Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০
ধর্মতত্ত্ব
আলেমদের কেমন হওয়া উচিত
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
আলেমদের কেমন হওয়া উচিত

‘আল ওলামাউ ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া। আলেমরা হলেন নবী-রসুলদের উত্তরসূরি।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ)। নবী-রসুলদের জীবনচিত্র সম্পূর্ণটুকু প্রতিফলিত  হবে আলেমদের মাঝে। তাদের কথা-কাজ, আচার-ব্যবহারে এক ধরনের জান্নাতি শোভা বিরাজ করবে। কোনো ধরনের লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ তাদের আত্মায় স্থান পাবে না। এমনকি তারা চরম অত্যাচারীর চোখ রাঙানোকেও ভয় করবেন না। ভয় পাবেন না মিথ্যার সামনে অবলীলায় সত্যের হুঙ্কার তুলতে। যুগে যুগে এ শ্রেণির আলেমরাই জনসমাজে সুফি নামে খ্যাত হয়েছেন।

বলছিলাম, আলেমরা নবীর উত্তরসূরি। তবে সব আলেম নন। যাদের মাঝে নববী চরিত্রের সমাহার ঘটবে কেবল তারাই নবীর উত্তরসূরি হতে পারবেন। তারাই আল্লাহভিরু মুত্তাকি, সুফি আলেম হয়ে মানুষের কালবে আল্লাহপ্রেমের বাতি জ্বালাবেন। এমন আলেমদের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এরা দুনিয়াবিমুখ জীবনযাপন করেন। কোনো হিংস্র বাঘের মুখ থেকে আপনি আমি যেভাবে দম বন্ধ করে দৌড়ে পালাই, এরাও তেমনিভাবে দুনিয়ার জৌলুস, লোভ-লালসা থেকে এভাবেই ছুটে পালান। আগুন থেকে, যেমনিভাবে আমরা নিজেকে এবং নিজের সম্পদ-স্বজনকে হেফাজত রাখি, এ আলেমরা তেমনি দুনিয়ার সুখ-সাচ্ছন্দ্য, হাসি-তামাশা থেকে নিজেকে এবং আপনজনদের বাঁচিয়ে রাখেন। বর্ষার দিনে রাস্তায় চলতে গিয়ে কাদা থেকে বাঁচতে কাপড় গুটিয়ে যেভাবে খুব সাবধানে পা ফেলি আমরা, দুনিয়ার পথেও খুব সতর্কভাবে কদম রাখেন তারা। এ আলেমদের সংস্পর্শে যে-ই আসবে সে-ই সোনার মানুষে পরিণত হবে। এমনই একজন সাধক ছিলেন সুফিয়ান সাওরি (রহ.)। খলিফা হারুনুর রশিদ ছিলেন সুফিয়ান সাওরির বাল্যবন্ধু। একসঙ্গে পাঠশালায় যাওয়া এবং খেলে বেড়িয়েছেন তারা। পরিণত বয়সে সুফিয়ান সাওরি জ্ঞান সাধনায় আর হারুনুর রশিদ ধন সাধনায় ডুব দেন। একদিন হারুনুর রশিদ সুফিয়ানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বলেন, ‘বন্ধু, আজ কত বছর হলো তোমার দেখা পাইনি। আমার খুব ইচ্ছা হয় তোমাকে মনভরে একটিবার দেখি। দুজনে একসঙ্গে বসে খোশগল্প করি। চিঠি পাওয়া মাত্রই তুমি যদি আমার কাছে আসতে।’

