Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:২৫
বাংলাদেশে কঠিন জটিলতায় নিপতিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন
কারার মাহমুদুল হাসান
বাংলাদেশে কঠিন জটিলতায় নিপতিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন
bd-pratidin

খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে ১ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে সিটি নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার বাতিল ও সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছিল বিএনপি। গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। নির্বাচন কমিশন ভবনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করেন।

ওই সময় কমিশন বিএনপির কিছু প্রস্তাবে একমত পোষণ করলেও নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। সিইসি বলেন, কমিশন আগেই বলেছে, এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই। ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে ১৭ এপ্রিলের সভার পর ইসি সচিব হেলালউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি ইভিএম ব্যবহারে আপত্তি তুলেছিল। কমিশন বলেছে, আইন ও বিধিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কমিশন থেকে বিএনপির প্রতিনিধি দলকে বলা হয়েছে, এ প্রযুক্তি খুবই আধুনিক। এটি হ্যাক করার কোনো সুযোগ নেই। এ প্রযুক্তি সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকলে, ‘আপনারা এসে এটি দেখুন। কোনো সমস্যা থাকলে বলুন’, এই বলে বিএনপি প্রতিনিধি দলকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

এ ব্যাপারে বিএনপির মন্তব্য ছিল ইভিএম কার্যক্রম শুরু থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। যেসব দেশের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে সেসব দেশেও এ যন্ত্রটির নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ‘আড়াই হাজার ইভিএম কিনছে ইসি’ শিরোনামে ঢাকার এক বনেদি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত (২১/০৪/২০১৮) খবরে বলা হয়, ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বিতর্কের মধ্যেই প্রাথমিকভাবে ২৫৩৫ সেট ইভিএম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। এসব ইভিএম বাংলাদেশ মেশিন টুলস্ ফ্যাক্টরির কাছ থেকে কিনতে চিঠিও প্রেরণ করে। প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজারের মতো ইভিএম কিনলেও পরবর্তীতে আরও ৫ থেকে ১০ হাজার ইভিএম কেনার পরিকল্পনা রয়েছে মর্মে ইসির কমিশনের কর্ণধারদের বক্তব্যেও এতদবিষয়ে খোলাসাভাবে একই তথ্য প্রকাশ পায়।

বাংলাদেশে ইভিএম এর যাত্রা শুরু কীভাবে?

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয় এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন গঠিত হওয়ার পর থেকে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। ২০১০ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির মুখে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ওই কেন্দ্রে ইভিএমের কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। এ নিয়ে মামলাও হয়। ইভিএম নিয়ে সবচেয়ে বেশি জটিলতা কাজী রকিবউদ্দিন কমিশনের আমলে হয় ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। জটিলতার কারণে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে পুনরায় নির্বাচন করতে হয়েছিল ইসিকে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও একটি কেন্দ্রে ইভিএম বিকল হয়ে যায়। এসব কারণে ২০১৩ সালের পর থেকে আর কোনো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। সেই সময়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১শ ইভিএম তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে এসে বিগত কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন আগের প্রযুক্তিটি বাদ দিয়ে নতুন প্রযুক্তির একটি ভোটিং মেশিন তৈরি করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘ডিজিটাল ভোটিং মেশিন’ (ডিভিএম)। এ মেশিনটি তখন কমিশনের সামনে উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে বিভিন্ন কিসিমের জটিলতার আবর্তে হাবুডুবু খাওয়া কমিশন এ বিষয়ে জোরালোভাবে সামনে এগোতে উৎসাহী হয়নি যদিও কমিশনের পক্ষ থেকে এ নতুন মেশিন (কিছু যন্ত্রাংশ সংযোজনের পর)-এর নাম দেওয়া হয়েছিল ডিজিটাল ভোটিং মেশিন (ডিভিএম)। সংশিস্ন্লষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, আগের ইভিএমের বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে ব্যাপক গবেষণার পর এ নতুন ডিভিএম তৈরি করা হয় এবং এটি নাকি হ্যাক করা সম্ভব হবে না। তবে ইভিএম ব্যাপারে শুরু থেকেই রয়েছে বিভিন্নমুখী অনুযোগ/মতামত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের। ড. অ্যালেক্স হালডারমেন নামে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ইভিএমের ওপর গবেষণা করে প্রমাণ করেছিলেন, আমেরিকায় ইভিএম টেম্পারপ্রুফ নয়। ফলে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয় তখন আমেরিকায় ২২টির বেশি অঙ্গরাজ্যে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বাকিগুলোতে তা নিষিদ্ধ হওয়ার পথে। পৃথিবীর শতকরা ৯০ ভাগ দেশে ই-ভোটিং পদ্ধতি নেই। যে কয়েকটি দেশ এটি চালু করেছে তারাও এখন এটি নিষিদ্ধ করেছে। ২০০৬ সালে আয়ারল্যান্ড ই-ভোটিং পরিত্যাগ করে।

২০০৯ সালের মার্চ মাসে জার্মানির ফেডারেল কোর্ট ইভিএমকে অসাংবিধানিক ঘোষণা দেয়। ২০০৯ সালে ফিনল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্ট তিনটি মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের ফলাফল অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করে। নেদারল্যান্ডসে ই-ভোটিং কার্যক্রমের প্রয়োগ হয়। তবে, জনগণের আপত্তির মুখে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় ডাচ সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, জালিয়াতির সুযোগ থাকায় এতে এক চাপে ইভিএম-এ ৫০টি ভোট দেওয়া সম্ভব। বলা হয় বিদেশের মাটিতে বসেও ইভিএম হ্যাকিং করা যায় এবং একটি ইভিএম হ্যাকিং করতে এক মিনিটের বেশি লাগে না।

অনেক আগে থেকেই বিএনপি ইভিএম/ডিভিএম ব্যবহারে সরাসরি বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে তার ঠিক বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ভোট গ্রহণের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে দলগতভাবে আওয়ামী লীগ। তারা বলছে, চলমান পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হলে, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ব্যালটে আগেই সিল মারার ঘটনা ঘটে। সে কারণে সনাতন পদ্ধতির ঝামেলা এড়াতে এবং উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে, আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে নজর দিতে হবে। দ্রুততম সময়ে নির্ভুল পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ এবং গণনার জন্য ইভিএম ব্যবহার খুব উপযোগী একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ভোট হলে কোনো প্রার্থী অভিযোগ করতে পারবে না। আবার সময় এবং টাকার খরচ কম হবে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এ পদ্ধতি ব্যবহারের সুফল দেশবাসী পেয়েছে। তবে মাঠের প্রধান দল বিএনপি ইভিএমের বিরোধিতা করে বলেছে, সরকার নির্বাচনে ডিজিটাল কারচুপি করে ক্ষমতায় আসতে চায়। এটা সরকারের নীলনকশা।            উলেস্নখ্য, গত বছর নির্বাচন কমিশন গঠনের সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিল। এই প্রস্তাবের চার নম্বরটি ছিল ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বিরাজমান সব বিধি বিধানের সঙ্গে জনগণের ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিং চালু করা’। দলটির নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সব সময় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চায়। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সে কারণে বাংলাদেশেও ইভিএমের ব্যবহার চান ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করার প্রস্তাবের পেছনে ‘দুরভিসন্ধি’ রয়েছে বলে মনে করে বিএনপি। তারা একে ভোট ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখছে। বিএনপি ইভিএমকে দেখছে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার ‘নীলনকশা’ এবং ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে। বিএনপি নেতাদের মতে, এ সরকারের দুর্নীতি, দুঃশাসন, জুলুম, নির্যাতনের কারণে দেশের জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সংসদ নির্বাচনে তারা জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চায়। এ জন্যই ইভিএমের সাহায্য নিচ্ছে। যখন উন্নত বিশ্ব ইভিএম থেকে সরে আসছে, তখন আমাদের নির্বাচন কমিশনকেও এ থেকে সরে আসতে হবে। স্বয়ংক্রিয় এই ভোটে জালিয়াতির শঙ্কার পাশাপাশি এর কারিগরি বিষয়ে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সমস্যায় পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা দলটির।

বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে বেশ জোরালোভাবে ও জজবার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সব সদস্যের (যার মধ্যে এক/একাধিক সদস্য ছিলেন বেশি উৎসাহী সিইসিসহ) ব্যাপক আলাপ-আলোচনা, সেই সঙ্গে বুয়েটের সংশ্লিস্নষ্ট শিক্ষক/বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ইভিএম বিষয়ে, বলা যায় একরকম জোরালো, সেসঙ্গে ইতিবাচক দহরম মহরম চলছিল। ওই সময় ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহৎ পরিসরে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে জোরালোভাবে দেখা হচ্ছে মর্মে সাংবাদিকদের আলাপচারিতায় সিইসি অবহিত করেছিলেন এবং সব বৈধ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার বিষয়েও বক্তব্য দিয়েছিলেন। ওই সময়কার সিইসি বলেছিলেন, ‘প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, তাই এই প্রযুক্তিকে পিছিয়ে রেখে আমরা এগোতে পারব না। তাছাড়া সাধারণ ভোটাররা ইভিএমএ সঠিকভাবে ভোট দিতে পারেন’। ঠিক হুবহু একই কায়দায় ও শব্দচয়নে বর্তমান সিইসিও ইভিএম বিষয়ে কথা বলে চলেছেন। বিগত সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ (৫ মার্চ, ২০১২) সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করার বিষয়ে কমিশন এখনো সিদ্ধান্ত না নিলেও সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হবে। সিইসি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের আগে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। ইভিএম ব্যবহারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না হলেও সব প্রস্তুতি থাকবে, যাতে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এ নিয়ে কোনো ঝামেলা না হয়’ (যুগান্তর ২০ মার্চ, ২০১২)। আর বর্তমান সিইসি কে এম নূরুল হুদা আসছে সাধারণ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবস্থা রেখে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে কমিশনে সিদ্ধান্ত নিয়ে একই কথা বললেন ইভিএম বিষয়ে। গত ৩০/০১/২০১৮ তারিখে নির্বাচন কমিশন অফিসে ‘আরপিও’ সংশোধন সংক্রান্ত সভাশেষে সিইসি বলেন, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এখনো তারা নেননি। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে ইসি সফলতা পেয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার হলে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি হবে। অংশীজনদের সম্মতি থাকলে, পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার সক্ষমতা ইসির আছে।’ অথচ গত বছর ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বর্তমান কমিশন বলে আসছে, সব দল না চাইলে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। বেশিরভাগ দল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে। তাহলে ইসির এ উদ্যোগ কেন?

সাম্প্রতিককালে ভারতের ইকোনমিক টাইমস পত্রিকার বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয় বিশ্বের ২০০টি দেশের মধ্যে মাত্র চারটি দেশে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। সেসব দেশেও ইভিএম ব্যবহার নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় আজ পর্যন্ত ইভিএমের গ্রহণযোগ্য ব্যবহার ঘটেনি। যে অল্পসংখ্যক দেশে ইভিএম আংশিকভাবে ব্যবহার করা হয়, সেখানেও ভোট প্রক্রিয়ায় ও ফল নির্ধারণে ভয়াবহ কারচুপির প্রমাণ মিলেছে। ভোটগ্রহণের এ পদ্ধতিতে ইন্টারনেট সিকিউরিটি ও তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও গণতান্ত্রিক বিশ্বে সর্বজনীন ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাই প্রায় সব দেশেই নির্বাচনে ইভিএমকে এরই মধ্যে নিষিদ্ধ ও জনবিরোধী মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

বিশ্বের কয়েকটি দেশের উদাহরণ টেনে বলা হয় আয়ারল্যান্ডে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে গবেষণার পেছনে ৫১ মিলিয়ন ইউরো খরচ করার পর এটিকে অবৈধ নির্বাচনী যন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জার্মানির সুপ্রিম কোর্ট ইভিএমকে অসাংবিধানিক ও জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণার মাধ্যমে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন। হল্যান্ডে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ফলাফলের স্বচ্ছতার অভাবে ডাচ কাউন্সিল আইন করে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ইতালি ও প্যারাগুয়েতে ইভিএম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম, জনসংখ্যায় সমৃদ্ধ দেশ, কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের পাঁচটি রাজ্যে (উত্তর প্রদেশসহ যার লোকসংখ্যা প্রায় ২২ কোটি) অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে ব্যবহূত ইভিএমে ব্যাপক কারচুপি সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ আনয়ন করা হয় এবং অবিলম্বে এ সর্বনাশা বিনাশী জালিয়াতিতে পারঙ্গম ইভিএম ব্যবহারকৃত নির্বাচন বাতিল ঘোষণার দাবি তোলা হয়। ১৯ মার্চ ২০১৮ ঢাকার এক দৈনিক পত্রিকায় ‘ভারতে ইভিএম নয়, ব্যালটে ভোটের দাবি’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়, ইলেকট্রনিক ভোটযন্ত্রের (ইভিএম) বিরোধিতা দেখা দিয়েছে ভারতে। দেশটির সবচেয়ে বড় দল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ইভিএমের বদলে আগামীদিনের সব নির্বাচন আগের মতো কাগজের ব্যালটে নেওয়া হোক। আর সাধারণ ভোটারের মধ্যে যে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে তা দূর করতেই পুরনো ব্যালট পেপারে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতিও প্রায় শেষ করে এনেছে দলটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি বড় দল। সম্প্রতি কংগ্রেসের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বলা হয়েছে, ইভিএমের ব্যাপক অপব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য জনমতের উল্টো ফল বেরোয়। এ আশঙ্কা দূর করতেই ব্যালটে ভোট ফের চালু করা দরকার।

ভারতে ভোট প্রদান এবং ভোটারসংখ্যা সংশিস্ন্লষ্ট সমস্যা ভিন্নতর ধাঁচের। ভারতের নির্বাচন কমিশন যার ওপর সব দল ও মতের লোকজনের আস্থা বেশ কয়েক দশক থেকে একরকম অটুট, সে প্রেক্ষাপটে ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভিমত হলো, বর্তমান ভারতে প্রায় ৭৫ কোটি ভোটার আছেন এবং এখানে বহু রাজনৈতিক দলের অগণিত লোক নির্বাচনে প্রার্থী হন। তাই ব্যালট ও আনুষঙ্গিক কাগজ ছাপানোর জন্য ঝক্কি-ঝামেলা হয় প্রচুর এবং অর্থের অপচয় হয় বেশুমারা সেসব কারণে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল না করে অন্য গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি উদ্ভাবন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে চায় কমিশন।

ভারতের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে বিজ্ঞজনদের অভিমত হলো ইভিএম ব্যবহার করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনেক সুবিধা আছে। তবে যদিও যন্ত্রটির ব্যবহারে টেম্পারিং করার সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তা হবে এক কথায় ভয়ঙ্কর ও বিধ্বংসী ঘটনা। ভারতে ইভিএমসংক্রান্ত অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের শুরু হয়েছিল (ইভিএম)-এর পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে কেরালা রাজ্যের একটি নির্বাচনী এলাকায় ১৯৮২ সালে। আর মাতৃভূমি বাংলাদেশে ইভিএম নিয়ে প্রাথমিক নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর আগে ২০১০ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শামসুল হুদার আমলে।

উত্তর প্রদেশে এর সাম্প্রতিক নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে ব্যাপক সন্দেহ ও নেতিবাচক বাউল বাতাস প্রবহমান থাকার প্রেক্ষাপটে সে প্রদেশের নির্বাচন কমিশনার গত ১৪ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে জারিকৃত আদেশে সে রাজ্যের ১৪টি পৌর করপোরেশন, ১৯৩টি মিউনিসিপ্যাল বোর্ডে এবং ৪২৭টি নগর পঞ্চায়েত নির্বাচনে কাগজের ব্যালটই নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মি. কেসি মিত্তাল, সেক্রেটারি লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ডিপার্টমেন্ট অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে তার ইংরেজিতে দেওয়া একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলেন, ‘...Even in the 2014 Lok Sabba election, the Vote Pattern going to BJP was noticed by election officials at Jorhat Parliamentary Constituency and two more EVMs were removed and seized by thy EC on indentical performance from Bhopal’

অতি সম্প্রতি মার্চ (২০১৮) মাসের দ্বিতীয়ার্ধ্বে এবং জুলাই-আগস্ট-২০১৮ মাসে ভারতের সবচেয়ে পুরাতন ও বড় দল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যেহেতু আগামীতে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচন ইভিএমের বদলে আগের মতো কাগজের ব্যালটে অনুষ্ঠানের দাবি দলীয়ভাবে উত্থাপন করা হয়েছে- সে প্রেক্ষাপটে কমবেশি ১০ কোটি ভোটারসমৃদ্ধ বাংলাদেশে ইভিএম নিয়ে সময়, অর্থ, অতি উৎসাহ, লাফালাফি, বাদানুবাদ, হুমকি-ধমকি ইত্যাদি পরিহার করে সামনের সংসদ নির্বাচন ইভিএম ব্যবহার বাদ দিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কার্যক্রম গ্রহণ তথা লেভেল               প্লেস্নয়িং ফিল্ড সৃজনে মনোযোগী হবেন- নাদান দেশবাসীর তা-ই প্রত্যাশা। সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কিছু ক্ষেত্রে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে যে পরামর্শ দিয়েছেন তাতে ১০০ সংসদীয় কেন্দ্রে এর ব্যবহার বিষয়ে সন্দেহ জটিলতা কমার আশঙ্কা নিরসন হবে কিনা অস্পষ্ট। শেষ কথা দাওয়াত দিয়ে সমস্যা ডেকে আনার দরকার কি? আর সময়ই বা কোথায়? প্রচলিত নিয়মনীতি, আইনকানুন, পদ্ধতি পরিহার করে বৈদ্যুতিক আলোর পরিবর্তে হারিকেনের আলোতে অনুষ্ঠিত সভায় ইভিএম খাতে যে ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে মর্মে জানা যায় সে টাকায় ঢাকার চারপাশে নদীগুলো পুনঃখনন কাজ শুরু করলে মানুষের প্রভূত উপকার হতে পারে। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন।

লৈখক : সাবেক সচিব, সাবেক এনপিডি, ইউএনডিপি।  অর্থায়িত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (জানুয়ারি-জুলাই ২০০১)

এই পাতার আরো খবর
up-arrow