Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৩৮
বায়তুল মোকাররমের খুতবা
ইসলাম প্রচারে আউলিয়ায়ে কিরামের ভূমিকা
মুফতি মিজানুর রহমান
সিনিয়র পেশ ইমাম
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ

সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন বিধান ইসলাম। এটি নাজিল করা হয়েছে সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে।

এটি সর্বযুগের সর্বস্তরের মানুষের জন্য চিরকল্যাণকর জীবন বিধান। কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী আসবেন না এবং আর কোনো আসমানি জীবন বিধানও নাজিল হবে না। এটিই চলমান ও কার্যকর থাকবে। এই জীবন বিধান বা দীন এবং কোরআন মজিদকে চলমান ও কার্যকর রাখার দায়িত্ব খোদ আল্লাহতায়ালাই গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি এই জিকর (কোরআন) নাজিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি তা রক্ষা করব। ’ (সূরা হিজর-৯)। ইসলাম সংরক্ষণের পূর্বশর্ত হলো কোরআন ও হাদিসের সংরক্ষণ এবং সেগুলোর প্রায়োগিক কর্মগত বাস্তবায়ন। ইহজগৎ থেকে বিদায়লগ্নে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটো বিষয় রেখে যাচ্ছি। এ দুটো মজবুতভাবে ধরে রাখলে তোমরা বিভ্রান্ত হবে না, পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসুলের সুন্নাত। বস্তুত সব মানুষের কল্যাণের জন্য ইসলামের প্রচার-প্রসার অত্যাবশ্যক। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একটি আয়াত হলেও আমার পক্ষ থেকে অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। ’ (মিশকাত)।

আল্লাহর দেওয়া এই ধর্ম ও জীবন বিধানের সংরক্ষণ ও প্রচারে প্রিয় নবী (সা.) নিজে তার সাহাবা, তাবেয়ি, তাবে তাবেয়িগণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাধ্যমতো অবদান রেখে গেছেন। এ ক্ষেত্রে উলামার ভূমিকাও প্রাতঃস্মরণীয়।

মানবসমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আউলিয়ায়ে কিরাম। ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা সর্বজনবিদিত। মানবতার কল্যাণে তারা নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দেন। তাদের সংস্পর্শে মানুষ ধন্য হয়, কল্যাণ লাভ করে। অভিশপ্ত ও বঞ্চিত যারা তারা কোনো ওলি-আউলিয়ার সংস্পর্শ পায় না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে তাদের কোনো অভিভাবক নেই এবং কোনো সাহায্যকারীও নেই। ’ (সূরা তাওবা-৭৪)।

ইসলাম প্রচারে মহান আল্লাহর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে এমন একদল হোক যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকর্মের নির্দেশ দেবে ও অসৎকর্মে নিষেধ করবে, তারাই সফলকাম। (সূরা আলে ইমরান-১০৪)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কথায় কে উত্তম ওই ব্যক্তি অপেক্ষা যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি তো মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। ’ (সূরা হা-মীম আস-সাজদা-৩৩)।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আত্মনিবেদিত আউলিয়ায়ে কিরাম ইসলাম প্রচারকে তাদের মূল লক্ষ্যরূপে নির্ধারণ করেন। তারা ওয়াজ-নসিহত, তালিম-তালকিন, ফয়েজ তাওয়াজ্জুহ এবং জাহেরি-বাতেনি পন্থায় ইসলাম প্রচার করেন। তারা ইসলামের অমূল্য বাণীসংবলিত বই-পুস্তক রচনা করেন। তারা উপযুক্ত খলিফা ও প্রতিনিধি তৈরি করে তাদের মাধ্যমে দূর-দূরান্তে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন।

আউলিয়ায়ে কিরাম প্রিয় নবী (সা.)-এর যোগ্য ওয়ারিশ ও উত্তরাধিকার। প্রিয় নবী (সা.)-এর ইলম ও জ্ঞানের তারা ধারক-বাহক। ফলে তাঁর আনীত ইসলামের প্রচারে তাদের নিরলস চেষ্টা ও সাধনা সর্বজনস্বীকৃত।

আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর জীবনেতিহাস পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম প্রচারে তার সাধনা কত বেশি বিস্তৃত ছিল। তিনি নিজে জাহেরি ও বাতেনি ইলমের সমুদ্র ছিলেন। তিনি বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেছেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি খানকাকেন্দ্রিক তালিম-তারবিয়াতের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছেন। আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) ইসলামের সৌন্দর্য, বৈশিষ্ট্য ও তত্ত্ব প্রচারে বহু বই-পুস্তক রচনা করেছেন। হজরত খাজা মুঈনদ্দীন চিশতি (রহ.) শুধু ইমান-ইসলামের প্রচারের স্বার্থেই তার জন্মস্থান ত্যাগ করে আজমিরে এসে বসবাস করেছেন। রাজা পৃথ্বীরাজের প্রবল প্রতাপকে ধূলিসাৎ করে তিনি লাখ লাখ অমুসলিমকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন। তার দরবার ও খানকাকে কেন্দ্র করে তার তালিম ও তালকিনকে অনুসরণ করে এখনো ইসলামের প্রচার ঘটছে।

ইসলামের প্রচারে ওলি-আউলিয়ার নিরলস সাধনা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশাবন্দি, আলফে সানি, খাজা নিজামুদ্দীন বখতিয়ার কাকি প্রমুখ এবং বাংলাদেশের সিলেট হজরত শাহজালাল ইয়েমেনি, চট্টগ্রামে বায়েজিদ বোস্তামি, রাজশাহীতে শাহ মখদুম, সোনারগাঁয়ে শায়খ শরফুদ্দীন আব তাওয়ামা, নোয়াখালীতে সৈয়দ ইমামুদ্দীন, ঢাকায় শাহ আলী বাগদাদি, শায়খ শরফুদ্দীন চিশতী শাহ আহসানুজ্জামান (রহ.) এবং অন্যান্য অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে সংশ্লিষ্ট আউলিয়ায়ে কিরামের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। চলমান সময়ে যখন নানারকম বাড়াবাড়ি, সীমালঙ্ঘন ও উগ্রপন্থা ইসলাম ও মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে কালিমা লেপন করছে তখন পীর, মুরশিদ ও ওলি-আউলিয়া ইসলামের শান্তির বাণী, মানবতার বাণী, অহিংস-অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা প্রচার করে যাচ্ছেন অবিরাম অবিরত। তাদের এ আহ্বান, প্রচার-সাধনা চলমান থাকুক অনন্তকাল। আমিন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow