Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৪৫
ধর্মতত্ত্ব
মুক্তিযুদ্ধের অর্জন
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
মুক্তিযুদ্ধের অর্জন

পাকিস্তান ইসলামী হুকুমত কায়েম করার জন্য এ অঞ্চলে আসেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠালগ্নে হজরত মাদানি (রহ.) তার দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দ্বারা এ কথা আঁচ করে নিতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তান প্রস্তাবের পেছনে মূলত কাজ করছে সাম্রাজ্যবাদের দোসর, পুঁজিপতি ও বুর্জুয়া শ্রেণির ক্ষমতালিপ্সা।

কেননা যে নেতৃবৃন্দ জীবনে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলতে আগ্রহী নন, তারা কী করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী হুকুমত কায়েম করবেন? (দেওবন্দ আন্দোলন : ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান, পৃ. ২৩৭)।

১৯৭১-এ ইসলাম ও মুসলমানই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। শহীদজননী জাহানারা ইমাম লিখেন, ‘এক মহিলা রোগীর কাছে শুনেছিলাম তিনি নামাজ পড়ছিলেন, সেই অবস্থায় তাকে টেনে র‌্যাপ করা হয়। আরেক মহিলা কোরআন শরিফ পড়ছিলেন, শয়তানরা কোরআন শরিফ টান দিয়ে ফেলে তাকে  র‌্যাপ করে। ’ —একাত্তরের দিনগুলি, পৃ. ১২৩।

দেশের শ্রদ্ধাভাজন আলেম সমাজও মাতৃভূমি রক্ষার এ যুদ্ধে শরিক ছিলেন। সৈয়দ আবুল মকসুদের ভাষায়, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আলেম-ওলামা ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভূমিকা স্মরণীয়। পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ঘাতক দালাল, রাজাকার-আলবদর প্রভৃতি অন্য এক প্রজাতি। তারা ঘৃণার পাত্র।

আলেম-ওলামারা ধর্মনির্বিশেষে সব মানুষেরই অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন। ’ সৈয়দ আবুল মকসুদের কলাম, ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’, প্রথম আলো। (০৭.০৪.২০১৩)। সম্প্রতি আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে একটি বইও বাজারে পাওয়া যায়, আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে— শাকের হোসাইন শিবলী। প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার এ বইটি পড়লে আশা করি বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে।

এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মুসলমানদের স্বাধীনভাবে ইসলাম পালন করার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ’৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলার ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন. ‘আমি মুসলমান; আমার বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। ’ আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ. ৬০৫ লেখক : আবুল মনসুর আহমদ। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। ইন্দোনেশিয়ার পরই এর স্থান। মুসলিম জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভারতের স্থান তৃতীয় এবং পাকিস্তানের স্থান চতুর্থ। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ইসলামের নামে এ দেশের মুসলমানদের হত্যা করেছে, আমাদের নারীদের বেইজ্জতি করেছে। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না। ’ বঙ্গবন্ধু ও ইসলামী মূল্যবোধ, পৃ. ১৩, লেখক : মাওলানা আবদুল আউয়াল। এ থেকে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধ চেতনার অংশ ইসলাম ও মুসলমানকে হেফাজতও ছিল। এর ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ইসলামী মূল্যবোধকে সম্মান দেখিয়ে বঙ্গবন্ধুর আমলে মদ, জুয়া, ঘোড়দৌড়ের নামে জুয়াসহ অনেক ইসলামবিরোধী কার্যক্রম আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়। পুনর্গঠন করা হয় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, সম্প্রসারণ করা হয় কাকরাইল মসজিদ। তুরাগপাড়ের বিশ্ব ইজতেমার নির্ধারিত জায়গাটির অনুমোদন হয় বঙ্গবন্ধুর হাতেই। দেশের জাতীয় মসজিদের সম্মান রক্ষার্থে বায়তুল মোকাররমের পাশ থেকে স্পোর্টিং ক্লাবগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়। ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও প্রচার প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মসজিদ, মাদ্রাসা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে স্বাধীনতার আগে ঢাকায় হাজারখানেক মসজিদ ছিল— দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ, পৃ. ২৪। বর্তমানে বলা যায় যে, সারা দেশে সাড়ে চার লাখ মসজিদ রয়েছে। (আমার দেশ ২১.০২.২০১৩)। ইসলামী ফাউন্ডেশনের হিসাবমতে ঢাকায় মসজিদের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। (যুগান্তর অনলাইন ১০ জুলাই, ২০১৪)। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই ধর্মপ্রবণ ও ধর্মভীরু। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকটি মাদ্রাসা ছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৭১ সালে সরকারি মাদ্রাসার মোট সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৭৫টি, ২০০৭ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪৯৩টিতে। আর ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০ হাজারের বেশি কওমি মাদ্রাসা গড়ে ওঠে।

স্বাধীনতার কল্যাণে বাংলা ভাষায় এখন যে কোনো বিষয়ে মানসম্মত ধর্মীয় বইপুস্তক পাওয়া যায়। স্বাধীনতার অন্যতম সুফল হলো মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। এমনকি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় যেমন ঐতিহাসিক ওহুদ প্রান্তর, জান্নাতুল বাকিতে অন্যান্য ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষা স্থান পেয়েছে। আরাফার ময়দানে, (যা দোয়া কবুল হওয়ার পবিত্র স্থান বলে হাদিসে বর্ণিত আছে) হাজীরা বাংলাদেশি নিম গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন।

বাংলার সোনার ছেলেরা বিশ্বব্যাপী কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল করছে। এ ছাড়া মানসম্মত হাফেজ, ইমাম নিয়োগের জন্য অন্যান্য দেশের মতো প্রতি বছর বাংলাদেশের দ্বারস্থ হচ্ছে কাতার, সৌদি আরবের মতো আরব দেশগুলোও। ইদানীং শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশেই নাকি সবচেয়ে বেশি হাফেজ তৈরি হচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ, এর সবই স্বাধীনতার সুফল। হয়তো এমন একটি সোনালি দিনের আশায়ই বাংলার দামাল ছেলেরা ’৭১-এ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন।   আল্লাহ তাদের এই ত্যাগ কবুল করুন।

     লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow