Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০২
অসাম্প্রদায়িকতা ও অহিংসার ঐতিহ্য অম্লান হোক
লে. জে. মাহবুবুর রহমান (অব.)
অসাম্প্রদায়িকতা ও অহিংসার ঐতিহ্য অম্লান হোক

শাশ্বত বাংলার সনাতন ঐতিহ্য তার অহিংসা ও অসাম্প্রদায়িকতা। বাংলাদেশে ব্রিটিশরা রাজত্ব করেছে দুইশ বছর।

তারা বাংলার ভূখণ্ড দখল করেই ভারতবর্ষের অন্যান্য এলাকায় উপনিবেশ ও আধিপত্য সম্প্রসারণ করে। ব্রিটিশরা ভারতে ডিভাইড অ্যান্ড রুল-নীতি নিয়ে দেশ শাসন করেছে। ১৯৪৭ সালে শুধু ধর্মের ভিত্তিতে উপমহাদেশ ভাগ করা হয়। এ সময় আমরা দেখেছি রক্তপাত, সহিংসতা, অপ্রীতিকর ও বিষাদঘন এক অধ্যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার ছাপ এখনো পুরোপুরি মিশে যায়নি।

দেশ ভাগ হয়েছিল গণতন্ত্রের ভিত্তিতে। সিলেট পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত হয় সে জন্য সেখানে গণভোট হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের পর পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কর্তৃত্ববাদ ও আধিপত্যবাদের শিকার হয়। পাঞ্জাবি উন্নাসিকতা ও শোভেনিজম আমাদের ওপর চেপে বসে।

এটা ছিল আমাদের অধিকার ও মর্যাদার ওপরে বড় আঘাত। সে সময়ে পাকিস্তানের মোট লোকসংখ্যায় বাঙালিরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারপরেও আমরা দেখেছি সীমাহীন অবহেলা, বৈষম্য ও অমর্যাদা। আমরা নানাভাবে বঞ্চিত ও শোষিত হয়েছি। শোষণ-বঞ্চনা ছিল রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, ছিল সমাজনীতিতেও। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এটা আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। এখানকার জনগণ স্বাধিকার প্রশ্নে সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে। এ সংগ্রামে পুরোভাগে নেতৃত্ব দিয়েছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরও অনেকে।

আমাদের ভূখণ্ডের রয়েছে মহান সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি। এ জনপদ প্রাচীন। এখানে রেনেসাঁ বার বার এসেছে। অনেক জ্ঞানী, গুণী, মহান ব্যক্তির জন্ম হয়েছে যাদের অবদান ভারতবর্ষের সীমানা ছাড়িয়ে সমৃদ্ধ করেছে বিশ্ব সভ্যতাকে। চীন, ব্রহ্মদেশ, শ্যামদেশ, শ্রীলঙ্কায় তা ছড়িয়েছে। ছড়িয়েছে সুমাত্রা, জাভাসহ সুদূর ইন্দোনেশিয়ায়। এ জনপদেই মহামতি গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছেন। প্রচার করেছেন অহিংসার বাণী। তিনি বলেছেন অহিংসা পরম ধর্ম, সর্বজীবে দয়া কর। তিনি শান্তির অমীয় বাণী প্রচার করে সমগ্র মানবজাতির কাছে এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন।

এ বাংলায়ই পাল রাজারা চার শতাধিক বছর রাজত্ব করেছেন। তারা বাংলাদেশের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, মানবতাবাদ, অহিংসা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন। শান্তি, ভালোবাসা, ক্ষমা ও সম্প্রীতির কথা প্রচার করেছেন। সে ছিল বিশ্ব সভ্যতায় বাংলাদেশের এক সুবর্ণ যুগ। এ ভূখণ্ডে এক সময়ে পবিত্র ইসলাম ধর্ম বিস্তার লাভ করে। ইসলাম প্রচারকরা অস্ত্রের বলে নয় শান্তি ও মানবতার কথা প্রচার করে দলে দলে মানুষকে আকৃষ্ট করেছেন। তাদের কাছ থেকে মানুষ জেনেছে সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, ন্যায় ও সাম্যের কথা। সুফি-সাধক, পীর-আউলিয়ারা পবিত্র এই ধর্মের ক্ষমার মর্মবাণী তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে আমরা বলতে পারি সিলেটের হজরত শাহজালাল ও আজমীর শরিফের খাজা মাঈনুদ্দিন চিশতী অহিংসা ও ক্ষমার কথাই বলেছেন। আমাদের এই ভূমিতেই সত্যের সন্ধান করেছেন শ্রী চৈতন্য দেব। তিনি ভালোবাসা ও ক্ষমার বাণী প্রচার করেছেন। আমরা এখানে শুনেছি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের কথা। স্বামীজী মানবতার ব্রত নিয়ে গোটা ভারতবর্ষ পরিভ্রমণ করেছেন। সত্য ও সুন্দরের জয়গান করেছেন। তিনি বলেছেন একমাত্র মানবতাই আমার ধর্ম। বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার সন্তান ফকির লালনশাহ, তিনি মানবতার সাধনা করেছেন। তার গানে ও গীতিতে যে দর্শন রয়েছে তার মূলকথা মানবতার ওপরে কিছু নেই। তিনি মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।

 

 

আমি বেদনাহত চিত্তে এ কথাও বলতে চাই যুগে যুগে সম্প্রীতির লীলাভূমি বলে পরিচিত ছিল যে ভূখণ্ড আমাদের তাতে বিঘ্নও ঘটেছে মাঝে মধ্যে। ঘটেছে হানাহানি ও রক্তপাত। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাংলার মানুষই এটা হতে দেয়নি। তারা সহিংসতা হানাহানি প্রতিহত করে অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে। পাকিস্তানের প্রতিকূল সময়েও অশুভ শক্তি বিস্তার লাভ করতে পারেনি। একপর্যায়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জাতিসত্তার বিকাশ ঘটে, জাগরণ সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক দুঃশাসন মোকাবিলা করে এ দেশের জনগণ স্বাধীনতার প্রশ্নে সোচ্চার হয়। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করে স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতাই আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। চরম আত্মত্যাগ করে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। দেশবাসী চেয়েছে সত্যিকারের গণতন্ত্র। চেয়েছে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। পরিতাপের বিষয় দেশ স্বাধীন হয়েছে সবার এক সাগর রক্তে অবগাহিত হয়ে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এখনো গঠন করা যায়নি। আরও দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় পাকিস্তান আমলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এতটা বিনষ্ট হয়নি। আমরা একসঙ্গে লড়েছি, রক্তাক্ত প্রান্তরে একসঙ্গে শত্রুর মোকাবিলা করেছি, ধর্মের কারণে আমাদের বিশ্বাস আস্থায় ছেদ পড়েনি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র ব্যাহত হলো। একদলীয় শাসন চালু হলো। সামরিক শাসন এলো। স্বৈরশাসনের বিস্তার ঘটল। এ কথাও ঠিক বহুদলীয় গণতন্ত্র এদেশে চলেছে নিরবচ্ছিন্নভাবে বেশ দীর্ঘ সময় ধরে। তবে সত্যিকারের গণতন্ত্র, শোষণ-বঞ্চনাহীন এক সমাজ, সবার বিকাশের সমান সুযোগ সেটা এখনো অর্জন করা যায়নি। এটা ভাগ্যের পরিহাস! আমরা জানি যে হিন্দু, খ্রিস্টান, আদিবাসী তাদের অনেকেই অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এ অবস্থা কেবল তাদের নয় এটা জাতীয় সমস্যা কোনোভাবেই লঘু করে দেখার সুযোগ নাই। ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলো তখন সংখ্যালঘুরা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। তারপর ক্ষয় হতে লাগল। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগল ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়। তখন শত্রু সম্পত্তি (পরে অর্পিত সম্পত্তি) আইন জারি করা হলো। এর মধ্যেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সময় তাদের সংখ্যা ছিল ২০ শতাংশের মতো। তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা এখন বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এটা গভীর উৎকণ্ঠার বিষয় বৈকি। আমার জন্ম দিনাজপুর জেলায়। বিরল, বোচাগঞ্জ, কাহারোল এসব ছিল হিন্দু ও সাঁওতাল অধ্যুষিত। এদের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি, পড়াশোনা করেছি, খেলাধুলা করেছি। এদের অনেকে খুব বুদ্ধিমান ও মেধাবী ছাত্র ছিল। যতিন, যোগেন, সুপেন, নির্মল, সুভাস এরা সব কোথায় হারিয়ে গেল। বাংলাদেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ভারতে চলে যাচ্ছে এটা স্বীকৃত। সাঁওতালরাও প্রান্তসীমায় অবস্থান করছে। তারাও হারিয়ে যাচ্ছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে নির্মম সাঁওতাল নির্যাতন অতি সাম্প্রতিক এক ঘটনা।

কিন্তু এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে মানুষের চরিত্রে তো সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। অসাম্প্রদায়িকতা শাশ্বত বাংলাদেশের সনাতন ঐতিহ্য। আমরা হাতে হাত ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে একই গ্রামে বড় হয়েছি। অসাম্প্রদায়িকতা অহিংসতা আমাদের আবহমানকালের ঐতিহ্যে। এ চেতনা আবিষ্কার করি কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখায় ও কবিতায়। তাকে আমি মনে করি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আইকন। তাই নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। নজরুলের পুরো সাহিত্য কর্মজুড়ে মানবতা ও সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তির প্রতিফলন। আর এটাইতো ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আরেক মহান বাঙালি অগ্নিপুরুষ নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণা। তিনি বলেছিলেন, আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিব। সশস্ত্র আজাদহিন্দ ফৌজ তিনি গঠন করেছেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন। ভারতবর্ষের অনেক অঞ্চল মুক্ত করেছেন। তার আজাদহিন্দ বাহিনী বার্মা হতে অভিযান চালিয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। ইম্ফল কোহিমা অঞ্চল মুক্ত করে। নেতাজীর সহযোদ্ধা ছিলেন ক্যাপ্টেন শাহনেওয়াজ।

বাংলার এ জনপদ আবহমানকাল ধরে ইতিহাসে এক সামাজিক সম্প্রীতির সুখী সমৃদ্ধ দেশ। পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, কুশিয়ারা, সুরমাবিধৌত বঙ্গোপসাগরের বিশাল উপকূলজুড়ে বাংলার এ বদ্বীপ ঈশ্বর নির্মিত এক অনবদ্য পুণ্যভূমি। হাজার বছর ধরে বাংলার সংস্কৃতি শান্তির সম্প্রীতির। বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী, আদিবাসী সবার মাতৃভূমি। সবার দেশ বাংলাদেশ। হাজার বছর ধরে বাংলাদেশ বিশ্বে পরিচিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অপূর্ব লীলাভূমি বলে। ধর্মীয় চেতনা এখানে মানুষকে উদার করেছে। মহানুভব করেছে। দয়াবান ও ক্ষমাশীল করেছে। করেছে পরমতসহিষ্ণু। সব ধর্মই প্রেমপ্রীতি আর ভালোবাসার কথা বলেছে। মানবতার দীক্ষা দিয়েছে। শুনিয়েছে, শোনহে মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। শিক্ষা দিয়েছে নরের মধ্যে নারায়ণ, নর রূপে নারায়ণ। ইসলাম বলেছে নরহত্যা মহাপাপ, শিখিয়েছে প্রতিশোধ নয় ক্ষমা কর। ক্ষমাই শ্রেষ্ঠ। বলেছে প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে আহার করা হারাম। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, অহিংসা পরম ধর্ম, সর্বজীবে দয়া কর। বাংলাদেশের হাজার বছরের সমাজ ও সংস্কৃতি এ দর্শন, এ বিশ্বাস ও এ ঐতিহ্যের ভিত্তির উপরেই গড়ে ওঠা। এটাই জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার মন ও মনন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যুগ যুগ ধরে বাংলার জাতীয় বৈশিষ্ট্য। বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস বাংলার রূপ দেখেছিলেন। কবিতা লিখেছিলেন, বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ দেখিতে চাহিনা আর। রূপসী বাংলা আজ বিবর্ণ, উসর, ধূসর। সবুজে সবুজ, ছায়াঢাকা, পাখিডাকা, শান্তির নীড় এ বাংলা আজ নষ্ট নীড়। রবীন্দ্রনাথের অনেক ভালোবাসার সোনার বাংলা এখন এক শ্রীহীন বাংলা।

বাংলাদেশ আজ অশান্ত। শান্তি বিঘ্নিত। চারদিকে অস্থিরতা। সামাজিক সংঘাত, ধর্ম ও জাতি গোষ্ঠীগত ঘৃণা, সহিংসতা, হানাহানি। সন্ত্রাসবাদের বল্গাহীন বিস্তার। শান্তি সম্প্রীতি সুদূর পরাহত। স্থিতিশীলতা বিপজ্জনকভাবে বাধাগ্রস্ত। নীতি ও মূল্যবোধের প্রচণ্ড শূন্যতা। হিংসায় উন্মত্ত বাংলাদেশ। আমরা উদ্বিগ্নতার সঙ্গে লক্ষ্য করছি এক কদর্য ও সাম্প্রদায়িকতার নগ্ন উত্থান এখানে ঘটে চলেছে। প্রত্যক্ষ করছি, আবহমানকালের বাংলার ঐতিহ্যে বিশাল ফাটল। প্রতিদিন মিডিয়ায় দেখছি ভিন্নমতের, ভিন্ন আদর্শের, ভিন্ন পথের অনুসারীরা নিগৃহীত হচ্ছে। হিন্দু পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু, খ্রিস্টান ধর্মযাজক, শিয়া ইমাম, সুফি সাধক, বাউল, গায়ক নির্যাতিত হচ্ছে। নৃশংসভাবে মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। মন্দির, গির্জা, উপাসনালয় আগুনে ভস্মীভূত হচ্ছে। বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছে, রক্তপাত ঘটছে, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। দেবদেবীর প্রতিমা, যিশুর মূর্তি, বৌদ্ধের প্রতিকৃতি ক্ষতবিক্ষত, চূর্ণবিচূর্ণ করা হচ্ছে। আরও দেখি অবুঝ নিষ্পাপ স্বর্গ শিশুরা হত্যার শিকার হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত। পৈশাচিক উন্মাদনায় ধর্ষিত হচ্ছে নারীরা, শিশুকন্যারা, বৃদ্ধারাও। আর ধর্ষণ শেষে হত্যা হচ্ছে নিশ্চিত ও অবধারিতভাবে। এর কোনো ব্যত্যয় নেই। হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে, স্ফীত হচ্ছে। সংক্রামক রোগের মতো এর ভয়াবহতা, এর ব্যাপকতা গোটা জাতিকে শঙ্কিত করে তুলেছে। হত্যাকাণ্ড এক মহা হত্যাযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। মানুষের হিংসা, বিদ্বেষ, অর্থগৃধ্নুতা, সীমাহীন লালসা, পারস্পরিক ঘৃণা, পশুত্বের সর্বনিম্ন পর্যায় নেমে গেছে। পশুরাই আজ অনেক মানবিক। মানুষ পাশবিক। হিংসার বিষবাষ্পে সমাজ বিষাক্ত। উদগ্র লোভে লালসায় মানুষ উন্মত্ত। চতুর্দিকে শুধু হানাহানি রক্ত আর রক্তপাত। ঘৃণা ঘৃণার জন্ম দেয়, হিংসা হিংসার। ভায়োলেন্স ভায়োলেন্সের। সন্ত্রাস সন্ত্রাসের।

ব্যক্তি নিরাপত্তা, পারিবারিক নিরাপত্তা, গোষ্ঠী নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুগুলো আজ অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে চলে এসেছে। একটা ভীতি শঙ্কা সবার মধ্যে কাজ করছে। আর তা সংক্রামক রোগের মতো সংক্রমিত হচ্ছে। প্রতিদিনের অব্যাহত নারকীয়তা জাতির জন্য এক মহা অশনি সংকেত। আমরা উটপাখির মতো আসন্ন সাইমুন ঝড়কে না দেখার ভান করে চোখ বন্ধ করে মাথা বালুর মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলে ঝড়ের অস্তিত্ব মিথ্যা হয়ে যাবে না। ঝড়ও বন্ধ হবে না। জাতির কাছে আজ এ এক মহা চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলায় প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, ঐকতান, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, এক হয়ে শত্রুকে চিহ্নিত করা, তার বিরুদ্ধে একসঙ্গে সংগ্রামে নামা। আর সরকারকেই এর উদ্যোগ নিতে হবে। সব ভেদাভেদ ভুলে সব রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী মানুষ, বিজনেস কমিউনিটি, ছাত্র শিক্ষক সবাইকে একত্রিত হতে হবে। জাতীয় সংলাপে বসতে হবে। দেশটি শুধু সরকারের নয়, দেশটা সবার, প্রতিটি নাগরিকের এটাও সরকারকে জোর করে বোঝাতে হবে। আমাদের সবার একটাই দেশ, বাংলাদেশ। সবাই এখানে স্টেকহোল্ডার। সবাই মিলে মুক্তিযুদ্ধ করে একসঙ্গে দেশটাকে স্বাধীন করেছি। অনেক রক্তে অর্জিত আমাদের এ স্বাধীনতা এ দেশ। আজ দেশকে বিপদমুক্ত করতে স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে বাংলাদেশের হৃত ঐতিহ্য অহিংস অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের গৌরবকে পুনরুদ্ধার করতে একত্রিত হয়ে সংগ্রাম করতে হবে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, সহিংসতার বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে, দুর্নীতি ও অসাম্যের বিরুদ্ধে, সব অপশক্তির বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় (গণতন্ত্র অসাম্প্রদায়িকতা ও সুশাসন) শানিত হতে হবে। জয় হোক সত্যের, সুন্দরের। সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য। জয় হোক ন্যায়ের, জয় হোক ন্যায়নীতির, জয় হোক কল্যাণের, মঙ্গলের, শান্তির, প্রগতির অহিংসার। জয় হোক শাশ্বত বাংলার।

লেখক : সাবেক সেনাপ্রধান

এই পাতার আরো খবর
up-arrow