Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : বুধবার, ৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৭ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৫৯
ঈশ্বরের বিধান
মূল : প্যাট্রিসিয়া মাক্রোমিক, অনুবাদ : কাজী মাহমুদুর রহমান

নেপালি বালিকার কথা অতি প্রত্যুষেই মোরগের রাগধ্বনির পূর্বেই সহসা আমার ঘুম ভাঙিয়া গেল। বিস্ময়ের সাথে অনুভব করিলাম কি যেন একটি অভূতপূর্ব স্রোত আমার দেহে প্রবাহিত হইতেছে।

কয়েক দিন যাবৎ আমার দেহে অচেনা শব্দ তরঙ্গের উত্থান-পতন, মৃদু-কোমল অথচ বিরামহীন শিহরিত বেদনা অনুভব করিতেছিলাম। অন্তর্গত সেই বেদনাস্রোত এখন আমার দেহের গোপন স্থান হইতে শোণিত ধারায় নির্গত হইতেছে। আমি পার্শ্বে শায়িতা নিদ্রামগ্ন আমা (মা)কে জাগাইলাম এবং শঙ্কিত কণ্ঠে আমার অবস্থা বর্ণনা করিলাম। তিনি আতঙ্ক বা বিস্ময় প্রকাশের পরিবর্তে আনন্দিত হইলেন। আমাকে আশ্বস্ত করিবার ভঙ্গিতে অনুচ্চ সতর্ক কণ্ঠে বলিলেন, হে আমার সুকন্যা লক্ষ্মী, তোমার ভীত হইবার কোনো কারণ নাই। প্রাকৃতিক নিয়মে এই প্রথম তুমি ঋতুবতী হইয়াছ। এই মুহূর্ত হইতে সপ্তদিবস পর্যন্ত তুমি অসূর্যস্পর্শা। তুমি যতক্ষণ না পবিত্র হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ব্যতীত অন্য কোনো মনুষ্যের দৃষ্টি তো দূরের কথা সূর্যের আলোকও তোমার মুখে প্রতিফলিত হইবে না।  

সূর্য উদিত হইবার পূর্বেই অতি দ্রুত আমার ব্যবহারযোগ্য কিছু হালকা পোশাক শাল, চাদর, বালিশ, কিছু বস্ত্রখণ্ড, শুষ্কখাদ্য একটি ঝোলার মধ্যে ভরিয়া আমাকে নিকটবর্তী পুরাতন ছিন্ন একটি ছাগশালায় লইয়া গেলেন। আমাদের উপস্থিতিতে নিদ্রিত ছাগেরাও সজাগ হইল এবং তাহাদের ব্যা ব্যা চিৎকারে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিতে লাগিল। ছাগশালার একটি বৃহৎ অংশ আমাদের পরিবারের পালিত ছাগল ও ছাগশাবকদের জন্য। অন্য অংশটি মাটির প্রলেপের দেয়াল দ্বারা বিভক্ত একটি ক্ষুদ্র কক্ষ যাহা ছাগ পাহারাদারদের রাত্রি যাপনের জন্য নির্ধারিত। বর্তমানে কোনো পাহারাদার নাই। ছাগশালার সর্বত্রই ছাগলের নাদি, চোনায় পরিপূর্ণ ও দুর্গন্ধময়। কক্ষের মধ্যে একটি দড়ির খাটিয়া এবং কক্ষকোণে একটি ধূলি ধূসরিত জলশূন্য কলস ও পানপাত্র। হা ঈশ্বর! এই স্থানেই আমাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে সপ্তদিবস অতিবাহিত করিতে হইবে? আমি বোধশূন্য অবস্থায় একটি প্রস্তর মূর্তির মতো দাঁড়াইয়া রহিলাম। আমা আমার হাত ধরিয়া খাটিয়ায় উপবেশন করিলেন। অভয় দানের ভঙ্গিতে বলিলেন, এই কক্ষটি যদিও আপাতত বসবাসের উপযোগী নয়, তথাপি ঝাড়ু দ্বারা ইহা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিয়া লও এবং নিজেকে পবিত্র করিতে থাকো। আমি এক্ষণে তোমাকে তোমার করণীয় কর্তব্য সম্পর্কে কিছু সদুপদেশ দিব যাহা অবশ্যই তোমাকে পালন করিতে হইবে। কারণ, অদ্য হইতে তুমি আর বালিকা নও- তুমি নারী।

কন্যার প্রতি নেপালি মাতার উপদেশ

-হে কন্যা, আমার বক্তব্য আমি পুনর্ব্যক্ত করিতেছি। ত্রয়োদশ বর্ষ পূর্ণকালে প্রাকৃতিক নিয়মে অদ্য তুমি প্রথম ঋতুবতী। তুমি আর বালিকা নও, রজঃশীলার এই মুহূর্ত হইতে তুমি নারী। তোমার যোনিতে, শোণিতে এখন বিপন্ন বিস্ময়, বেদনা ও শিহরিত অনুভূতি। আতঙ্কিত হইও না। ইহাই নারীদের স্বাভাবিক নিয়ম। অদ্য হইতে তুমি বাসগৃহে নয়, লোকচক্ষুর অন্তরালে এই ছাগশালায় সপ্তদিবস, সপ্তরজনী নিভৃতে অবস্থান করিবে। রজঃশীলা কাল অতিক্রান্ত এবং পবিত্র না হইবা পর্যন্ত পৃথিবীর সকল আলো বাতাসের অর্গল তোমার জন্য রুদ্ধ। হে ঋতুবতী কন্যা অদ্য হইতে তোমার জীবনের এক নব অধ্যায়ের সূচনা। তুমি এখন আর চঞ্চলা ছাগশিশু নও, বায়ু আন্দোলিত বৃক্ষশাখার পত্রপুষ্প নও। সুতরাং নিজেকে আবৃত করো পশমি আচ্ছাদনে। অবনত মস্তকে সদাসর্বদা হও লজ্জাশীলা, নম্র ও অনুগতা। সরাসরি দৃকপাত করিও না কাহারও চক্ষুর প্রতি। পরিবারের সদস্য নয় এমন কোনো ব্যক্তির সহিত কখনো একাকী দু’দণ্ডের জন্যও অবস্থান করা তোমার জন্য নিষিদ্ধ। ঋতুকাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তুমি ভুলক্রমেও ক্ষেতের শস্য, ফলন্ত শসা ও কুমড়ার প্রতি দৃষ্টি দিও না। অন্যথায় তোমার দৃষ্টিঘাতে তাহা বিনষ্ট হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে।

তুমি পবিত্র হইবার পর আমাদের বাসগৃহে তুমি স্বাগত। এখন আমাদের দায়িত্ব তোমার বিবাহের পাত্র অনুসন্ধান।

তোমার বিবাহের পর তোমার স্বামীই হইবেন ঈশ্বরের ন্যায় ধ্যান-জ্ঞান তোমার একান্ত পুরুষ। মনে রাখিও তিনি আহার না করা পর্যন্ত তুমি অভুক্ত থাকিবে। তিনি আহার সম্পন্ন ও ঢেঁকুর উদগিরণ করিলে বুঝিবে তিনি তৃপ্ত। অতঃপর তুমি তাহার পাত্রের উচ্ছিষ্ট আহার করিবে।

রাত্রিকালে তিনি তোমাকে শয্যায় আহ্বান করিলে তুমি অবশ্যই দ্বিধাহীন চিত্তে তোমাকে সমর্পণ করিবে এবং কায়মনোবাক্যে এই প্রার্থনাই করিবে যেন ঈশ্বর তোমাকে পুত্রবতী করেন।

যদি তোমার সন্তান পুত্রসন্তান হয় তাহা হইলে সন্তানকে চতুর্থ বর্ষকাল পর্যন্ত স্তন্যদুগ্ধ পান করাইবে। যদি কন্যা সন্তান হয় তবে তাহাকে শুধুমাত্র এক বর্ষকাল স্তন্যদুগ্ধ দান করিবে যাহাতে তোমার দেহ প্রস্তুত হইতে পারে পুত্র সন্তান ধারণের আকাঙ্ক্ষায়।

যদি তোমার স্বামী তোমাকে তাহার পদযুগল ধৌত করিবার আহ্বান জানান তুমি অবশ্যই তাহা পালন করিবে এবং পদধৌত যৎসামান্য জল তুমি পান করিবে।

মাতার উপদেশ শেষে কন্যা ক্ষণকাল বিস্ময়াভূত, নিস্তব্ধ। তাহার পর ক্ষুদ্র প্রশ্ন আমা, নারীদের জন্য কেন এত নির্দেশ, কেন এত দুর্ভোগ?

নারীদের জন্য ইহাই ঈশ্বরের বিধান। ইহাই নারীদের নিয়তি; মাতার সংক্ষিপ্ত উত্তর।

(প্যাট্রিসিয়া ম্যাকক্রোমিক রচিত সোল্ড উপন্যাসের একটি ক্ষুদ্র অংশবিশেষ। উপন্যাসটি সাধু ভাষায় রচিত হইল। কেননা ঈশ্বর সাধারণ চলতি ভাষায় কোনো বিধান জারি করেন না। )

এই পাতার আরো খবর
up-arrow