চিঠি পড়ে সুফিয়ান সাওরি লিখলেন, ‘খলিফা! আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি, আপনি এবং আপনার মন্ত্রিপরিষদ দুর্নীতির মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন। আপনি কি চান আমি এসে সচক্ষে তা দেখি এবং কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে দাঁড়াই। হে মহামান্য খলিফা! আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কেয়ামতের দিন আপনাকে হাত-পা বেঁধে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর আপনার পেছন পেছন দুর্নীতিবাজ কর্মচারীরা যাচ্ছেন। তাই এখনো সময় আছে, সাবধান হোন। জনগণের আমানত যথাযথভাবে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিন। আর হ্যাঁ! আমার সঙ্গে কখনই যোগাযোগের চেষ্টা আপনি করবেন না।’ একজন চরম দুর্নীতিবাজ শাসক হওয়া সত্ত্বেও সুফিয়ান সাওরি তাকে ছেড়ে কথা বলেননি। এ শাসক তার বাল্যবন্ধু হওয়ার পরও কোনো খাতির তিনি করলেন না। জানা যায় এ চিঠি পেয়ে বাদশা হারুন খুব ভাবনায় পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন। একবার খলিফা মোকতাফি বিল্লাহ সুফি সম্রাট জুনায়েদ বোগদাদিকে দরবারে ডেকে আনেন। খুব বিনয়ের সঙ্গে জুনায়েদকে জিজ্ঞেস করেন, ‘হুজুর! আপনার জন্য কী খেদমত করতে পারি বলুন।’ জুনায়েদ বলল, ‘আমি যা বলব তা-ই করবেন।’ বাদশা আনন্দের সঙ্গে বললেন, ‘অবশ্যই করব। বলুন, আপনার কী ইচ্ছা।’ জুনায়েদ দৃঢ়কণ্ঠে বলেলন, ‘আমার ইচ্ছা, আপনি যেন আর কখনো আমাকে এ রাজদরবারে না ডাকেন।’

শুধু এ-ই নয়। তারা ছিলেন খাঁটি আল্লাহপ্রেমিক সুফি, তারা কারও দান-দক্ষিণা গ্রহণ করতেন না। করলেও খুব সতর্কতার সঙ্গে কিছু নিতেন সঙ্গে সঙ্গে তা আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিতেন। সুফি ফুজাইল (রহ.)-এর কাছে বাদশাহ হারুনুর রশিদ এসে বললেন, ‘হুজুর, আমাকে কিছু উপদেশ দিন।’ ফুজাইল (রহ.) তাকে দীর্ঘক্ষণ নসিহত করলেন। যাওয়ার সময় বাদশাহ বললেন, ‘ফুজাইল! আপনি এ মোহরগুলো রাখুন। আপনার কাজে আসবে।’ মুহূর্তেই ফুজাইলের চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। রাগে চোখ দুটো লাল এবং গাল দুটো কাঁপল। নিতান্তই আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘বাদশাহ! আমার এ দীর্ঘ নসিহত বিফলেই গেল বোধহয়। নয়তো আমার সামনে এভাবে দুনিয়াকে তুলে ধরতেন না। আপনি চলে যান। এসবে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।’

প্রিয় পাঠক! একটু ভাবুন তো। ওই আল্লাহপাগল সুফিরা কেমন আলেম ছিলেন, আজ আমরা কেমন আলেম হয়ে গেছি। একটু প্রচারের জন্য, একটু খ্যাতির জন্য, রাষ্ট্রের নজরে আসার জন্য আমাদের কত চেষ্টা-প্রচেষ্টা। শুধু কি তাই? ছোট্ট একটু সুবিধার জন্য অপমানের মালা গলায় পরতেও বিবেকে বাধে না আমাদের। আর যখন ক্ষমতাবান কেউ আমাদের কাছে আসে তখন আমরা তো সত্য কথা বলিই না, উল্টো কোরআন-হাদিসের মনগড়া ব্যাখ্যা করে তাদের মনতুষ্টির চেষ্টা করি।  আর কেউ যখন হাদিয়ার মুলা আমাদের সামনে ঝুলিয়ে দেয়, আমরা যেন বেহেশতের কিছু একটা পেয়ে গেছি এমনভাব করতে থাকি। হায় আজকের আলেম!  কবে আমরা নববী চরিত্রের কোরআনিক আলেম হতে পারব? কবে আমরা নিজেরা মুক্ত হয়ে, মুসলিম জাতিকে মুক্ত করতে পারব?

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow