Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৪৩
ডাকসু নির্বাচন : রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন
এ কে এম মাঈদুল ইসলাম, এমপি
ডাকসু নির্বাচন : রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনে খুবই খুশি হলাম এবং দেশবাসী বোধহয় আমার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিঃসন্দেহে একজন জ্ঞানী, গুণী, সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ।

সারা জীবন জনগণের কথা বলেছেন। সংসদে থেকে বহু বছর বলেছেন। স্পিকার হওয়ার পর পুরো সংসদকে তিনি প্রাণবন্ত করে রেখেছিলেন। সবাইকে হাসাতেন। খুব সুন্দরভাবে তিনি সংসদ পরিচালনা করেছিলেন। হঠাৎ রাষ্ট্রপতি হওয়ায় তিনি মন খারাপ করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি কী করেছি যে, আপনারা আমাকে নজরবন্দি করে রাখছেন!’ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর মন খারাপ করে থাকার জন্য আমরা অনেকেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছিলাম যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকার সম্মান আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন। আপনার শুকরিয়া আদায় করা দরকার। আপনি যদি অখুশি হন তাহলে আল্লাহ আপনার ওপর অসন্তুষ্ট হবেন।

সত্যি সত্যি বঙ্গভবনে যাওয়ার পর প্রাণচঞ্চল এ লোকটি একা হয়ে পড়লেন। যিনি সারা জীবন গ্রামের লোকের সঙ্গে মিশেছেন, সংসদে সবার সঙ্গে মিশেছেন, দেশ-বিদেশের সবার সঙ্গে মিশেছেন; তিনি এখন একা। আমার সঙ্গে দেখা হলে তিনি বলেন, ‘আপনারা আসেন না কেন?’ যাই হোক, এটা তার জন্য একটা সমস্যা। এরপর তার জন্য যা সবচেয়ে বড় সমস্যা তা হলো, তিনি কোনোখানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলতেন, ‘আমার লেখার দায়িত্বে যারা আছেন তারা আমাকে যা লিখে দিয়েছেন তার বেশি একটি লাইনও বলতে পারব না, একটি কথাও বলতে পারব না। যা লিখে দিয়েছেন তা আপনাদের সামনে পড়ছি। ’

জাতীয় সংসদে যে তিনি প্রতি বছর ভাষণ দেন তা অনেক বড়। সাধারণত সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রেসিডেন্টের দিকনির্দেশনামূলক ভাষণটি খুব ছোট আকারে দেন। কিন্তু যেহেতু তিনি সব জায়গায় বলতে পারেন না, এখানে বলার একটা সুযোগ থাকে, সে কারণে তিনি সংসদে দীর্ঘ ভাষণ দেন। ভাষণটি আমরা মনোযোগের সঙ্গে শুনি। তখন ভাবী, ভদ্রলোক লিখিত বক্তব্যের বাইরে তো আর কিছু বলতে পারবেন না। আমরা শুনে তার ভাষণের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা করি। এটাই স্বাভাবিক।

 

 

মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের সংবিধানে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে সব ক্ষমতাই দেওয়া আছে। কিন্তু সবই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে করতে হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য চলাকালে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি লিখিত বক্তব্যের বাইরে কিছু বলতে চাই। ছাত্র রাজনীতি যারা যারা করে, তাদের রেগুলার ছাত্র হতে হবে। ৫০ বছর বয়সে যদি নেতৃত্ব দেয়, তাহলে যারা পড়ে তাদের সঙ্গে অ্যাডজাস্টমেন্ট হবে না। সুতরাং ডাকসু নির্বাচন ইজ অ্যা মাস্ট। নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। ’ আমি শুনে খুব আনন্দিত হলাম। এখন এটা যারা লেখার দায়িত্বে আছেন তারা কি লিখে দিয়েছেন, নাকি তিনি নিজে বলেছেন? আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, এটা তার নিজের কথা, মনের কথা, সত্যিকারের কথা।   জাতির বৃহত্তর স্বার্থের জন্য বলেছেন। দেশবাসী আশা করে ডাকসুসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক। এখান থেকে নেতৃত্ব বা দায়িত্ববান হওয়ার সুযোগ থাকে। ছাত্র সংসদ চালু না হলে পরবর্তী প্রজন্ম সত্যি সত্যি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়বে। আমাদের সময়ে নির্বাচনের মাধ্যমে যে ছাত্র সংসদ প্রতিনিধি হয়েছে, সে নির্বাচনে কোনোরকম কারচুপির অভিযোগ শুনিনি। অর্থাৎ ছাত্রজীবনেই সঠিক নির্বাচন করার একটা পদ্ধতি গড়ে উঠেছিল। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান, ডিবেট, নাটক, গান, সিম্পোজিয়াম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস পালন ইত্যাদি বহু অনুষ্ঠান হতো। ছাত্র সংসদের বাজেট ছিল। বাজেটের হিসাব হতো। এতে তারা নিজেরা নিজেদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন থাকত। ছাত্রজীবনের পরে বাস্তব জীবনে এসে তারা এ রকম স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববানের প্রয়োগ করতে পারত, যা জাতীয় জীবনে অপরিহার্য।

আমি জানি না, কেন এ নির্বাচন দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা আছেন তাদেরও মনমানসিকতায় এ ব্যাপারে কিছুটা স্বেচ্ছাচারিতা রয়েছে বলে মনে হয়। তারাও চান না যে নির্বাচন হোক। কেননা, ছাত্র প্রতিনিধি থাকলে তারা হিসাব-কিতাব দেখবেন, কথাবার্তা বলবেন, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন। অবশ্যই ভিসি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হবে। ডাকসু ছাড়াও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্র সংসদ, ম্যাগাজিন, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে ছাত্রদের কাছ থেকে ফি নেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ টাকাপয়সা সঠিকভাবে ব্যয় হয় বলে আমার মনে হয় না। ছাত্ররা যেভাবে ব্যয় করতে চায় সেভাবে ব্যয় হয় না। হাইস্কুলগুলোয় ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে নানাভাবে অধিক হারে টাকা নেওয়া হয়। দরিদ্র মানুষ তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে কষ্ট করে টাকা দেন। কিন্তু শিক্ষকরা এগুলো কীভাবে ব্যয় করেন তা কেউ জানে না। এভাবে ছাত্র সংসদ থাকবে না, ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে না; দেশে এটা কী হচ্ছে তা ভাববার বিষয়।

আমি কোনো আইনজ্ঞ নই। আমি মনে করি এ ভাষণ মহামান্য রাষ্ট্রপতির একটি দিকনির্দেশনা সরকারের জন্য, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য। সরকার যদি এটা না মানে তাহলে সংবিধানের লঙ্ঘন হবে বলে মনে করি। আশা করব মহামান্য রাষ্ট্রপতির এ দিকনির্দেশনা কাজে লাগিয়ে অতিসত্বর ডাকসুসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।

     লেখক : সাবেক মন্ত্রী।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow