতি, বিষয়োচিত বাক্যগঠন, লাগসই শব্দ চয়ন, গাঁথুনির গতিশীলতা ও শিল্পসম্মত বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে বিদ্যুত্গতি সৃষ্টি করতে পারেন শ্রোতাদের অন্তরে, জোয়ার বইয়ে দিতে পারেন অন্তরের গহিনে। মানুষের মনের মণিকোঠায়, মননের মণিকোঠায় মুদ্রিত করতে পারেন বক্তার মনোভাব। তখন অবশ্যই শ্রোতা বক্তার কথা শুনবে, চিন্তা করবে একসময় বক্তার আহ্বানে সাড়া দিবে। আর ভাষাজ্ঞান সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। যুগে যুগে দেশে দেশে ও জাতিতে জাতিতে আল্লাহ যাঁদের পাঠিয়েছিলেন নবী-রসুল ও সতর্ককারী হিসেবে। তাঁরা সবাই নিজ নিজ ভাষায়ই আল্লাহর বাণী তথা ইসলামের আদেশ-নিষেধ প্রচার করেছেন নিজেদের লোকদের মাঝে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি প্রত্যেক রসুলকে স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (আল্লাহর বাণী) স্বচ্ছ-সুন্দর পদ্ধতিতে বোঝাতে পারেন। ’ (সূরা ইবরাহিম:০৪) এই আয়াতে ‘যাতে স্বচ্ছ-সুন্দর পদ্ধতিতে বোঝাতে পারেন’ এই বাক্যে রয়েছে সাগরসম অর্থবিশালতা। তাফসিরবিদরা আয়াতের এই অংশ থেকে প্রমাণ করেছেন যে, একজন রসুল বলতেই তাঁর রয়েছে গভীর ভাষাজ্ঞান। দৃপ্ত পদচারণা ছিল বিশুদ্ধ বর্ণনায়। তাই নবী-রসুলদের ইতিহাস পাঠ করে, বিশুদ্ধভাবে কোরআন-হাদিস চর্চা করে আমাদের হতে হবে খালেছ দীনের দায়ী। প্রভাব তৈরিকারী লেখক-সাহিত্যিক ও বাগ্মী বক্তা। ভাষা-সাহিত্যের সব শাখায়, বর্ণনা-শিল্পের প্রতিযোগিতায় আমাদের স্থান হতে হবে সর্বাগ্রে। মনে রাখতে হবে, গর্বগৌরব, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই রক্তার্জিত ভাষা শুধু দুনিয়াতে রেখে যাওয়ার জন্য নয়, বরং এর ফল-ফসল ফলাতে হবে আখেরাতের জন্যও। দুনিয়া ও আখেরাতে দুইয়ের কাজে ও কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে এই ভাষাকে। সর্বোপরি আমাদের সর্বক্ষেত্রে ফুটে উঠাতে হবে নবীজীর আদর্শ। তাহলেই সফলতা আমাদের পদচুম্বন করবে ইনশাআল্লাহ। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও খতিব বারিধারা, ঢাকা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow