Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০৭
আবারও ই-ভোটিং, আবারও সতর্ক আশাবাদ
ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ ও ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান
আবারও ই-ভোটিং, আবারও সতর্ক আশাবাদ

এক. গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  বলেছেন, ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বর্তমান বিরাজমান সব বিধিবিধানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জনমানুষের ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিংয়ের প্রবর্তন করার পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। ’  নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে গত ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ই-ভোটিং’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

দুই. আমরা দেখেছি, ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে প্রথম ই-ভোটিং পদ্ধতি আনুষ্ঠানিক সূচনা করে। এরপর নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি ওয়ার্ড, নরসিংদী পৌরসভা ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের পুরো নির্বাচন ইভিএমে হয়েছিল। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদায়ের আগে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে গিয়েছিল শামসুল হুদা কমিশন। কিন্তু কাজী রকিব কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৮ নম্বর সাধারণ ওয়ার্ডের ‘সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ’ কেন্দ্রে একটি ইভিএম মেশিনে ত্রুটি দেখা দেয়। এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে ভোটগ্রহণ বাতিল করে কিছু দিন পর আবার ব্যালট পেপারেই ভোটগ্রহণ করা হয়। এরপর সেই মেশিনটি বিকল হওয়ার কারণ জানতে এবং তা সারাতে না পারা পর্যন্ত সব ধরনের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসে ইসি। এভাবেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সহায়তায় চালু হওয়া ইভিএম প্রযুক্তি পাঁচ বছরের মাথায় কারিগরি ত্রুটি নিয়ে আলোচনার বাইরে চলে যায়। তবে, ইভিএম সম্পর্কে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যন্ত্রে আগে থেকে কারসাজি করার কোনো সুযোগ নেই। একটি ভোটের জন্য একবারই প্রোগ্রামিং (ওটিপি) করা হয়।

ভোট শুরুর আগে কোনো যন্ত্রে কারসাজি করা হলে সেটা তো আর কাজই করবে না। একেকটি যন্ত্র তৈরিতে তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল সম্ভবত ২৪ হাজার টাকা, যা দিয়ে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা যেত। ফলে ব্যালট ছাপানো, কালি, কলম, ব্যালট বাক্স কেনার খরচ বাঁচত। সময় তো বাঁচতই (তানভীর সোহেল)। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০২:২০, দৈনিক প্রথম আলো)।

তিন. তবে, বুয়েটের সহযোগিতা না পেয়ে দীর্ঘদিন পর নির্বাচন কমিশন নিজেই এ যন্ত্রটি উন্নয়নের পরিকল্পনা হাতে নেয়। এ জন্য ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই এক বৈঠক করে কমিশন। এতে ইসির জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান সালেহ উদ্দিন ইভিএমের কারিগরি উন্নয়ন আনার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবটির সুবিধা-অসুবিধা এবং উৎকর্ষতা সাধনে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে প্রধান করে ২৫ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশন। যে কমিটি ইভিএমের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে একটি উন্নত ভোটিং মেশিন তৈরির জন্য কাজ করছে  (www.bdmorning.com/top-news/১৬১৫৫১, জানুয়ারি ২৫, ২০১৭)। বর্তমানে যে ইভিএমটি রয়েছে এতে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা অনুসারে বোতামে টিপ দিয়ে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু ভোটারের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে পরিকল্পনা চলছে ডিজিটাল ভোটিং মেশিন বা ডিভিএম নিয়ে। ইভিএমের সঙ্গে এমন একটি সেন্সর লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে ভোটারের আঙ্গুলের ছাপও সংরক্ষণে থাকবে। যা ইসির এনআইডি শাখায় সংরক্ষিত রয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো ভোটার ভোট দিতে এলে প্রথমেই তার আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে মিলিয়ে দেখা হবে, সে সত্যিকারের ভোটার কিনা। এ ছাড়া এটিএম কার্ড সোয়াইপ করার মতো স্মার্টকার্ড ব্যবস্থা থাকবে। এসবের পর পরিচয় নিশ্চিত হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেবেন প্রিসাইডিং অফিসার। তখন বোতামে চাপ দিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন তিনি। ডিভিএম কেমন হবে, আগের ইভিএমের তুলনায় ডিভিএমে কতটা বেশি সুবিধা থাকবে, ভোটগ্রহণ প্রশ্নহীন হবে কিনা, সে ব্যাপারে মতামত দেবে কমিটি। কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, মতামত ইতিবাচক হলে চলতি বছরই পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যন্ত্রে ভোট নেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ আছে, চেষ্টা করা সত্ত্বেও যন্ত্রে ভোট দেওয়াকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করা যায়নি। তাই এটি খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। এখানে কেবল যন্ত্রের ব্যবহার রাখলে চলবে না। কাগজের ব্যবহার থাকতে হবে (তানভীর সোহেল। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০২:২০, দৈনিক প্রথম আলো)।  

চার. এদিকে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিং চালু করার চিন্তা বা পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে বিএনপি। দলটি বলছে, এতে দুরভিসন্ধি আছে। এ পদ্ধতি চালু হলে ভোট কারসাজি করা সরকারের জন্য সহজ হবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিং করে দলটির এ অবস্থানের কথা জানান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ই-ভোটিং করার যে কথা বলেছেন, এটি সরকারের ভোটারবিহীন নির্বাচন করার আরেকটি ডিজিটাল প্রতারণা কিনা, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে। আমরা মনে করি, তার (প্রধানমন্ত্রী) ঘোষণা জনগণকে আরেকটি তামাশার বায়োস্কোপ দেখানো ছাড়া অন্য কিছু নয়। রিজভী বলেন, ভারত, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ ই-ভোটিং পদ্ধতি চালু করলেও এর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ পদ্ধতিতে দূর থেকে হ্যাক করা সম্ভব বলেই স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে এ পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে সেসব দেশে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ নিরক্ষর। এত টেকনিক্যাল বিষয় বোঝা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। এ পদ্ধতিতে ই-ভোটিংয়ের সার্ভার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সুতরাং, সরকারের জন্য ভোট ম্যানিপুলেট (কারসাজি) করা খুবই সহজ হবে। ই-ভোটিং সম্পর্কে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক অন্যান্য দলের মনোভাবও একই রকম (ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৭ । প্রিন্ট সংস্করণ। দৈনিক প্রথম আলো)। পাঁচ. জানিপপ মনে করে, বর্তমান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে বাংলাদেশেও একদিন ই-ভোটিং পদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে চালু হবে। ইতিপূর্বে আমরা বলেছিলাম, ই-ভোটিংয়ের জন্য প্রয়োজন একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া। এ জন্য প্রথমেই দরকার নির্বাচন কমিশনের প্রতি সরকার ও বিরোধী দল তথা আপামর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, নতুন পদ্ধতিটিকে সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য সময় প্রয়োজন।   চতুর্থত, ই-ভোটিয়ের টেকনিক্যাল প্রেক্ষাপট অর্থাৎ কমিশনের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, ভোটিং মেশিনের মালিকানা নিশ্চিতকরণ, ভোটারদের প্রশিক্ষণদান, ভোটিং মেশিন ক্রয়ে টেন্ডারিং দুর্নীতিমুক্ত রাখা, আইসিটিবিষয়ক অবকাঠামো সৃষ্টি, সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেশন ও প্রয়োজনীয় জবাবদিহিতার ব্যবস্থা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও জরুরি (ই-ভোটিং ও ডিজিটাল প্রসঙ্গে, ২০১৩ : ১০, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা)।   তাই ই-ভোটিং ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগেও আমরা সতর্কভাবে আশাবাদী।

লেখকদ্বয় : প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, চেয়ারম্যান, জানিপপ এবং প্রফেসর ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান, ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার, জানিপপ।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow