Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৪৪
চমকে দিলেন তোফায়েল, পয়েন্ট অব নো রিটার্নে রাজনীতি?
পীর হাবিবুর রহমান
চমকে দিলেন তোফায়েল, পয়েন্ট অব নো রিটার্নে রাজনীতি?
bd-pratidin

শনিবার বিকালে অফিসে কাজ করছি, এমন সময় ফোন করলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান  বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। কুশল বিনিময়ের পর বললেন, কাল রবিবার সকালে আমি তোমাকে নিয়ে ভোলা যেতে চাই। তুমি কি যেতে পারবে? কোনো কিছু না ভেবে এক কথায় বলে দিলাম যাব। বললেন, আমার পছন্দের কাউকে চাইলে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি। কিছুক্ষণ পরই তিনি ফোন করলেন বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক বন্ধু নঈম নিজামকে। তাকেও সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। সন্ধ্যা হতে না হতেই তিনি আবার ফোন করে জানালেন, ৭১ টিভির প্রধান সম্পাদক বন্ধুবরেষু মোজাম্মেল বাবুও সফরসঙ্গী হচ্ছেন।

একজন আধুনিক রাজনীতিবিদ ও প্রখর সেন্স অব হিউমার রাখা তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে এ সফর যে আড্ডা আড্ডায় আনন্দময় হবে তা নিয়ে আমাদের আর সংশয় থাকল না।

রবিবার ছিল সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমী ও সরকারি ছুটির দিন। এদিকে নেপাল সফর শেষে দেশে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বিকালেই গণভবনে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। নঈম নিজাম ও মোজাম্মেল বাবু দুপুরেই ফিরে আসবেন। তোফায়েল আহমেদ ও আমি বিকালে ফিরে আসব। সেভাবেই সফরসূচি নির্ধারণ করেছেন। মোজাম্মেল বাবু কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির মোহাম্মদ এ আরাফাতকেও সঙ্গী করেছেন।

তোফায়েল আহমেদের ছেলে মাইনুল হোসেন বিপ্লস্নব সহজেই কাউকে আপন করে নেন অমায়িক মিষ্টি ব্যবহারে। তিনিও আমাদের সঙ্গী হলেন। আমরা ছয়জন সকাল ১০টায় তোফায়েল আহমেদের জন্মস্থান ভোলার বাংলাবাজারে গিয়ে নামলাম। সেখানে নামার পর তিনি দেখাতে নিয়ে গেলেন তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত কমপ্লেস্নক্স কলেজ, মসজিদ, স্বাধীনতা জাদুঘর ও বৃদ্ধাশ্রম। এ ছাড়া নান্দনিক ইসলামী স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটি বহু আগেই তিনি তৈরি করেছেন। তার জায়গায় সরকারি প্রতিষ্ঠান মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এবং এতিমখানা করে দিয়েছেন। তিনি মসজিদ নির্মাণের পর এক টকশোয় বলেছিলাম, মসজিদ নির্মাণের জন্য অনেকেই রয়েছেন। আল্লাহর ঘর একজন শুরু করলে অনেকেই শেষ করেন। তোফায়েল আহমেদ একজন স্বাধীনতা-সংগ্রামী ইতিহাসের নায়ক হিসেবে মসজিদে এত টাকা ব্যয় না করে মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রহশালা করতে পারতেন। কিছু টাকা দিয়ে একটি লাইব্রেরি করতে পারতেন। কিন্তু সেদিন যাওয়ার পর আমার সব আক্ষেপ শেষই হয়নি, আমরা চমকে গেছি এবং অভিভূত ও মুগ্ধ হয়েছি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য তোফায়েল আহমেদ আমাদের রীতিমতো বিস্মিত করেছেন।

