Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ মার্চ, ২০১৭ ২৩:০৬
পাঠক কলাম
গৃহকর্মী সুরক্ষা
তপন কুমার ঘোষ
গৃহকর্মী সুরক্ষা

গত মাসের ঘটনা। ধানমন্ডির একটি বাসায় এক কিশোরী গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী একটি মুঠোফোন চুরির অপবাদে গৃহকর্ত্রী তাকে বকুনি দেন। গৃহকর্ত্রীর ভাষ্যমতে বকুনি খেয়ে ওই গৃহকর্মী ঘরের দরজা লাগিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগায়। তার কোনো সাড়া শব্দ না পাওয়ায় দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যান থেকে তাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অনেকটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে এই বর্ণনা। ময়নাতদন্তে রিপোর্ট থেকেই জানা যাবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ।

‘গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু’— এই শিরোনামে মাঝে মধ্যেই খবরের কাগজে প্রতিবেদন ছাপা হয়। একই কাহিনী। শুধু ঘটনাস্থল ভিন্ন। এসব ঘটনার পর থানায় যথারীতি অপমৃত্যুর মামলা হয়। তদন্ত হয়। গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে নির্যাতনকারীকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেফতারও করা হয়। এর পরের ঘটনা প্রবাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অজানাই থেকে যায়। গৃহকর্মী নির্যাতনের দায়ে শাস্তি হয়েছে এমন নজির কম। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সাক্ষ্য প্রমাণের অভাব এর প্রধান দুটি কারণ।

কাজের ছেলেমেয়েদের ওপর নির্যাতনের সব কাহিনীই যে পত্রিকার পাতায় ছাপা হয় এমন নয়। একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে তবেই না ঘটনা অনেক দূর গড়ায়। হাসপাতাল ও পুলিশের খাতায় নাম ওঠে। পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়। নির্যাতন যখন মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন এই হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়। তর্কের খাতিরে এসব হত্যাকাণ্ডকে যদি আত্মহত্যা বলে স্বীকার করেও নেওয়া হয়, তবুও প্রশ্ন উঠে, এ আত্মহত্যার জন্য দায়ী কে? কোন পরিস্থিতিতে এই হতভাগ্য কিশোর-কিশোরীরা বেছে নেয় আত্মহননের পথ? কেন তারা জীবনের প্রতি এতটা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে? কারা ঠেলে দেয় তাদের এ পথে? আত্মহত্যার প্ররোচনায় সাজা হয়েছে এমন নজিরও এদেশে খুব বেশি নেই।

কাজের ছেলেমেয়েদের প্রতি করুণার বশবর্তী হয়ে আমরা গৃহকর্মে নিয়োজিত করি এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এরা সারা দিন আমাদের ফায়-ফরমায়েশ খাটে। একটুও অবসর নেই। এরা শ্রম দেয়। শ্রমের বিনিময়ে চায় একটুখানি আশ্রয়, দুবেলা দুমুঠো অন্ন। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এদের যেমন প্রয়োজন আছে আশ্রয়ের, অন্ন-বস্ত্রের, তেমনি আমাদেরও প্রয়োজন আছে তাদের শ্রমের, সেবার।

খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, গৃহকর্মে নিয়োজিত ছেলেমেয়েদের কেউ পিতৃছাড়া, কেউ মাতৃহারা, আবার কেউবা স্বামী পরিত্যক্তা। এদের মধ্যে কিশোর-কিশোরীর সংখ্যাই বেশি। যে বয়সে বাবা-মার আদর সোহাগে বেড়ে ওঠার কথা, সহপাঠীদের সঙ্গে দল বেঁধে স্কুলে যাওয়ার কথা, খেলার মাঠে হৈ-হুল্লা করে কাটানোর কথা, সে বয়সেই এরা নিতান্তই প্রাণে বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ খুঁজে নেয় পরের বাড়িতে। এদের চাওয়া-পাওয়া খুবই সামান্য। এরা চায় একটুখানি স্নেহ, ভালোবাসা। ওই বয়সের দাবি এটা। অথচ এই দাবি উপেক্ষা করে অতি তুচ্ছ কারণে পরের সন্তানের গায়ে হাত তোলা হয় কোন অধিকারে? ছোটখাটো ভুল-চুক যে এরা কখনই করে না এমন কথা কেউ বলেন না। কিন্তু এ ধরনের ভুল-চুকের শাস্তি তো আর নির্যাতন হতে পারে না যা কিনা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কাজের ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে প্রায়শই টাকা পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ আনা হয়। এসব ব্যাপারে একটু সাবধানতা অবলম্বন করলেই তো হয়। কিন্তু তা না করে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে অসহায় শিশু-কিশোরদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের পথ বেছে নেওয়া কি সংগত আচরণের পর্যায়ে পড়ে? কারও বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলে দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় গ্রহণ করা যেতে পারে। সুষ্ঠু তদন্তের পর দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত তাকে যথাযথ শাস্তি দেবে- এটাই তো নিয়ম। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করে গরিবের সন্তানের প্রতি কারণে-অকারণে যে আচরণ করা হয় তা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ন্যায়-অন্যায়ের বিবেচনাবোধও আমাদের মাঝে আর কাজ করছে না।

আমাদের জনগোষ্ঠীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে গৃহকর্মে নিযুক্ত আছেন। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও কল্যাণার্থে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। নীতিমালায় গৃহকর্মী নিয়োগের চুক্তি, মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি, বিশ্রাম, বিনোদন, প্রসূতিকালীন সুবিধা, চিকিৎসা সেবা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, অবহিত না করে গৃহত্যাগ কিংবা চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার ক্ষেত্রে করণীয়, নিয়োগকারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য, গৃহকর্মীর দায়িত্ব ও কর্তব্য, অভিযোগ জানানো, চাকরির অবসান ইত্যাদি বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে।

নীতিমালা যেন শুধু কথার কথা না হয়। নীতিমালা বাস্তবায়নে সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি তা যথাযথভাবে পরিপালনের দায়িত্বও আমাদের। গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন হলেও পরিস্থিতি বিশেষ বদলাবে কি? কেবল শাস্তি দিয়ে অপরাধ দমন করা যায় না। আইনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে আমাদের ‘মাইন্ডসেট’ অর্থাৎ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। গৃহকর্মীদের প্রতি আমাদের আরও সদয় ও মানবিক হতে হবে। কবে আর হবে আমাদের চৈতন্যেদ্বয়?

লেখক : সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), জনতা ব্যাংক লি.

এই পাতার আরো খবর
up-arrow