Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৩ মার্চ, ২০১৮ ২৩:৩০
রোকসানা থেকে পৃথুলা জীবন-মৃত্যুর পারাপার
মোস্তফা কামাল
রোকসানা থেকে পৃথুলা জীবন-মৃত্যুর পারাপার

নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় আহত পাইলট আবিদ সুলতানও মারা গেলেন। এর আগে, সোমবার ঘটনাস্থলেই নিহত হন আরেক পাইলট পৃথুলা রশীদ। ত্রিভুবনের ঘটনার সঙ্গে হুবহু মিল না থাকলেও স্মরণ করতে হয় ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বিমানের একটি ছোট দুর্ঘটনার কথা। ওই বছরের শোকাবহ আগস্টের ৫ তারিখে  বাংলাদেশ বিমানের ফকার এফ ২৭-৬০০ মডেলের ছোট বিমানটি বিধ্বস্ত হয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর পথে শাহজালাল বিমানবন্দরের খুব কাছে। এতে বাংলাদেশ বিমানের অভ্যন্তরীণ সেই ফ্লাইটের ৪৫ যাত্রী ও চার ক্রুর সবাই নিহত হন। প্লেনটি চালাচ্ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট কানিজ ফাতেমা রোকসানা। আর এবারেরটিতে যাত্রীদের সঙ্গে মারা গেছেন ইউএস-বাংলার এ ফ্লাইটটির ফার্স্ট অফিসার বাংলাদেশের আরেক নারী পাইলট পৃথুলা রশীদ। আত্মরক্ষাসহ অন্যদের বাঁচাতে কম চেষ্টা করেননি রোকসানা। পৃথুলাও তাই।

ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের কন্ট্রোল রুম থেকে এয়ারক্রাফটিকে রানওয়ের দক্ষিণ দিক থেকে অবতরণের ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সিগন্যাল উপেক্ষা করে রানওয়ের উত্তর অংশে জরুরি অবতরণের চেষ্টা করেন পাইলট পৃথুলা রশীদ। কেন পাইলটকে উল্টো দিক থেকে জরুরি অবতরণের চেষ্টা করতে হলো সেই প্রশ্নের উত্তর মিললে জানা যাবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ। তবে জানতে বাকি থাকার কথা নয়, কত অনিশ্চিত, কত ছোট এই মানব জীবন। সে জীবনেই কত ভাগাভাগি। একসময় কোনো না কোনোভাবে পারাপারের ডাক। সব খেলা শেষ। সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই মুহূর্তেই।  জীবন-মৃত্যুর এ পারাপারে সোমবার বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিমানটি। মৃত্যুতে সব এক হয়ে গেছে। সবার নাম লাশ। বিভাজন শুধু বেঁচে থাকাতেই। বেঁচে থাকলেই কেবল আমরা ভিন্ন জাত, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ধর্মের। মরে গেলেই মানুষ। মরার কোনো জাত-ধর্ম থাকে না। নানান জাত ও ধর্মের মানুষ ছিলেন হাওয়াই জাহাজটিতে। এতগুলো মানুষ। কেউ ঘরমুখী। কেউ ঘর থেকে বাইরে যাচ্ছিলেন একটু বিনোদনের আশায়। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনায় সব বরবাদ। আর কত সয়? এক জীবনে কত মৃত্যু দেখতে পারে মানুষ? এত মৃত্যুও নিত্য আমাদের আয়ু বাড়িয়েই চলেছে। পৃথুলা-রোকসানাদের স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়ার। উড়েছিলেনও। কিন্তু ফিরলেন না মায়ের কোলে।

৬৭ যাত্রীর কারও যাত্রা হিমালয়কন্যা নেপালের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগে। কেউবা বাংলাদেশ থেকে নিজ বাসভূমে প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের অপেক্ষায়। সিলেটের রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত নেপালের শিক্ষার্থীদের বাসনা ছিল পরীক্ষা শেষে পরিবারের সান্নিধ্য পাওয়া। কিন্তু ভাগ্য বৈরী। স্বজন ও নিকটজনদের অনিঃশেষ দহনে পুড়িয়ে পরপারে চলে গেলেন তারা। ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলার বিমানটি নামার সময় কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে একটি ফুটবল মাঠে ছিটকে পড়ে। কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটিতে ৪ ক্রু ও ৬৭ যাত্রীর মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৩৩ জন। এ ছাড়া ৩২ জন নেপালি, ১ জন করে মালদ্বীপ ও চীনের যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনায় নিহত অন্তত অর্ধশত। পরদিন নিহত হন পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান।

প্রাথমিকভাবে এখন পর্যন্ত বিমানটি বিধ্বস্তের কারণ জানা যায়নি। তা অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ। যাত্রীবাহী বিমান পরিচালনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। সামান্য ত্রুটিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সুন্দর-নান্দনিক নামের ত্রিভুবন বিমানবন্দরটি এরই মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিপজ্জনক দশ বিমানবন্দরের মধ্যে অন্যতম ত্রিভুবন। সেখানেই ঘটল হূদয়বিদারক এ ঘটনা। বাংলাদেশি কোনো এয়ারলাইনসের ইতিহাসে এটিই ভয়াবহতম বিমান দুর্ঘটনা। এ পর্যন্ত ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনায় সেখানে নিহত হয়েছেন ৬৫০ জন মানুষ। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসেছে তথ্যটি। পাহাড়ঘেরা এ বিমানবন্দরটি কাঠমান্ডু উপত্যকায় এবং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে। বিমানের পাশাপাশি সেখানে হেলিকপ্টারও বিধ্বস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার জন্য বিতর্কিত ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কথা বিশেষভাবে রয়েছে উইকিপিডিয়ায়ও।  এতে বলা হয়েছে, নিয়মিত বিমান চলাচল শুরুর কিছু দিন পরই দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৭২ সালের মে মাসে। থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমান অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। তাতে ১০০ জনের মতো যাত্রী ও ১০ জন ক্রু ছিলেন। তাদের একজন নিহত হয়েছেন। ১৯৯২ সালে থাই এয়ারওয়েজের একটি এয়ারবাস বিমানবন্দরের দিকে এগোবার সময় একটি পাহাড়ে বিধ্বস্ত হয়। এতে ১১৩ যাত্রীর সবাই নিহত হন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ঘটে আরেকটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা। পিআইএর একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১৬৭ যাত্রীর সবাই প্রাণ হারান। এরপর বিভিন্ন সময় একে একে দুর্ঘটনার অন্যতম ভেন্যু হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে বিমানবন্দরটি। সোমবার বাংলাদেশি বিমানটি বিধ্বস্তের পর নেপালে বিমান চলাচলে নিরাপত্তার দুর্বলতার বিষয়টি আবারও আলোচিত বিষয়।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow