Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১০ জানুয়ারি, ২০১৯ ২৩:৪৩
প্রত্যাশা-প্রাপ্তির স্বপ্নজট
সামিয়া রহমান
প্রত্যাশা-প্রাপ্তির স্বপ্নজট

উৎসব, উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠার ডামাডোলে শুরু হলো ২০১৯। সে উত্তেজনা যেমন ছিল রাজনীতির নেতাদের, উত্তেজনা ছিল জনগণের, উত্তেজনা ছিল গণমাধ্যমের। রাজার নীতির নেতারা ব্যস্ত ছিলেন ক্ষমতার শিখরে আসন পাকাপোক্তকরণে, জনগণ উত্তেজনায় ছিল কারা আগামী পাঁচটি বছর তাদের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হাতছানি দেবে, তা জানার আগ্রহে, আর গণমাধ্যম? গণমাধ্যমের জন্য নির্বাচন ছিল উৎসব। এত ঘটনার ঘনঘটা তো আর রোজ রোজ আসে না। বিশেষ করে ক্ষমতার কেন্দ্রের সব ব্যক্তিকে নিয়ে। প্রতিটি গণমাধ্যম তাদের সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয় করে, অধিক অর্থ আয় করে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান ও খবর প্রদানে ব্যস্ত ছিল। নির্বাচনী অর্থকড়ির মৌসুমে গণমাধ্যমগুলো আদতে কতটা দর্শক মনোরঞ্জন করতে পেরেছে বা আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বলতে পারবেন দর্শক আর গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকরা। মজার বিষয় হলো, গণমাধ্যমে আমরা যারা কাজ করি তাদের একটি বিশেষ সুবিধা আছে। আমরা নিজেরাই নিজেদের পিঠ চাপড়াই। গৎবাঁধা কিছু অনুষ্ঠান আর লাইভ করে মনে করি- না জানি কী করে ফেললাম। আদৌ কতটা পেরেছি তা নিয়ে দর্শকরাই সন্দিহান। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা ভাবী বিশ্বজয় করে ফেলেছি। বিজ্ঞাপনদাতাদের আনুকূল্যের জন্য আমরা নির্ভর করি টিআরপি নামক অদ্ভুত এক গবেষণার ওপর। কিন্তু তা কতটা ব্যক্তিগত যোগাযোগ, কতটা টাকার লেনদেন আর কতটা নিখাদ গবেষণার হিসাব-নিকাশÑ দিন শেষে কিন্তু আমরা সবাই জানি।

রাজনৈতিক উত্তেজনা আর প্রতীক্ষার অবসানে শেষ পর্যন্ত নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার শিখরে তাদের আসন পাকাপোক্ত করেছে। নবনির্বাচিত এমপিরা শপথ নিয়েছেন, নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভবিষ্যতে কোথায় যাবে, কী করবে তার পুরোটাই অনিশ্চিত। বিদেশিদের কাছে নালিশ বা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা- তাদের কতটা জনগণের কাছে বা ক্ষমতার কাতারে নেবে, তা বলা এখন আসলেই বড় কঠিন। আন্দোলন গড়ে তোলার মতো সাংগঠনিক শক্তি বা তৃণমূলে লোকবল (ভাড়া করা নয়) কতটা আছে এবং তারা সংগঠিত কিনা, তা ২০১৯-এর ভবিষ্যতের দিনগুলোই বলতে পারবে।

একটা জোক মনে পড়ে গেল। ভুলেও কেউ এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের যোগসূত্র খুঁজবেন না যেন। ‘মৃত্যুর পর একটি লোকের শয়তানের সঙ্গে দেখা হলো। শয়তান তাকে জানাল, ওই ব্যক্তির পার্থিব জগতে কর্মকা-ের জন্য লোকটি নরকে নির্বাসিত হয়েছে। তবে তার প্রতি অনুকম্পা দেখিয়ে বিধাতা তাকে নরকের স্থান বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। শয়তান সেই লোকটিকে প্রথমে যে স্থানটিতে নিয়ে গেল, সেখানে ময়লা-কাঁটা, রক্ত-মাংসের মধ্যে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে পোকা কিলবিল করছে। ময়লা-কাঁটা তাদের ঘাড় পর্যন্ত উপচে আছে। লোকটি ভীত হয়ে শয়তানকে বলল, না, এখানে থাকব না। শয়তান তাকে আরেকটি জায়গায় নিয়ে গেল। সেখানেও মানুষ নোংরা ময়লা-কাঁটার মধ্যে আটকে আছে। সে ময়লা-কাঁটা প্রায় নাক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। লোকটি সভয়ে বলল, না, এখানেও নয়। শয়তান তাকে নিয়ে গেল আর একটি স্থানে। লোকটি দেখে, সেখানে মানুষ ময়লা-কাঁটার মধ্যে আছে বটে, তবে সেটি হাঁটু পর্যন্ত। এবং সেখানে মানুষ চা-শিঙ্গাড়া খাচ্ছে। লোকটি দ্রুত বলে উঠল, আমি এখানেই থাকব। শয়তান বলল, তথাস্তু। লোকটি চায়ের কাপে হাত বাড়ানো মাত্র শয়তান বলে উঠল, সবাই যার যার জায়গায় চলে যাও। চা-এর বিরতি শেষ। মুহূর্তের মধ্যে ময়লা-কাঁটা, পোকামাকড় সবার মাথার ওপর উঠে গেল। লোকটি ডুবে গেল নর্দমার সাগরে।’ প্রতিপক্ষের অবস্থান কৌশল না বুঝে, অতি চালাকিতে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়। দল ডুবে যায়। ২০১৩-১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সব প্রস্তাবে, বিশেষ করে সর্বদলীয় সরকার গঠনের এবং কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তির লেনদেনের সুযোগটির সদ্ব্যবহারের অভাবে আজ বিএনপি কি একদম হারিয়ে গেল? যদিও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, এবারের নির্বাচন প্রমাণ দিয়েছে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়াটা বিএনপির বুদ্ধিমত্তার কাজ ছিল। কিন্তু ২০১৩-১৪-এর পরিস্থিতি আর ২০১৮-১৯ যে এক নয়, বিএনপি সেই হিসাব-নিকাশ বোধহয় করে উঠতে পারেনি। বড় সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও আদালতের রায়ে যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সঙ্গে চিরমিত্রতা কি আখেরে কোনো ফল দিল? হেফাজতের শোকরানা মাহফিলে যোগ দেওয়া নিয়ে আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা আওয়ামী লীগের তুমুল সমালোচনা করেছিলাম। কিন্তু কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলে বুদ্ধিমান ও কৌশলী আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে ধর্ম আর ভারতবিদ্বেষকে কাজে লাগানোর সুযোগই দেয়নি বিএনপিকে। উন্নয়ন আর গণতন্ত্রকে একে অন্যের পরিপন্থি করে যে সমালোচনা বিএনপি করেছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, সে সমালোচনাকেও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ তো ক্ষমতায় এলো, কিন্তু জনগণের প্রশ্ন- বিএনপি এখন কী করবে? দেশের কোথাও কোনো অসন্তোষ আর বিদ্রোহের সুযোগের দীর্ঘতর অপেক্ষা? নাকি শুধু খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের সম্মানের কথা চিন্তা না করে বরং জনগণের ন্যায্য দাবির জন্য মাঠের রাজনীতি করবে? ২০১৯-ই বলতে পারবে। অবশ্য আওয়ামী লীগেরও ভুলে গেলে চলবে না, যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারতে ১৯৮৪ সালে অষ্টম সাধারণ লোকসভা নির্বাচনে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল, তারাই এখন ভারত শাসন করছে। দিল্লিকে ধরে মোট ৩০টি রাজ্যের মধ্যে বিজেপি ও বিজেপির জোট এখন ক্ষমতায় ১৯টি রাজ্যে। শতাংশের হিসাবে ৬৩ শতাংশ ভারত মোদির করায়ত্তে। ২৪ বছর আগে কংগ্রেস ও তার জোট ১৮টি রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কর্ম চিরস্থায়ী, জনগণ তাদেরই চায়, যারা জনগণের জন্য শুধু মুখে নয়, বাস্তবে কাজ করে।

এখন ২০১৯-এর শুরুতে একটি বড় প্রশ্ন সবার- শক্তিশালী বিরোধী দল কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য জরুরি নয়? সংসদ কতটা কার্যকর হবে এ ক্ষেত্রে? গণতন্ত্রকে মজবুত রাখার জন্যই জবাবদিহি প্রয়োজন, সমালোচনা প্রয়োজন। সে সমালোচনা বা উৎসাহ (চাটুকারিতা নয়) কে দেবে? সমালোচনার জন্য সমালোচনা নয়, বরং দেশের উন্নয়নের জন্য সব দল মিলে একজোট হয়ে কাজ করা। সে চিত্র অবশ্য বাংলাদেশের জন্য দুষ্প্রাপ্যই বটে। তবে আশার কথা, আমাদের গণমাধ্যমগুলো বহাল তবিয়তে সেই মিনি সংসদের কাজ করে যাচ্ছে। যে রাজনীতিবিদরা মাঠে ময়দানে জড়ো হতে পারেন না বলে অভিযোগ করেন, তারাও প্রবলভাবে গণমাধ্যমেই ঝড় তোলেন। সংসদীয় রীতিনীতি বা প্রণীত আইনের সমালোচনা করেন। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দুর্বলতার যে অভিযোগ, গণমাধ্যম হয়তো একাই এক শ হয়ে সে অভিযোগ খ-ন করবে। কিন্তু বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর কী হবে? ২০১৯-ই বলতে পারবে।

একটি পরিচিত গল্প বলি। ‘মরুভূমিতে আটকা পড়েছিল তিন বন্ধু। পানি নেই, প্রখর রোদে-উত্তাপে তাদের জীবন প্রায় যায় যায়। এমন সময় এক বন্ধু কুড়িয়ে পায় আলাদিনের চেরাগ! ঘষা মাত্রই চলে আসে দৈত্য এবং সেই একটি করে ইচ্ছা পূরণ। প্রথম বন্ধু দেশে ফেরত যেতে চাইল। আর মুহূর্তের মধ্যে চলেও গেল। দ্বিতীয় বন্ধুরও একই ইচ্ছা। ইচ্ছা পূরণও হলো দ্রুত। তৃতীয় বন্ধু বলে উঠল, “আমি একা। আমি চাই আমার বন্ধুরা এখানে আমার কাছে ফিরে আসুক।” আর দৈত্যের কল্যাণে আবারও মরুভূমিতে হাজির হয়ে যায় দুই বন্ধু!’

জোকস বা গল্প-কবিতায় অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় নিজ কলমের কল্যাণে, কিন্তু বাস্তবের ট্রেন মিস করলে সেই ট্রেন কি আর ফিরে আসে? তখন নালিশ, হা-হুতাশ ছাড়া আর গতি কী! বরং বাস্তবকে মেনে নিয়ে উন্নত বিশ্বের কাতারে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার সর্বমিলিত চেষ্টাই পারে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে।

‘একবার একটি ছোট ছেলে চুল কাটার জন্য নাপিতের কাছে গিয়েছিল। নাপিত বাচ্চা ছেলেটিকে দেখিয়ে তার আর এক কাস্টমারকে বলল, এর মতো বোকা বাচ্চা আপনি সারা বাংলাদেশে আর একটাও পাবেন না। দেখুন আমি এখনই প্রমাণ দেব। নাপিত এক হাতে ১০০ টাকা আর অন্য হাতে ৫০০ টাকা নিয়ে ছেলেটিকে বলল, বাবা তুমি কোন হাতের টাকা নেবে? ছেলেটি ১০০ টাকা নিয়ে চলে গেল। নাপিত হেসে বলল, দেখেছেন এই বোকা আর জীবনেও মানুষ হবে না। ৫০০ টাকা ছেড়ে সে ১০০ টাকা নেয়। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি আইসক্রিম খেতে খেতে দোকানে আবার প্রবেশ করে। এবার সেই কাস্টমারটি বাচ্চা ছেলেটিকে ডেকে বলে, তুমি ৫০০ টাকা নিলে না কেন? ছেলেটি আইসক্রিম চেটে বলে, কারণ যেদিন আমি ৫০০ টাকা নেব সেদিন থেকে টাকা দেওয়ার এ খেলাটি বন্ধ হয়ে যাবে!’ কে বোকা আর কে চালাক তার হিসাব-নিকাশ করবে কে? ক্ষমতার কাতারে থাকার জন্য শুধু জনগণের দোয়া নয়, বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলও প্রয়োজন। প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক ট্রেনটি ধরা। ট্রেন মিস করলে চেনা পথে আবার ফিরে আসা দুর্গমই বটে। শুধু ধর্ম, ভারতবিদ্বেষ আর গণতন্ত্রের একই কথার খেলা কি বার বার চলে?

রাজনীতিতে কৌশল আর খেলা চলবেই। জনগণ চায় তাদের উন্নয়ন। জনগণ চায় শান্তি, সমৃদ্ধি, ভাত-কাপড়, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার সুব্যবস্থা। শুধু নালিশ আর কোন্দল অস্থিরতা বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেবে না। মতপ্রকাশের অধিকার যেমন আমার আছে, তেমন আমার দায়িত্ব, দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ।

নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে। নতুন-পুরাতনের চমৎকার সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা অবশ্যই এ ক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার। জনগণ তাকিয়ে আছে নতুন মন্ত্রিসভার দিকে। ব্যাকুল প্রত্যাশা- মন্ত্রিসভার সদস্যরা যেন তাদের যোগ্যতা-দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন, বিতর্কিত না হন। মুক্তিযুদ্ধের সরকার স্বাধীনতাবিরোধীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেবে না তা জানি। কিন্তু বিশ্বাস করতে চাই, ক্ষমতার গ-িতে থেকে কেউ যেন বাণিজ্যের সুযোগ না পায়, বিশ্বাস করতে চাই, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীদের সরকার আগাছার মতো উপড়ে ফেলবে। আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি নিশ্চয়ই স্মরণে রাখবে।

২০১৯-এর শুরুর গল্প শেষ করছি একটি জোক দিয়ে। ‘নতুন বছরের প্রথম দিন। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক তার কর্মীদের ডেকে বললেন, গত বছর তোমরা বেশ ভালো কাজ করেছ। এই নাও পাঁচ লাখ টাকার বোনাস চেক। এ বছর এমন ভালো করলে আগামী বছর চেকে সই করে দেব।’

জনগণ কৌশলী নয়, কিন্তু জনগণ সচেতন। আগামী বছর নয়, এ বছর থেকেই জনগণ দেখতে চায় সরকারের প্রতিশ্রুত সুশাসন, দুর্নীতি দমন, জঙ্গিবাদ আর মাদকের বিরুদ্ধে প্রকৃত যুদ্ধ আর তার ফল। জঙ্গিবাদ আর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের মতো সুশাসন আর দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের অনমনীয় ভূমিকা। রাতারাতি সব সম্ভব নয় জানি। কিন্তু সম্ভবের দিকে পা বাড়ানো তো নিশ্চয়ই সম্ভব।

            লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow