Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৪৮
জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি আহমদ রফিককে
মফিজুর রহমান লালটু
জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি আহমদ রফিককে

আহমদ রফিক নামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় একজন কবি হিসেবে। পাশাপাশি জেনেছি ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা। কাছাকাছি সময়ে ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর একাধিক বইও পেয়েছিলাম। নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে তাঁর সঙ্গে যখন সরাসরি যোগাযোগ ও খানিকটা ঘনিষ্ঠতা তখনই তাঁর বিস্তর লেখালেখি ও কর্মযজ্ঞের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। এরপর ক্রমেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। মাঝেমধ্যেই তাঁর সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িতে যেতাম। এরপর অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে সাংস্কৃ-তিক অঙ্গনে যৌথভাবে কার্যকর কিছু করা যায় কিনা, তা নিয়ে। এ সময় নানা বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রায়ই আলোচনা হতো তাঁর বাসায়। ১৯৯৬ সালে তিনি শুভেচ্ছা হিসেবে প্রথম আমাকে একটি বই দেন। বইটির নাম ‘এই অস্থির সময়’; প্রবন্ধের সংকলন। ওই বছরই কলকাতার ‘মৈত্রী প্রকাশন’ জানুয়ারির বইমেলায় সেটা প্রকাশ করেছে। সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের ব্যাপারে এটি তাঁর আগ্রহ, আন্তরিকতা ও চেষ্টা মনে হয়েছিল।

তাঁর কবিতায় গ্রাম আছে, আছে মাটি-মানুষ-প্রকৃতি, স্বদেশ। নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে শোষিত শ্রেণি এসেছে স্পষ্টভাবে। সমাজ, রাজনীতি, জীবন, চিরায়ত মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে, রোমান্টিকতার চেয়ে সেখানে সমাজ চেতনাই প্রবল। তীব্র আশাবাদের সঙ্গে কখনো কখনো হতাশা কবিকে ভারাক্রান্ত করেছে। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : নির্বাসিত নায়ক (১৯৬৬), বাউল মাটিতে মন (১৯৭০), রক্তের নিসর্গে স্বদেশ (১৯৭৯), বিপ্লব ফেরারি, তবু (১৯৮৯), পড়ন্ত রোদ্দুরে (১৯৯৪)। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সময় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সব কটিই তাঁর জীবনের ওই নির্দিষ্ট সময়ের সংকট-সংগ্রাম, সামাজিক বাস্তবতা, আকাঙ্ক্ষা আর হতাশাকে প্রকাশ ও মূর্ত করে তুলেছে।

আহমদ রফিকের ব্যক্তিজীবন মোটেও সরলরৈখিক নয়। একেবারে শিশু বয়স থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সংগ্রামের ভিতর দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা। ইতিহাসের একাধিক উথাল-পাথাল, সংগ্রামী সময়ের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন কেটেছে। সেই সংগ্রামে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। তিনি এক দীর্ঘ ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী শুধু নন, অংশীও।

আহমদ রফিক সারা জীবন জ্ঞানচর্চা করেছেন। এই চর্চার কেন্দ্রে ব্যক্তিস্বার্থ নয়, সমষ্টিস্বার্থই প্রাধান্যে থেকেছে বরাবর। স্বদেশের মুক্তি, শ্রেণিমুক্তির চেতনা তাকে চালিত করেছে, মানবমুক্তিকে কর্তব্য হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। স্কুলজীবনে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে দেশের স্বাধীনতার জন্য ছাত্র আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন। কলেজ জীবনে মানবমুক্তির মতবাদ হিসেবে মার্কসবাদকে গ্রহণ করেছিলেন। সংগঠিত হয়েছিলেন মার্কসবাদী চিন্তার সংদগঠনে। সেই চিন্তার আলোকেই তাঁর প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শিল্প সংস্কৃতি জীবন’ (১৯৫৮)। শখের বসে লেখেননি। শিল্প-সাহিত্যে বিভ্রান্তিকর, প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা খ-ন করার তাগিদ বোধ করেছিলেন তা লিখতে একেবারে যুবক বয়সে। অদ্যাবধি সেই পথেই আছেন চিন্তায়, জীবনাচরণে। এজন্য নানা ধরনের কর্মতৎপরতার মধ্যে থেকেছেন, লিখেছেন বিরামহীনভাবে, পত্রিকা বের করেছেন। অর্থনৈতিক সংকট, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, পিছিয়ে এসেছেন কয়েক কদম। তিনি বাম রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন, সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে থেকেছেন, ব্যক্তিগত অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন কিন্তু মানবমুক্তির সেই রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত স্থির থাকতে পারেননি। যদিও সারা জীবন সেই চেতনার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস বা অর্থ উপার্জনের পথে হাঁটেননি। বরং দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধির কথা ভেবেছেন এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির শোষণ নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে জাতীয় পুঁজির বিকাশের নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই লক্ষ্যে দেশীয় ওষুধশিল্প গড়ে তুলেছিলেন।

প্রচারবিমুখ, ভীষণ অন্তর্মুখী আহমদ রফিক একজন মার্কসবাদী সাহিত্যিক, সত্যনিষ্ঠ গবেষক ও বড় মাপের প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখায় স্বদেশচিন্তা, মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণমুখী বক্তব্য স্পষ্টভাবে উঠে আসে। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ অথবা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য বিবেচনা করে তিনি কিছু লেখেন না বা বলেন না। কপট নয়, নিপাট সত্য বলা মানুষ তিনি। আহমদ রফিকের যা কিছু সম্পদ তার সবটুকু জ্ঞাননির্ভর লেখালেখি। সে সম্পদ মানুষের, সমাজের। সব মিলিয়ে বর্তমানে তার গ্রন্থের সংখ্যা ৮০ অতিক্রম করেছে। এর কোনোটিই সস্তা নয়, প্রয়োজনীয়। কিছু লেখা ইতিহাস ও ভাবনায় নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০১৪ বইমেলায় প্রকাশিত অনন্যসাধারণ গবেষণাগ্রন্থ ‘দেশ বিভাগ : ফিরে দেখা’। বিষয়বস্তু ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের বিভাজন তথা বহুকথিত ‘পার্টিশন’ এক রক্তাক্ত ঐতিহাসিক ঘটনা; যা ‘মানব ট্র্যাজেডি’ হিসেবেও চিহ্নিত। সংকট সমাধানের নামে দেশ বিভাগ যে কী ভয়াবহতা জন্ম দিতে পারে ’৪৭-এর দেশ বিভাগ তার এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ত্রিধারায় বিভক্ত উপমহাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিতে কোনো সুফল বয়ে আনেনি শুধুই ক্ষতবিক্ষত করেছে। বইটিতে তার মর্মন্তুদ বর্ণনা ও পরিণতি উঠে এসেছে। তাঁর গ্রন্থের একটা বড় সংখ্যা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের নানা দিক নিয়ে এককভাবে এত বিপুল লেখা দুই বাংলার অন্য কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও কর্মকে ব্যাপক মানুষের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি ‘রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছিলেন। সংগঠনটি অনেক দিন উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে। এটা রবীন্দ্রনাথের প্রতি একধরনের পক্ষপাতিত্ব মনে করে তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলাদা প্রতিষ্ঠান করলেন, আরও অনেকেই তো ছিল? উত্তরে যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ দাঁড়ায়, ‘পাকিস্তান আমল থেকে আমাদের এখানে রবীন্দ্রনাথকে যেভাবে ভিন্নধর্মের-বিদেশি কবি ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক আবরণে তাঁকে নিষিদ্ধ, বর্জনের তৎপরতা শাসক শ্রেণির দিক থেকে করা হয়েছে পরবর্তীতেও রবীন্দ্রচর্চা খুবই খন্ডিত আকারে এখানে অধ্যয়ন বা চর্চা হয়েছে তাতে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর চিন্তা জনগণের মধ্যে সঠিকভাবে পৌঁছায় না, বিভ্রান্তিকরভাবে পরিচিত হয়। অথচ আমাদের জাতিসত্তার বিকাশ থেকে শিল্প-সাহিত্যে তাঁর অবদান অনন্যসাধারণ। তাই রবীন্দ্রনাথের ভাবনা, দর্শন, আমাদের ভালোভাবে জানা-বোঝা খুব দরকারি মনে হয়েছিল। তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এ রকম প্রতিষ্ঠান কেউ তো করেনি।’

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রামের ইতিহাস, চেতনা, তার বাস্তবায়ন ইত্যাদি নিয়ে ‘একুশে চেতনা পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন তিনি গঠন করেছিলেন, এই আন্দোলনে তাঁর নিজের সম্পৃক্ততার অনুভূতি এর সঙ্গে যুক্ত। ক্বচিৎ তার কর্মকা- হয়ে থাকে। এ ছাড়া আহমদ রফিক অনেক দিন সক্রিয়ভাবে সেভাবে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন। আমাদের সমাজে যে ধরনের ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক তৎপরতার জাল বিস্তার হয়েছে তাতে শুধু সমষ্টিস্বার্থ নিয়ে যারা ভাবেন তাদের ‘বোকা’, ‘নির্বোধ’ শ্রেণিতেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ তাঁর বক্তব্য, ‘ব্যক্তিকে নিয়েই সমষ্টি। ব্যক্তির শ্রেণিবিশেষের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতেই তো সমষ্টিগত লড়াই।’

গত বছর বিশ্বব্যাপী অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদ্্যাপিত হয়েছে। ১০০ বছর আগে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লব ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা, যা অক্টোবর বিপ্লব নামে ইতিহাসে খ্যাত। এর মধ্য দিয়ে হাজার হাজার বছরের শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সমাজতন্ত্র। আমাদের দেশেও যথেষ্ট জাঁকজমকপূর্ণ ও বর্ণাঢ্যভাবে এই মহান বিপ্লস্নবের শতবর্ষ উদ্্যাপিত হয়েছে। দেশের অধিকাংশ কমিউনিস্ট ও বাম রাজনৈতিক দল, শ্রেণি-গণসংগঠন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, লেখক, শিল্পী, কবি সম্মিলিতভাবে ‘অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদ্্যাপন জাতীয় কমিটি’র ব্যানারে বছরব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রস্তাবে এই জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন আহমদ রফিক এবং বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অনুষ্ঠানের স্লোগান নির্ধারিত হয়েছিল ‘ব্যক্তিমালিকানার পৃথিবীকে বদলে দিয়ে সামাজিক মালিকানার মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলুন’।

আমাদের দেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসক শ্রেণির উচ্ছিষ্টভোগী। এরা ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার জন্য নিজেকে বিকিয়ে দিতে কসুর করেন না। অনেক সুযোগ থাকার পরও আহমদ রফিক  আত্মবিক্রয় করেননি। সততা, আদর্শ, চেতনা ও মানুষের কাছে দায়বদ্ধ থেকেছেন। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একই সঙ্গে সততা ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি অনাসক্তি এ দুই গুণের অধিকারী মানুষের সংখ্যা খুব নগণ্য। আহমদ রফিক সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন হবেন সন্দেহ নেই। তিনি আমাদের দেশের প্রকৃত অর্থে পেশাদার লেখকদের অন্যতম।

১২ সেপ্টেম্বর তাঁর নব্বইতম জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। তিনি আরও অনেক দিন সুস্থ-সচল থাকবেন— সেটাই প্রত্যাশা করি।

 লেখক : সাংস্কৃতিক সংগঠক ও

নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দুনিয়া

এই পাতার আরো খবর
up-arrow