Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:২৪
যুক্তফ্রন্ট এবং দ্বিকালের তুচ্ছতাচ্ছিল্য!
গোলাম মাওলা রনি
যুক্তফ্রন্ট এবং দ্বিকালের তুচ্ছতাচ্ছিল্য!
bd-pratidin

আজকের নিবন্ধের বিষয়বস্তু হিসেবে আমি মূলত তিনটি প্রসঙ্গ আলোচনা করব। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট, ২০১৮ সালের যুক্তফ্রন্ট এবং যুক্তফ্রন্টকে ঘিরে তৎকালীন এবং সমকালীন ক্ষমতাসীনদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য নিয়ে আলোচনার শুরুতে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না যে, কোনটি সবার আগে তুলে ধরব।

আমার মনে হচ্ছে মানুষের ভুলো মন এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্যের প্রতিক্রিয়া নিয়ে দু-চারটি কথা বলে মূল প্রসঙ্গের আলোচনা শুরু করলে বিষয়টি পাঠকদের কাছে তুলনামূলকভাবে সহজবোধ্য হবে। আমরা সবাই জানি, ভুলো মন বা স্মৃতিবিভ্রাট বলতে আসলে কিছু নেই। কখনো সখনো মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটলে এবং মস্তিষ্কের নিউরনের সুনির্দিষ্ট অংশে পচন ধরলে মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়। অন্যথায় মানুষ সাধারণত ভোলে না। তারা ভুলে থাকার ভান করে অথবা ভুলে থাকার ভং ধরে বিশেষ সং শুরু করে।

মানুষ যখন মনে করে যে, বিষয়টি তার মনে রাখার দরকার নেই— অথবা তার পদমর্যাদা এবং অবস্থানের কারণে বিষয়টি হয়তো কেউ তাকে মনে করিয়ে দেবে তখনই সে ঘটনাটিকে মনের অভ্যন্তরে ছাইচাপা দিয়ে রাখে। আবার ঘটনার সঙ্গে যদি তার ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান, স্বার্থ, লোভ-লালসা কিংবা প্রাপ্তির যোগ না থাকে, তাহলেও মনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঘটনার ছাই বা সলিল সমাধি রচিত হয়। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রথম যুক্তফ্রন্টের ঘটনাও আমরা একই কারণে ছাইচাপা দিয়ে রেখেছি। এবার তুচ্ছতাচ্ছিল্য নিয়ে কিছু বলি। এটি অত্যন্ত নীতিগর্হিত কাজ এবং সব ধর্মেই এটাকে কবিরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কালামে রব্বানির সূরা লুকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণ ও পরিণতি উল্লেখ করে তা না করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কোরআনের ভাষ্যমতে, মানুষ সবসময় অহংকারের বশবর্তী হয়ে অবজ্ঞা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে এবং একই কারণে জমিনে দম্ভ করে বেড়ায়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমরা এবার সরাসরি শিরোনাম প্রসঙ্গে চলে যাই।

১৯৫৪ সালে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যখন যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো তখন সেই রাজনৈতিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারি দলের লোকেরা পথে-ঘাটে হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-মস্করার পাশাপাশি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নানামুখী কথাবার্তা আরম্ভ করে দিল। তৎকালীন যুক্তফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের বয়স, গণবিচ্ছিন্নতা, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অবিশ্বাস এবং জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে মুসলিম লীগ নেতারা যা মুখে আসে তাই বলা শুরু করলেন। যাকে কেন্দ্র করে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো সেই শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের বয়স ছিল তখন ৮১ বছর। ভারত বিভাগের পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অপাঙেক্তয় হয়ে পড়েন। তাকে ভারতের দালাল আখ্যা দিয়ে এমনভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয় এবং ভয়ভীতি দেখানো হয়, যার কারণে তিনি অলিখিতভাবে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। অন্যদিকে তার কৃষক শ্রমিক প্রজা পার্টির কার্যক্রম, সাংগঠনিক ভিত্তি ও ক্ষমতা সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন পূর্ব বাংলার মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠার অবিসংবাদিত জনপ্রিয় নেতা। তার অতীত ইতিহাস, সফলতা এবং জনপ্রিয়তার জন্য ক্ষমতাসীনরা তাকে ভিতরে ভিতরে যমের মতো ভয় পেতেন।

যুক্তফ্রন্টের দ্বিতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে অপাঙেক্তয়। পাকিস্তান গঠনের পর দীর্ঘদিন তাকে দেশে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীকালে দেশে ফেরার অনুমতি মিললেও তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিতে সুবিধা করতে না পেরে পূর্ব বাংলায় এসে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তিনি যখন আওয়ামী লীগে ভিড়লেন তখন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আজ-কালকার গণফোরাম, এলডিপি বা বিকল্প ধারার চেয়ে কতটুকু বড় বা ছোট ছিল তা যেমন স্পষ্ট করে বলা যাবে না, তদ্রূপ তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পারস্পরিক কলহ-বিবাদ যে বর্তমান সরকারের শরিক দল জাসদের ইনু বনাম বাদলের চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল, তা নির্দ্বিধায় বলা চলে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও তার চীনা নীতি এবং দলের অভ্যন্তরে অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে কোণঠাসা হয়ে তিনিও অনেকটা আশাহত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। ফলে যুক্তফ্রন্ট নিয়ে যখন একপক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করছিলেন তখন অন্যপক্ষ সমানতালে প্রাণখুলে হাসি-তামাশা করেই যাচ্ছিলেন।

প্রথম যুক্তফ্রন্ট গঠনের পর ৬৪ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলা এবং ১৯৭১-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু উত্থান-পতন, নাটকীয় ঘটনা প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র, প্রহসন ইত্যাদি ঘটে গেছে। কিন্তু সব কিছুর ইতিহাস ছাপিয়ে যুক্তফ্রন্টের গঠন ও বিজয়ের কাহিনী আজও রাজনীতির মাঠে ধ্রুবতারা এবং মাইলস্টোন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকবৃন্দ যুক্তফ্রন্টের গঠন ও বিজয়ের নেপথ্য কারণসমূহ বর্ণনা করে যে সারমর্ম তৈরি করেছেন তা মহাকালের রাজনীতির ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য সুখপাঠ্য মর্মবাণী হয়ে রয়েছে। যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পেছনে মূলত সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও ঘৃণা যেমন কাজ করছিল তেমনি পুরো জাতির কাছে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতৃবৃন্দ যখন ফ্রন্টের দায়িত্ব নিলেন তখন মানুষ তাদের ওপর আস্থা স্থাপনের সুযোগ পেল। ব্যক্তি হিসেবে শেরেবাংলা এবং সোহরাওয়ার্দী সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এমন একটি স্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন যাদের যোগ্যতা, সফলতা, গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির সঙ্গে তুলনা করা যেত এমন একজন লোকও মুসলিম লীগে ছিল না। অবস্থার চাপে তারা হয়তো কোণঠাসা ছিলেন— অথবা বয়সের ভারে ন্যুব্জ ছিলেন; কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধিতে তারা ছিলেন অতুলনীয়। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তাদের অতীত সফলতা, নানা অঘটন ঘটনে অপরিসীম দক্ষতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার যে সক্ষমতা তাদের ছিল তার কথা ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নেতারা বেমালুম ভুলে গিয়ে নিজেদের পতন ডেকে এনেছিলেন।

১৯৫৪ সালের ঠিক ৬৪ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে পুনরায় যুক্তফ্রন্ট নাম দিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তি মিলে একটি রাজনৈতিক জোট করেছেন। এ জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ঠিক অতীতকালের মতোই আলাপ-আলোচনা, ঠাট্টা-মশকরা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য মূলক কথাবার্তা শুরু হয়েছে। অতীতকালের সঙ্গে নব্য ডিজিটাল সংস্কৃতির সংযোগ এবং সাম্প্রতিক সময়ের মন-মানসিকতা, চরিত্র, আচার-আচরণ ইত্যাদির সমন্বয়ে সমালোচনার যে ভাষা ব্যবহূত হচ্ছে, তা যদি ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগ নেতারা দেখতেন অথবা শুনতেন তবে শরমে-মরমে মাটির সঙ্গে মিশে যেতেন। সরকারি দলের শীর্ষ নেতারা যদিও সংযত মন্তব্য করেছেন কিন্তু ক্ষমতার মধু-মেওয়াধারীরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন। তারা স্ব-স্ব অবস্থান থেকে ইচ্ছামতো বিষোদগার করার আগে একবারও গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখেননি যে, নয়া যুক্তফ্রন্টের নেতৃবৃন্দের অঘটন ঘটানোর সক্ষমতা বা অক্ষমতার পরিধি কতটুকু। আজকের আলোচনায় যুক্তফ্রন্টের ভূত-ভবিষ্যৎ কিংবা সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে আমি নিজে কিছুই বলব না। আমি কেবল যুক্তফ্রন্টের বিপক্ষের এবং পক্ষের লোকজনের কিছু যুক্তি-তর্ক, আলোচনা-সমালোচনা ইত্যাদি তুলে ধরব। যার ফলে সম্মানিত পাঠক খুব সহজেই নিবন্ধের সারমর্ম অনুধাবন করতে পারবেন।

যুক্তফ্রন্টের বিপক্ষের লোকেরা আবহমান বাংলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রথমেই শুরু করেছেন ফ্রন্টের নেতাদের নানাবিধ-অপমানজনক উপাধিতে ভূষিত করার জন্য। মুরগি মিলন, বাস্টার্ড সেলিম, চাকু মহিউদ্দিন, কুত্তা কানু, চাপাতি যদু, দৌড় সালাউদ্দিন ইত্যাদি অতীত উপাধির মতো করে সম্মানিত লোকদের অসম্মানিত করার জন্য আজগুবি সব উপাধিতে সামাজিক মাধ্যম গিজ গিজ করছে। নেতাদের একান্ত ব্যক্তিগত জীবন, শারীরিক গঠন, বিয়ে-শাদি, দাম্পত্য ও পুত্র-কন্যা পরিজনদের নিয়েও মুখরোচক কটাক্ষ শুরু হয়ে গেছে। তারা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া, দেশীয় রাজনীতিতে তাদের মর্যাদা পরগাছার মতো এবং ব্যক্তিগতভাবে এমপি তো দূরের কথা তারা ভোটাভুটিতে অনেকে যে চেয়ারম্যানও হতে পারবেন না, এমন কটুবাক্য দ্বারা সব আড্ডার প্লাটফর্ম গরম করা হচ্ছে। তারা সবাই দলত্যাগী, রাজনৈতিকভাবে বহুগামী এবং যখন যে পাত্রে অন্ন গ্রহণ করেন সেই পাত্র ছিদ্র করে তারা উপকারী অন্নদাতাকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তারা ভীরু, সুযোগ সন্ধানী এবং দেশি-বিদেশি মন্দ চক্রের মিত্র হিসেবে দেশবিরোধী এবং গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। দীর্ঘদিন একত্র থেকে সংগঠন করা, জনগণের জন্য আত্মত্যাগ, নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে রাজনীতি করা ইত্যাদি বিষয়সমূহ তাদের ডিকশনারিতে নেই।

উপরোক্ত সমালোচনার বিপরীতে যুক্তফ্রন্টের পক্ষের লোকেরা নানান রকমের ইতিবাচক কথা বলে তাদের শক্তিমত্তা এবং আগামী দিনে সফলতা সম্পর্কে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েই চলেছেন। তাদের মতে, যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব শীর্ষ নেতৃবৃন্দের রয়েছে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, তারা কেউ কোনো দিন পকেট ভারী করা, ক্ষমতার লোভ, পদ-পদবির লোভ, স্বার্থসিদ্ধির ধান্ধা ইত্যাদির কারণে রাজনীতি করেননি। জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র এবং নীতি ও আদর্শের জন্য তারা সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। গত ৫০ বছরে এ দেশের যাবতীয় লড়াই-সংগ্রামে তারা সর্বদা মাস্টার মাইন্ড হিসেবে কাজ করেছেন। তারা যখন যে পক্ষে ছিলেন সেই পক্ষই বিজয়ী হয়েছে। অন্যদিকে তারা যাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন তাদেরই পতন হয়েছে। তারা বিএনপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক সময় ছিলেন বটে, তবে নিজেদের স্বার্থে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার জন্য সেখানে যাননি। দলের প্রয়োজনে অথবা সময়ের প্রয়োজনে তারা সেখানে ছিলেন। কিন্তু নীতি ও আদর্শের সঙ্গে অমিল হওয়ার কারণে তারা দলের মধ্যে গণতন্ত্র চালুর চেষ্টায় প্রতিবাদী হয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। তারা দলে থাকা অবস্থায় অথবা দল থেকে বের হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট দলের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত করেননি। বরং দলের বিপদে-আপদে অতীতের তিক্ততা ভুলে পাশে দাঁড়িয়েছেন বহুবার। কিন্তু দল তার সুসময়ে সেই স্মৃতি মনে না রেখে তাদের একের পর এক আঘাত ও অপমান দ্বারা জর্জরিত করেছে।

তারা আরও বলেন, তাদের কারও বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয়, চরিত্রহীনতা, দেশবিরোধী চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ, ক্ষমতাসীনদের পদলেহন করা, অন্যায়ের কাছে মাথানত করার ইতিহাস নেই। তারা যখন যা করেছেন তা প্রকাশ্য দিবালোকে করেছেন— যা বলেছেন তা স্পষ্টভাবেই বলেছেন এবং যখন যে পক্ষে গেছেন বা যার বিরুদ্ধে গেছেন তা ঘোষণা দিয়ে বীরের বেশেই করেছেন। ভোটের রাজনীতিতে ব্যর্থতা, নির্বাচনী এলাকা না থাকা এবং গণমানুষের সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে সংযোগ না থাকা প্রসঙ্গে তারা বলেন, তারা কোনো দিন স্থানীয় রাজনীতি মাথায় রেখে কোনো কিছু করেননি। তারা সর্বদা জাতীয় স্বার্থ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তৎপরতা চালিয়েছেন। দেশের ট্রিপিক্যাল রাজনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুন্ডা-গুণ্ডার পেছনে অর্থ ব্যয়, এমপি-মন্ত্রী হওয়ার জন্য তাঁবেদারি, দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির জন্য লবিং ইত্যাদির পেছনে সময় ব্যয় না করে তারা তাদের বিবেক, বিদ্যা-বুদ্ধি ও সামর্থ্য জাতির জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যয় করেছেন।

যুক্তফ্রন্টের পক্ষের লোকেরা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সুসময়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সামনে দাঁড়িয়ে তার কিছু সহযোগীর বিরুদ্ধে কথা বলা এবং প্রতিকার না পেয়ে জাসদ গঠন কোনো সাধারণ কর্ম ছিল না। তেমনি স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানোর জন্য যে সাহস, শক্তি ও দেশপ্রেম দরকার তা যুক্তফ্রন্টের বিরোধীদের কারও মধ্যে ছিল না। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর প্রকাশ্যে রুখে দাঁড়ানো এবং রাষ্ট্রশক্তি কর্তৃক একনাগাড়ে ১০ বছর স্বাধীন বাংলাদেশে জেলখাটা লোক কী ভীরু না কাপুরুষ তা নিয়ে বিতর্ক করার সময় তাদের নেই। যুক্তফ্রন্ট নেতা আ স ম রব সম্পর্কে উল্লিখিত কথাগুলো বলার পর তারা তাদের আরেক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না সম্পর্কে বলেন, মান্না হলো বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসে একমাত্র সব্যসাচী নেতা। মঞ্চ, গোলটেবিল, সভা-সমিতিতে বক্তৃতা, লেখালেখি, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, বুদ্ধিজীবী মহল, সংবাদপত্রসহ সব গণমাধ্যম এবং ছাত্র-রাজনীতির ময়দানে যুগপত্ভাবে মান্নার যে দক্ষতা তার সমপর্যায়ের দ্বিতীয় ব্যক্তি বাংলাদেশে নেই। জাফর উল্লাহ চৌধুরী এবং বদরুদ্দোজা চৌধুরীর রাজনীতি, পেশাগত সুনাম, সুখ্যাতি ও সফলতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা এবং দলমতের ঊর্ধ্বে দেশব্যাপী তাদের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে তুলনীয় ব্যক্তিত্ব দ্বিতীয়জন এ দেশে নেই বলে যুক্তফ্রন্টের নেতাদের গর্বের সীমা নেই।

ফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন সম্পর্কে তারা বলেন, তিনি হলেন নেতাদের নেতা, শিক্ষকদের শিক্ষক এবং আইনজীবীদের আইনজীবী। জাতির ক্রান্তিলগ্নে নেতারা যখন কোনো সমাধান খুঁজে পান না, কিংবা আইন-আদালতের দ্বারস্থ হওয়া লোকজন যখন উপায় খুঁজে পান না, তখন সবাই তারই দ্বারস্থ হন। তিনি সবার আকর্ষণের কেন্দ্র। সবাই প্রয়োজনে তার কাছে যায়—কিন্তু নিজের কোনো প্রয়োজনে তাকে কোনো দিন কারও কাছে যেতে হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু যখন তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন, তখন সমগ্র ভারতবর্ষে ড. কামালের মতো চৌকস মেধাবী এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্বিতীয় ব্যক্তি যেমন ছিলেন না, তেমনি এখনো নেই। বঙ্গবন্ধু রত্ন চিনতে পারতেন এবং কোন রত্নের কী প্রয়োজন রয়েছে তা বুঝতেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে তুলে ধরার জন্য এবং দেশের সংবিধানের জন্য তিনি দেশের স্বার্থে ড. কামালকে আইনমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিনি যখন আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন তখন সে পদে দাঁড়ানোর যোগ্যতা ও সাহস কতজনের ছিল! তিনি আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এমন কিছু জানেন, যা বাংলাদেশের অন্য কেউ জানেন না। তাকে নিয়ে নানামুখী সমালোচনার পরও তিনি আজ পর্যন্ত একটি উহ্ শব্দও উচ্চারণ করেননি।

উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে যুক্তফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ মনে করেন, তারা সফল হবেন। কারণ তারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে, করণীয় সম্পর্কে, গন্তব্য এবং সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন। অন্যদিকে তাদের প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তারা যুক্তফ্রন্টকে গণনার মধ্যে ধরছেন না। যুক্তফ্রন্টের কৌশল ও কর্মপন্থা নিয়ে গবেষণা ও সেগুলোকে মোকাবিলার উপায় নিয়ে ভাবছেন না। তারা যুক্তফ্রন্ট নেতাদের বুদ্ধিমত্তা, অভিজ্ঞতা, প্রভাব, সাহস, কৌশল এবং পরিস্থিতি কাজে লাগানোর দক্ষতার কথা না ভেবে কেবল নিজেদের শক্তিমত্তা, অর্থবিত্ত ও তথাকথিত বন্ধুদের আশ্বাসবাণীতে নির্ভর করে নিজেদের সময়ের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছেন—যার গন্তব্য তারা নিজেরাও জানেন না।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট

এই পাতার আরো খবর
up-arrow