দেশের আর কোনো স্বাধীনতা-সংগ্রামী কিংবা ক্ষমতাবান অথবা বিত্তশালী নিজের এলাকায় বা অবহেলিত প্রান্তিক জনপদে এ ধরনের পরিকল্পিত কমপেস্ন্লক্স গড়ে তুলেছেন বলে কোনো খবর এখনো পাইনি। মা ফাতেমা খানমের নামেই রত্নগর্ভা মায়ের মাতৃভক্ত সন্ত্মান তোফায়েল সব প্রতিষ্ঠান করেছেন। বাবার নাম যুক্ত করে আজহার ফাতেমা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ করছেন। যেটি গরিবের হাসপাতাল হবে। দেখভাল করবেন তার জামাতা প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৌহিদুর রহমান। নিজের জায়গায় তিনি তার মা ফাতেমার নামে ডিগ্রি কলেজ, মসজিদ ও বৃদ্ধাশ্রম করেছেন। আল্লাহর ঘর কী সুন্দর। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। সুরম্য কলেজ ভবন, সামনে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ মন খুশি করে দেয়। নিজের পূর্বপুরুষের ভিটায় কোনো আলিশান বাড়ি যেমন তৈরি করেননি, তেমনি একজন ফ্যাশনসচেতন, শৌখিন মানুষ হিসেবে রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ তার ভোলা শহরের বাড়িটিকেও চাকচিক্যময় করে বানাননি। কিন্তু দেশ ও মানুষের জন্য আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে লালন করার জন্য অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলীর ভবন নির্মাণ করে স্বাধীনতা জাদুঘর নির্মাণ করেছেন। যেখানে লাইব্রেরি ঠাঁই পায়নি, সংগ্রামমুখর ইতিহাসের ছবিগুলো দেয়ালে দেয়ালে ঠাঁই পায়নি, আমাদের জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীসহ দেশ-বিদেশের কীর্তিমান পুরুষদের ঘটনাবহুল সংগ্রামের ছবিও শোভা পেয়েছে। মহাকাব্যের যুগের নায়কদের মানবসভ্যতার ইতিহাসে যে বিচরণ ঘটেছে  ডিজিটাল এই জাদুঘরে তা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করেছে। ধারাবাহিকভাবে ইতিহাসের ঘটনাবহুল সময় স্থান পেয়েছে এখানে।

একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম রয়েছে, যেখানে অনেকে বসে একসঙ্গে বড় পর্দায় ইতিহাসের সন্ধান, ইতিহাসের পাতায় পাতায় শিহরিত হতে পারেন। বই পড়ার জন্য আধুনিক লাইব্রেরি ও বইয়ের সম্ভার রয়েছে। এখনো কাজ সব শেষ হয়নি। অতিথি থাকার জন্য আধুনিক গেস্টহাউসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আনন্দ এবং বেদনার অশ্রু ঝরানো ছবির সামনে থমকে দাঁড়াতে হয়। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এ জাদুঘর উদ্বোধন করে এখানেই রাতযাপন করেছেন।

যে ভোলাকে মানুষ চিনেছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদের বর্ণাঢ্য কর্মময় রাজনৈতিক জীবনের মধ্য দিয়ে, সেখানে গ্রামীণ পরিবেশে বাংলো প্যাটার্নের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির ওপর টিনের বাড়িগুলো বা তার আঁতুড়ঘর না বদলালেও সুরম্য প্রাসাদ করেছেন বৃদ্ধদের জন্য। বৃদ্ধাশ্রম এত সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখন আটজন বৃদ্ধা বাস করছেন। যাদের তিনি মায়ের মতো দেখভাল করেন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, নার্স, চিকিৎসক ও কর্মী রয়েছে তাদের দেখভালের জন্য। রাজনীতি যে মানবকল্যাণের জন্য নিবেদিত ভোলার গ্রামীণ জনপদে সেটি করে দেখিয়েছেন তিনি। এমনকি এতিমখানার মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। বাংলাবাজার থেকে ভোলায় যেতে পথে পথে দেখেছি তার প্রতি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা। আর মানুষ বলেছে ভোলার উন্নয়নে তার অবিস্মরণীয় ভূমিকা। যেখানে নৌকা চলেছে, সেখানে পাকা সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, গ্যাস। তার করা মায়ের নামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু হলে সেখানে প্রায় সরকারি ফি দিয়ে আধুনিক চিকিৎসা পাবে মানুষ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা থাকবেন।

অবকাঠামোগত দিক থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ খাতের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। ভোলা শহরে যেতে যেতে পথে এক জায়গায় মানুষ তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে চায়ের দোকানে নিয়ে বসাল। সেখানে একজন মানুষ এলেন এবং বললেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর প্রতিহিংসার আগুনে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হলে তিনি সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ঘর বানিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে গেলে ঋণের সুদে এখন দম বন্ধ অবস্থা। তত্ক্ষণাৎ সমাধান দিলেন তাদের নেতা। বিকালে ফিরে আসার আগে জন্মাষ্টমীর আনন্দ র‌্যালির উদ্বোধন করলেন। হিন্দুধর্মাবলম্বীর স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নেমেছিল। বিএনপির শাসনামলে তাদের ওপর ধর্ষণসহ যে অত্যাচার নেমে এসেছিল তার বীভৎস চিত্র তুলে ধরে তোফায়েল আহমেদ তাদের অভয় বাণী শোনালেন। বললেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না এলে এক দিনেই ১ লাখ লোক মারা যাবে। তাই জনগণ সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগকে আবারও নির্বাচনে বিজয়ী করবে। বিএনপির শাসনামলে আপনার ওপর, আওয়ামী লীগ কর্মীদের ওপর হামলা-নির্যাতন নেমে এসেছিল। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বিএনপিও শান্তিতে বাড়িতে ঘুমায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সবাই নিরাপদ থাকে।

সাগরতীরের ভোলায় ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদের মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর সফরসঙ্গী হয়ে ঢাকা থেকে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে গিয়েছিলাম। সেদিন দুই পক্ষের রাজনৈতিক সহিংসতায় ভোলা ছিল রক্তাক্ত। ভোলার আরেকজন রাজনীতিবিদ বিএনপির ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মরহুম মোশারফ হোসেন শাহজাহান আমার লেখার ভক্ত ছিলেন। তার সঙ্গে কখনো আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। অনেকবার তিনি আমাকে তার বাসায় দাওয়াত করলেও যাওয়া হয়নি। এমনকি বন্ধুবান্ধব নিয়ে লঞ্চযোগে ভোলা সফরের আমন্ত্রণ জানালেও যাওয়া হয়নি। ছাত্রজীবনে তিনি সেই সময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে ‘জোনাক জ্বলে’ শিরোনামে নিয়মিত লিখতেন। তার সুখপাঠ্য নস্টালজিক লেখার আমি ভক্ত ছিলাম। তার মৃত্যুর পর আমন্ত্রণ না রক্ষার জন্য মনে মনে অনেক কষ্ট পেয়েছি। তোফায়েল আহমেদ গত কয়েক বছরে অনেকবার তার সফরসঙ্গী হতে বলেছেন। কিন্তু নানা কারণে যাওয়া হয়নি। নঈম নিজাম একবার ঘুরে এসেছিলেন।

’৯১ সালে সংসদে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিরোধী দলের নেত্রী তখন আওয়ামী লীগ বিটের রিপোর্ট কাভার করার কারণে তার সঙ্গে সড়কপথ, রেলপথ ও নৌপথে প্রায় সারা দেশ সফর করেছি। বরিশালে নৌপথের সফর ছিল উপভোগ্য। নদীমাতৃক বাংলাদেশ আর জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার ছবি শেরেবাংলার বরিশাল বিভাগে গিয়েই দেখে মুগ্ধ হয়েছি। মোশারফ হোসেন শাহজাহানের গল্প তুলতেই মত ও পথের পার্থক্য ভুলে তোফায়েলপুত্র বিপস্ন্লব যখন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন, তোফায়েল আহমেদ যখন তার সাংস্কৃতিক মননশীলতার দিক তুলে ধরলেন, তখন আমি খুশি হয়েছি। একালের রাজনীতিতে মতপার্থক্য হলেই সবাই মৃতকেও ছাড় দেয় না। সেখানে পিতা-পুত্রের এ উদার দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে অভিভূত করেছে। সেদিন বিকালে ঢাকায় যখন ফিরছিলাম তখন বার বার মনে হচ্ছিল সাগরবেষ্টিত ভোলাকে যদি উন্নয়নের ছোঁয়ায় এত আধুনিক ও উন্নত শহরে রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গিয়ে করতে পারেন তাহলে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর মেঘালয়ের কোলে শুয়ে থাকা শহরের বুক চিরে বহমান সুরমাবিধৌত হাওরের রাজধানী জল-জোছনার সুনামগঞ্জ থেকে একসময় অনেক জাতীয় নেতার জন্ম হলেও রাজনীতিতে তারা যতটা এগিয়ে ছিলেন, উন্নয়নে এলাকাকে কেন টানতে পারেননি? বুকের গহিন থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস যেন নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো। মনে হলো, দলীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত যদি তীব্র হয়, তবে সেই দলের নেতারা যতই ক্ষমতাবান হোন না কেন আর যাই হোক এলাকার উন্নয়নে আশার সীমারেখা স্পর্শ করতে পারে না।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে আবার চাঞ্চল্যই নয়, তুমুল বিতর্কই নয়, যেন নয়া মেরুকরণই ঘটছে না; কখনোসখনো মনে হচ্ছে পয়েন্ট অব নো রিটার্নের দিকে চলে যাচ্ছে। সেদিন রবিবার বিকালে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য রেখেছেন, সেখানে ইভিএম ব্যবহারে তাড়াহুড়া না করার পক্ষে মত দেন। মতামতের পর যে ইভিএম রাজনীতিতে তুমুল বিতর্কের ঝড় তুলেছিল, নির্বাচন কমিশন যেখানে এ প্রশ্নে রাজনৈতিক শক্তিসমূহের বিভক্তি ও নানা মহলের আপত্তিকে তোয়াক্কা না করে একজন নির্বাচন কমিশনারের নোট অব ডিসেন্ট ও বৈঠক থেকে ওয়াকআউটের পরও ১০০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে আরপিও সংশোধনের সিদ্ধান্তের অনুমোদন দিয়েছিল, সেখানে এখন সিইসিও বলছেন, রাজনৈতিক ঐক্য না হলে ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ইভিএম ঝড় রাজনীতিতে ফাঁকা বেলুনের মতো চুপসে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে পরিষ্কার যে, বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপে সরকার বা তার দল যাচ্ছে না। বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর তিনি ছুটে গেলেও তাকে প্রবেশ করতে না দেওয়ার বেদনা ও অপমানের কথাও বলতে তিনি ভোলেননি।

১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাদের সমর্থকের স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নেমেছিল। শত দমন-পীড়নের মুখে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাদ-ের পরও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে নির্বাসনে থাকার পরও দলটি যে এখনো ঐক্যবদ্ধ এবং জনপ্রিয় তার আলামত সেদিন দেখা গেছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন-বয়কট ও সহিংস আন্দোলন এবং পরবর্তীতে অসহযোগের নামে তিন মাসের সহিংস অবরোধ কর্মসূচি বিএনপিকে যে সাংগঠনিক লোকসানের মুখে পতিত করেছিল; নেতা-কর্মীদের মামলা ও নিপীড়নের জালে ফেলেছিল, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে কৌশল পরিবর্তন করে দলটি নরমে গরমে নির্বাচনের পথেই হাঁটছে। সেদিনের সমাবেশ থেকে তারা পরিষ্কার বলেছে, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেই তারা নির্বাচনে যাবে এবং শেখ হাসিনার অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নয়, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না।

চলতি মাসে একুশে গ্রেনেড হামলার রায় কী হয়, তা নিয়েও বিএনপিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার বলেছেন, এটি তাদের এখতিয়ার নয়, আদালতের বিষয়। তিনি দ্রুত মুক্তি চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করতে পারেন বলে পরামর্শও দিয়েছেন।

নির্বাচন আদৌ হবে কিনা গণফোরাম সভাপতি ও প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেন যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন এবং যুক্তফ্রন্ট ও বিএনপি যেসব বক্তব্য দিয়ে আসছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে কঠিন ভাষায় বলেছেন, সময়মতো নির্বাচন হবেই, কেউ ঠেকাতে পারবে না। সময়মতো সংবিধানসম্মত-ভাবেই নির্বাচন হবে এ কথা বলে কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো নির্দলীয় সরকারের সুযোগ নেই। তার অধীনে সাংবিধানিকভাবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে। তিনি দুই রাজনৈতিক শক্তির বাইরে যুক্তফ্রন্টের আত্মপ্রকাশকে স্বাগত জানালেও তাদের নেতাদের নিয়ে স্বভাবসুলভ ছড়া কেটেছেন, রসাত্মক মন্তব্য করেছেন। এদের সাংগঠনিক শক্তি না থাকার কারণে নেতাদের যতই ইমেজ বা ভাবমূর্তি থাক না কেন তাদের যে আমলে নেননি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন।

এদিকে ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্যের সেস্নাগান এখন যুক্তফ্রন্টের নেতারাই নন, বিএনপির নেতারাও সকাল-বিকাল সুরে সুরে বলছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্যে বিএনপিসহ যুক্তফ্রন্ট ছাড়াও আরও ছোট দল নিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেটি কতদূর সফল হয় এবং সরকারকে তাদের দাবির প্রশ্নে নমনীয় করতে কতটা সফল হয়, তা পর্যবেক্ষণের বিষয়। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে আপসহীন অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করতে পারবেন কিনা তা দেখার বিষয়। আর প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তা নিয়ে ক্ষমতায় থাকি আর না থাকি ওদের সঙ্গে আলোচনা নয়, এমন বক্তব্য সাফ জানিয়েছে যে, বিএনপির সঙ্গে আলোচনা নয়, খালেদা জিয়ার মুক্তি নয় এবং নিরপেক্ষ সরকারও নয়।

আওয়ামী লীগ চাইছে মহাজোট নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে শেখ হাসিনার অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে অংশ নিতে। অন্যদিকে বিএনপিতে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের দাবিতে সরকারকে আলোচনার টেবিলে সমঝোতায় বাধ্য করে নির্বাচনে যাওয়ার মত জোরালো হচ্ছে। সবাই যখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের দিকে তাকিয়ে থাকেন তখন আমি বরাবর বলে আসছি আমাদের নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও শক্তিশালী হতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন ব্যক্তিত্ব ও সাহসের দ্যুতি কখনো ছড়াতে পারেনি। নির্বাচনকালীন সরকারের ওপরই নির্ভর করে আসছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। আমার বিশ্বাস, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলেও সে সরকারের ওপরই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে তা নির্ভর করবে।

ড. কামাল হোসেন, বি. চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট বিএনপিসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য এ মাসে গড়ে ওঠে কিনা এবং তফসিল ঘোষণার আগেই তারা তাদের দাবি নিয়ে মানুষকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলনে নামতে পারেন কিনা তা যেমন দেখার বিষয়, তেমনি আত্মবিশ্বাসী শেখ হাসিনা এবারও তার অঙ্গীকার অনুযায়ী সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করে নিতে পারেন কিনা তা অক্টোবরের আগে দৃশ্যমান হচ্ছে না। তবে দেশের মানুষের আকুতি— সব দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। আর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর সংসদ যা আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুই হবে না; কার্যকর, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা জাতিকে উপহার দেবে। সুশাসন নিশ্চিত করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে দেশ এবং সব নাগরিকের মত ও বাকস্বাধীনতার ওপর ভর করে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক উন্নত আধুনিক নিরাপদ বাংলাদেশ হবে আমাদের। আমরা চাই এবার বিএনপি অবশ্যই নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ নেবে। গণআন্দোলন গড়ে দাবি আদায় না করতে পারলেও তারা ভোটযুদ্ধে অংশ নেবে। একটি শক্তিশালী সংসদ হবে। যেখানে সরকার ও বিরোধী দল শক্তিশালীই নয়, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা আদায়েও সফল হবে। নাগরিকসমাজও মেরুদ- সোজা করে আত্মসম্মান নিয়ে বাস করবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

এই পাতার আরো খবর
up-arrow