Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২২:৫০
কত টাকা দরকার?
মাজহারুল ইসলাম
কত টাকা দরকার?
bd-pratidin

আমি ১৯৭৪ ব্যাচের ছাত্র। আমাদের ব্যাচের ছাত্ররাই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/ দফতর/ পরিদফতরে নীতিনির্ধারণী পদে বসে আছেন। ইন্টারমিডিয়েটে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত রুড়িআপ কিপলিংয়ের একটি কবিতা ছিল ‘How Much Money Dose a Man Require’ মীর মশাররফ হোসেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বিষাদ সিন্ধু’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘হায়রে পাতকী অর্থ তুই জগতের সকল অনর্থের মূল’, কবি সম্রাট রবি ঠাকুর লিখেছেন ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভূরি ভূরি’।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতো একটি অতি জনগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদফতরে কাজ করেছি। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দেখেছি দুর্নীতি কাকে বলে কত প্রকার ও কী কী। আমরা কেন যেন ভুলে যাই ছোট্ট একটি জীবন। এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে এত টাকা, এত ক্ষমতা, এত অহংকারের এমনকি আছে। একটি খরগোশ বাঁচে সাড়ে তিন শত বছর, শকুন পাঁচ শত বছর, অথচ আল্ল­াহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ বাঁচে মাত্র ৭০-৮০ বছর। সমসাময়িক কিছু ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটে গেল অথচ আমাদের বোধদয় হলো না।

এইচ এম এরশাদ সাহেব ৯ বছর বাংলাদেশের শাসনকর্তা ছিলেন। ক্ষমতা ছাড়ার পর দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছর কারাবরণ করতে হলো। বিএনপির শাসন আমলে এক বন কর্মকর্তা ছিল। তাকে বলা হতো বনের রাজা। তার বাসায় টাকা রাখার মতো জায়গা ছিল না। তার শোচনীয় পরিণতির কথা আমরা সবাই জানি। আজকে কোথায় বিএনপির সেই ক্ষমতাধর অর্থলোভী নেতারা। কেউবা কারাগারে, কেউবা নির্বাসিত, আবার কেউবা পলাতক। টাকা পয়সার দরকার হয় মানুষের সুখ-শান্তির জন্য। যে টাকা মানুষের কোনো কল্যাণে আসে না, সেই টাকায় লাভ কী? পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দুর্নীতির জন্য পুলিশ বিভাগ এবং বিআরটিকে দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো এমন কোনো অধিদফতর বা পরিদফতর আছে যেটা দুর্নীতিমুক্ত? পুলিশ বাহিনীতে সিপাহি পদে চাকরি পেতে ২০-২৫ লাখ টাকা লাগে। সরকারের বিভিন্ন দফতরে ১০-১২ লাখ টাকার কম কোনো পদেই চাকরি হচ্ছে না। চাচা মামা তথা ক্ষমতার বিষয়টা আলাদা। সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? একটি পরীর মতো সুন্দরী মেয়ে ঐশী। শুধু মা-বাবার অনাদর অবহেলায় আর অর্থের লোভে মেয়েটি নষ্ট হয়ে গেল। মেয়েটিকে আমি নিজে দেখেছি টঙ্গীতে সমাজসেবা অধিদফতরে কিশোরী অপরাধ সংশোধন কেন্দ্রে। বাবা ছিল পুলিশ অফিসার। সন্তানের চেয়ে টাকাই ছিল বাবার কাছে মধুর চেয়ে মিষ্টি। একটি মেয়ে হঠাৎ করে স্বজ্ঞানে তার মা-বাবা-কে খুন করতে পারে না। দীর্ঘদিন শুধু অনাদর আর অবহেলার পরিণাম এমনই হয়। কথায় বলে পাপে ছাড়ে না বাপেরে। অন্তত ইতিহাস তাই বলে।

সামনে জাতীয় সংসদের একাদশ নির্বাচন। ক্ষমতাসীন দলের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। ২০০৮ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করে চলেছে। এই সময়ে কেউ কেউ দুর্নীতি করে পাহাড়সম অর্থের মালিক হয়েছে। তাদের বিচারের আওতায় আনা সরকারের জন্য জরুরি। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার কাজ কী? গোয়েন্দা সংস্থার এত লজিস্টিক সাপোর্ট থাকার পরেও তারা নীরব কেন? পৃথিবীর প্রতিটি উন্নত দেশেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের ত্রৈমাসিক তথ্য সরকার সংরক্ষণ করে। আমাদের দেশে এটা চালু হলে ক্ষতি কী? শুধু চালু করলেই চলবে না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে সরকারকেই।

২৯ আগস্ট বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত খবরে দেখলাম ‘সন্তানের সামনে মাকে পিটাল ডিবি পুলিশ’। ঘটনাটি ঘটে গেল নারায়ণগঞ্জ। পুলিশকে বলা হয় জনগণের বন্ধু। কোনো পুলিশ অন্যায় করলে তাকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়। এটা তো কোনো শাস্তি হলো না। যে দফতরে ড. জাবেদ পাটোয়ারীর মতো, বেনজীর আহমেদের মতো সৎ কর্মকর্তা নীতিনির্ধারণী পদে বসে আছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নিজেও একজন ভালো মানুষ। সেই দফতরের অবস্থা এমন কেন? পুলিশ বাহিনী কোনো দলের নন। আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। অথচ বিএনপির শাসন আমলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পিটান, মহিলাদের বিবস্ত্র করেন। আবার আওয়ামী লীগের শাসন আমলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ফলে পুলিশ বাহিনীর প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয়। কিছু অসৎ লোকের কার্যকলাপে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে না। আমার মনে হয় সরকারবিরোধী একটি বলয় সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টের জন্য অপকর্মগুলো করে যাচ্ছে। শুধু পুলিশ বাহিনী কেন? সরকারের প্রতিটি সংস্থাতেই একটি দুর্নীতিবাজ চক্র সংঘবদ্ধভাবে নির্বিবাদে ঘুষ-দুর্নীতির বহুরূপী বাণিজ্য করে পার পেয়ে যাচ্ছে। এদের কোনো দল নেই। এরা সব সময় সরকার দলের। মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেছে। আমাদের জন্য না হোক আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ নির্মাণ করা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের নৈতিক দায়িত্ব।

পাদটীকা : আমি ২০১৫ সালের জুন মাসে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিতে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় গিয়েছিলাম। পাঁচতারা হোটেল গ্রান্ড সামারায় উঠে হাত-মুখ পরিষ্কার করে বিকালের নাস্তা খেতে গেলাম, বিল এলো বাংলাদেশের মুদ্রায় ২৭০০ টাকা। কয়েক দিন আগে টাঙ্গাইল গিয়েছিলাম। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের রেস্ট হাউসে রাত যাপন করলাম। ফজরের নামাজ পড়ে পাশের হোটেলে গেলাম সকালের নাস্তা খেতে। ভুনা খিচুড়ি আর দুটি ডিম দিয়ে নাস্তা খেলাম। বিল এলো ৬০ টাকা। সরকার ২০১৫ সালের একটি যুগান্তকারী জাতীয় বেতন স্কেল উপহার দিল। যে দেশে ৬০ টাকা দিয়ে সকালের নাশতা খাওয়া যায়, সেই দেশে একজন মানুষের চলতে কত টাকা লাগে?

লেখক : কলামিস্ট।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow