Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৫ এপ্রিল, ২০১৮ ২২:৫০
মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে না
নূরে আলম সিদ্দিকী
মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে না
bd-pratidin

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র বিশ্বে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ এত প্রকটভাবে আগে কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। চায়নার শি জিন পিং প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজীবন থেকে যাওয়ার শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি ইতিমধ্যেই নিয়ে নিয়েছেন। চায়নার সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং ব্যতিরেকে এ ধরনের বিরল সৌভাগ্য শাসনতান্ত্রিকভাবে লাভ করার ঘটনা  দেশটিতে সবিশেষ সংঘটিত হয়নি। যদিও তাদের শাসনব্যবস্থার পদ্ধতিটাই অনেকটা এরকম। দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বকে ম্যানেজ করতে পারলে ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে রাখা অকল্পনীয় কিছু নয়।  মাও সেতুংয়ের পর চায়নার শাসনতন্ত্রে দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকতে না পারার নিয়মটি দলীয় গঠনতন্ত্রে সন্নিবেশিত ছিল। সেক্ষেত্রে শি জিন পিং আজীবন অধিষ্ঠিত থাকার দলীয় সিদ্ধান্ত, তাও সেটি নাকি আবার সর্বসম্মতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে, যা অনেকটাই বিস্ময়কর! ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ভ্লাদিমির পুতিন আবারও চতুর্থবারের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অ্যাঞ্জেলা মেরকেলও এ নিয়ে চারবারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হয়েছেন। কে জানে, এ দৃষ্টান্তগুলো শেখ হাসিনার মননশীলতাকে প্রভাবান্বিত করছে কিনা।

চায়না আজকে যে স্টাইলে পরিচালিত হচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক না সমাজতান্ত্রিক— সেটি নির্ধারণ করা বিশেষজ্ঞদের পক্ষেই দুঃসাধ্য। সম্পত্তি ও সম্পদের ব্যক্তি-মালিকানা চায়নার অভ্যন্তরে এতটাই অভাবনীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত যে, বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা সমাজতান্ত্রিক চায়নাতেই বিশ্বের সর্বাধিক। হংকং তো বটেই, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ পৃথিবীর মুক্ত অর্থনীতির দেশগুলোতে চাইনিজ কোম্পানিগুলোর অর্থনৈতিক দাপট শুধু বিশেষভাবে পরিলক্ষিতই হয় না, অনেকটা অপ্রতিরোধ্য পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর যে কোনো প্রসিদ্ধ নগরীতে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যই নয়, সুদৃশ্য স্থাপনাগুলোর অধিকাংশই তাদের মালিকানাধীন তো বটেই, তাদের জীবনযাত্রার মানও মুক্তবিশ্বের ধনীদের জীবনযাত্রার মানকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমি কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে গিয়েছিলাম। ভ্যাঙ্কুভারের বৈশিষ্ট্য হলো, প্রায়শই তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নগরীর তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে থাকে (এই শীর্ষ অবস্থানটি ধরে রাখার জন্য শুধু নগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক দক্ষতা, যাতায়াত ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ শতাধিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই একটি নগরীকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নগরীর এ সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করতে হয়।)। কথাটির অবতারণা এ জন্য করলাম, ভ্যাঙ্কুভার কানাডায় অবস্থিত হলেও নগরীটি প্রায় চাইনিজদের দখলে বললেও অত্যুক্তি হবে না। আমেরিকার অর্থনীতিতেও ইহুদিদের পরেই চাইনিজদের অবস্থান। প্রাচ্যের উন্নয়নশীল দেশ মালয়েশিয়াতেও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান প্রচণ্ডভাবে মজবুত। পৃথিবীজোড়া যাদের এ প্রতিপত্তি ও বৈভব নিজ দেশসহ বিভিন্ন দেশে অভাবনীয় প্রাচুর্য এবং ঐশ্বর্য, মৌলিক অধিকারের বিষয়টি মনে হয় তাদের জীবন থেকে বিস্মৃতপ্রায় করে দিয়েছে।

১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। এখানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪১টি। কিন্তু আয়তন তো মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইল। মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থা এখানে দুঃস্বপ্নের মতো। এদেশের মানুষ সর্বকালে, সর্বযুগে মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও যথাযথ ভোগের জন্য জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছে এবং সর্বক্ষেত্রেই বিজয়ী হয়েছে। এ দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর। এর মধ্যে প্রান্তিক জনতার মৌলিক অধিকার নিয়ে টানাপড়েন যে একেবারেই হয়নি তা নয়। আমাদের সবিশেষ দুর্ভাগ্য, পরাধীনতার বক্ষ বিদীর্ণ করে স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনার পর থেকেই দেশজ রাজনীতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভ্রান্ত বাম দ্বারা অকারণে প্রভাবান্বিত হয়েছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে বাম রাজনীতির প্রত্যক্ষ কোনো শক্তিশালী সংগঠন নেই। বাংলাদেশে একটি সেকেন্ডের জন্যও তারা নিজ সাংগঠনিক শক্তিসহ ক্ষমতায় আসতে পারেননি। কিন্তু একটা অদ্ভুত রাজনৈতিক কৌশলে তারা ক্ষমতাসীন দলে অনুপ্রবেশ করে শুধু ক্ষমতার অংশীদারিত্বই নেন না, দোর্দণ্ড প্রতাপ খাটিয়েছেন এবং দেশ শাসনে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তীর্ণ ধারায় ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন। সম্ভবত বাংলাদেশই এর একমাত্র দৃষ্টান্ত।

আমাদের ছাত্রজীবনে, অর্থাৎ ষাট দশকে রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয় চেতনার উন্মেষ, বিকাশ, ব্যাপ্তি ও সফলতায় রাজনীতির চিরন্তন ধারায় আমরা তাদের কেবল অবদমিতই নয়, প্রায় অবলুপ্ত করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলাম। পূর্বসূরিদের রাজনীতির ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে ছাত্রলীগ বাঙালি জাতীয় সত্তায় যুবসমাজ থেকে শুরু করে সমগ্র প্রান্তিক জনতাকে এতখানি উদ্বেলিত, অনুপ্রাণিত ও উচ্ছ্বসিত করতে সক্ষম হয়েছিল যে, তারা সাংগঠনিকভাবে এতটাই ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছিলেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো বটেই, এমনকি সত্তরের জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনও তাদের ভাগ্যে জোটেনি, তাদের প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ’৭০ এবং ’৭৩-এর নির্বাচনে অধিকাংশ প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তখনকার বিরাট বিরাট ডাকসাইটে কাগুজে বাঘদের আওয়ামী লীগের মতো গণসম্পৃক্ত সংগঠনে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছে। নতুবা সামরিক ব্যক্তিত্ব জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের সঙ্গে হাত মেলাতে হয়েছে, যোগসাজশ করতে হয়েছে। তাও কেবল ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ ও অস্তিত্ব সংকট উত্তরণের জন্য নয়, আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলার জন্য। তাদের এ পরিকল্পিত পরিকল্পনা অতীতে কখনো সফল হয়নি। জিয়া ও এরশাদের সঙ্গে যোগদানের অন্তর্নিহিত অভিলাষ ছিল আওয়ামী লীগকে এদেশের রাজনীতি থেকে ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ করে দেওয়া। তাদের এ অভিলাষ বা খায়েশটি পূরণ হয়নি, কারণ— আওয়ামী লীগ কোনো ভুঁইফোড় বা ক্ষমতাশ্রিত সংগঠন ছিল না। বাঙালি জাতীয় চেতনার চিরায়ত ধারণাটিকে বক্ষে লালন করে একেকটি আন্দোলনের সোপান উত্তরণের মধ্য দিয়ে অনেক চড়াই-উত্রাই অতিক্রম করে আওয়ামী লীগকে সফলতার স্বর্ণ-সৈকতে তাদের তরী ভিড়াতে হয়েছে।

আজকের রাজনীতির দিকেও যদি ফিরে তাকাই, তাহলে স্পষ্টতই অবলোকন করা যায়, ক্ষমতায় আজ আওয়ামী লীগ, কিন্তু ভ্রান্ত রাজনীতির প্রভাব আজকে ক্রমেই কঠিন হতে হতে ভয়াবহতার রূপ নিচ্ছে। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষা, কৃষি, সংস্কৃতি, অর্থ, তথ্য, সমাজকল্যাণ এমনকি পরোক্ষভাবে বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখানে উল্লেখ না করলে বিবেকের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হতে হবে, দেশের প্রশাসন ও রাজনীতি, সংসদ ও শাসনব্যবস্থায় আওয়ামী লীগের প্রভাববিমুক্ত হলেও সর্বক্ষেত্রেই শেখ হাসিনার প্রভাব ও প্রতিপত্তি, শাসন এবং নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ও বর্জনের দুর্দমনীয় ও অভূতপূর্ব প্রতাপ রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ইসলাম ধর্মের অনুশাসন মেনে চলেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া এবং সকালে প্রাত্যহিক কোরআন তেলাওয়াত করার খ্যাতি তিনি ইতিমধ্যেই অনেকটা অর্জন করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ইসলামের সঙ্গে বাঙালিত্বের কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই। আমাদের পূর্বসূরিরা যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের অনেক ঐতিহাসিক আন্দোলনের পথপরিক্রমণের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার অধিকার থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন করেছেন, আমার মনে হয় তাদের চেতনার আবর্তে ধর্মের প্রতি উপেক্ষা করার কোনো মানসিকতা ছিল না। আমি দৃপ্তচিত্তে উদাহরণ দিতে চাই, ভাষা আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক আন্দোলন ও তার বিজয়ের পর বাঙালির গর্বিত ঐতিহ্যকে তুলে ধরা ও প্রতিস্থাপিত করার জন্য যে শহীদ মিনারটি গড়ে ওঠে, সেটি এতটাই নিষ্কলুষ যে, তিনটি প্রতীকী (মূর্তিবিহীন) স্থাপনার মাধ্যমে অমর স্মৃতিটিকে অবিস্মরণীয় করে রাখা হয়েছে। ওই প্রতীকী স্থাপনার মধ্যেরটি হচ্ছে মা, আর পাশের দুটি সন্তান। এটি সন্দেহাতীতভাবে একটি নিরপেক্ষ, নিষ্কলুষ ও অবিস্মরণীয় স্মৃতিফলক। যার বিরুদ্ধে গোঁড়া ধর্মান্ধ ব্যক্তিবর্গরাও কোনো সমালোচনা করতে পারেন না। এ দূরদর্শিতা বিবর্জিত হয়ে ওই প্রতীকী স্থাপনার পরিবর্তে একটি মা ও দুটি সন্তানের মূর্তি প্রতিস্থাপিত হলে কালের অবিশ্রান্ত ধারায় তার পরিচয় ও পরিণতি কী আকার ধারণ করত, তা আজকে ভাবনার আবর্তে আনা দুঃসাধ্য। আমি মনে করি, বাঙালি জাতীয় চেতনা এবং সেই চেতনার পরিপ্রেক্ষিতে আনুষ্ঠানিকতা উদযাপন নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ। কিন্তু তার মধ্যে স্বকল্প-কল্পিত কিছু বাড়াবাড়ি ঢুকিয়ে দিলেই বাদ-বিসম্বাদ, তর্ক-বিতর্কের অবতারণা হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। আমি আমার টকশোতে এবং আগের অনেক নিবন্ধে বারবার দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছি, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয় এবং একটি ধর্মীয় চেতনার উদ্ভব ঘটিয়ে সব ধর্মের অংশবিশেষ তার মধ্যে প্রচলন করাও নয়। যে উৎসব সবার, সেটি হলো পয়লা বৈশাখ। কিন্তু তার একদিন পূর্বের চৈত্রসংক্রান্তি, এটি সবার নয়। আমার হিন্দু ভাইবোনদের। সেখানে উদযাপন বা বাধা দেওয়ার কোনো অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না। ঠিক তেমনিভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী এদেশে সর্বজনীনভাবে পালিত হয়ে থাকে। এখানে কোনো ছলছুঁতোয় বাড়াবাড়িও যেমন হয় না, ব্যত্যয়ও তেমন ঘটে না।

১৯৬২ সাল থেকে রাজনৈতিক পথপরিক্রমণের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে কত রাজনৈতিক কর্মসূচি যে আমরা একত্রে পালন করেছি তার হিসাব নেই। সেসব কর্মসূচি পালনে জাতি-ধর্ম, বর্ণ-গোত্র ও নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। আমাদের মিছিলে অসংখ্য অভিজাত পরিবারের এবং অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণীরা অংশ নিতেন। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে কোনো একটি ঘটনা কখনো ঘটেনি, যেটি সমালোচনার আওতায় আসতে পারে। কারণ, তখনকার আন্দোলনের একটি আদর্শ ছিল, একটি লক্ষ্য ছিল। আদর্শ ছিল হিমালয়ের গিরিশৃঙ্গমালার মতো সুউচ্চ, হৃদয় ছিল প্রদীপ্ত সূর্যকিরণের মতো নিষ্কলুষ। শরীরের প্রতিটি সত্তা ছিল সাগরের তরঙ্গমালার মতো উচ্ছ্বসিত। সেখানে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ চেতনাকে মলিন করতে পারেনি। কোনো অবক্ষয় মূল্যবোধকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করেনি। এনএসএফের দুর্দান্ত প্রতাপের ঔদ্ধত্যকে সততা ও ঐক্যের অবিস্মরণীয় প্রভাবে অবদমিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমগ্র ছাত্রসমাজকে একটি বিশ্বাসের আবর্তে এনে শুধু ছাত্রদের দাবি-দাওয়াই নয়, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা— অর্থাৎ, পরাধীনতার বক্ষ বিদীর্ণ করতে আমরা সক্ষম হয়েছিলাম। এ আন্দোলনের প্রতীক ছিলেন, বিশ্বাসের আঙ্গিক ছিলেন আমাদের মুজিব ভাই। আর আন্দোলনটিকে বাস্তবায়িত করার দক্ষ ও নিঃস্বার্থ কারিগর ছিল ছাত্রলীগ। আমাদের পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ ছিল, কোনো বাধাবিপত্তি যে আমাদের অতিক্রম করতে হয়নি তা নয়। আমাদের বিরুদ্ধে সব অপপ্রচার ও প্রতিবন্ধকতাকে আমরা অতিক্রম করেছি। আমাদের দৃষ্টিকে স্থির ও প্রসারিত রেখে, চিত্তকে নিষ্কলুষ ও প্রত্যয়দৃঢ় রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম বলেই কখনই আমরা আন্দোলনের সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থকে যেমন গুলিয়ে ফেলিনি, তেমনি আন্দোলন করলে লেখাপড়া ছেড়ে হলে পড়ে থাকার প্রবণতারও শিকার হইনি। আমাদের সময়ে ছাত্রনেতা ও কর্মীরা শুধু সমগ্র ছাত্রসমাজকেই ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়নি, এমনকি শিক্ষকদের হৃদয়েও তারা একটি স্নেহের ও সহমর্মিতার স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই শিক্ষকরাও ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি শুধু সহমর্মীই ছিলেন না, ক্ষেত্রবিশেষে সহযোদ্ধাও ছিলেন।

ছাত্রদের প্রাণপ্রিয় উপাচার্য আবু সাঈদ চৌধুরী অনেক শিক্ষক ও শিক্ষিকাসহ কলাভবনের বারান্দায় চেয়ারে বসে বটতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় তার সন্তানতুল্য ছাত্রদের বক্তৃতা ও বক্তব্য শুনতেন। ছাত্রদের প্রতি আবু সাঈদ চৌধুরীর আবেগাপ্লুত হৃদয় এতটাই প্রখর ও স্পষ্ট ছিল যে, একদিন টিএসসির একটি ছাত্রসভায় তিনি আবেগাপ্লুত হৃদয়ে বলেই ফেলেছিলেন— ‘আমি যখন সুখে থাকি, আনন্দ যখন আমার হৃদয়কে আপ্লুত করে রাখে— দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা আমার হৃদয়কে যখন বিব্রত করে না, তখন অনেক মুখচ্ছবি আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসতে থাকে। কিন্তু দুশ্চিন্তা, সংশয়, দ্বিধা বা কোনো বেদনার স্মৃতি আমার অনুভূতিকে যখন স্পর্শ করে, মনপ্রাণকে ক্লান্ত-শ্রান্ত বেদনা-বিহ্বল করে তোলে, যখন আমি মানসিকভাবে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে শঙ্কিত ও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি— তখন আমার মানসপটে দুটি মুখ ভেসে ওঠে। আমার সব ক্লান্তির ভার থেকে মুক্ত করার জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে দুটি মুখচ্ছবি আমার মানসপটে উদিত হয়। একটি আমার পিতা আবদুল হামিদ চৌধুরী, অন্যটি আমার সন্তানপ্রতিম নূরে আলম সিদ্দিকী।’ 

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আজকের বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি আর নেই। প্রান্তিক জনতার চাওয়া-পাওয়া ও অনুভূতির প্রতি রাজনীতিকদের মধ্যে দায়বদ্ধতার বোধ নেই বলেই সাধারণ মানুষ এখন আর তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখে না। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থচিন্তা আর মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতালিপ্সা তাদের আদর্শিক দেউলিয়াত্বের দিকে নিয়ে গেছে। রাজনীতিতে এ দেউলিয়াত্বের অবসান হোক।  মূল্যবোধ ও নীতি আদর্শভিত্তিক রাজনীতিই দেশের আপামর সাধারণ মানুষকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলবে। সত্যিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত না হলে অগণিত শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা ও স্বপ্ন বিপন্নই হবে না, সব অগ্রযাত্রা মুখ থুবড়ে পড়বে।  মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত রাষ্ট্রব্যবস্থা সোনার পাথরবাটির মতোই অলীক। 

লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow