Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:০৪
আসিফ নজরুল কেন জিয়া-খালেদার দিকে ঝুঁকলেন?
পীর হাবিবুর রহমান
আসিফ নজরুল কেন জিয়া-খালেদার দিকে ঝুঁকলেন?

দেশ-বিদেশে রাজনীতিবিদদের নিয়ে লেখা কোনো লেখকের বই কিংবা কোনো রাজনীতিবিদের স্মৃতিচারণা বা আত্মজীবনী প্রকাশ হলে তা পাঠ করার ব্যাপারে আমার প্রবল আকর্ষণ অনুভূত হয়। যেখানে পাই কিনে হোক, কিংবা সংগ্রহ করে হোক অন্তহীন তৃষ্ণা থেকে গভীর মনোযোগসহকারে পাঠ করার চেষ্টা করি। এমনকি পাবলো নেরুদা থেকে খুশবন্ত সিং কিংবা জগদ্বিখ্যাত অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের আত্মজীবনীও আমি পাঠ করেছি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত জীবনী আমি কয়েক দফা পাঠ করেছি। উপমহাদেশের রাজনীতিবিদ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ থেকে শুরু করে মহাত্মা গান্ধী, পন্ডিত জওহরলাল নেহরু, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী হয়ে এ পি জে আবদুল কালাম থেকে যশোবন্ত সিংয়ের বইটিও পড়েছি।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার আত্মজীবনী পাঠ করেছি হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে শুয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পাঠ করা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খলনায়ক একুশ শতকের পৃথিবীতেও নিন্দিত জার্মান একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের জীবনী। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু থেকে অনেককে নিয়ে লেখা বই আমি তৃষ্ণার্ত হৃদয় নিয়ে পড়েছি। মরহুম কূটনীতিক ও স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর রোমাঞ্চকর জীবনী ইতিহাসের প্রান্তে লেখা শেষ করে প্রখ্যাত সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী বহু আগে জমা দিলেও তা আর প্রকাশ হলো না। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে লেখা বই তো বটেই, রাজনীতিবিদ মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরী যখন তার লেখা রাজনীতির তিনকাল বইটি পাঠালেন, সারা রাত জেগে পাঠ করতে করতে যখন শেষ করেছিলাম তখন বাইরে ভোরের আলো। আর শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের ‘বলেছি, বলছি, বলব’ বইটি দুই রাতে পাঠ করে শেষ করেছিলাম। আমাদের মুজিব বাহিনীর অন্যতম জীবিত দুই প্রধান রাজনীতির রহস্যপুরুষ সিরাজুল আলম খান ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ কেন যে তাদের দেখা অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো ইতিহাসের উপাদান হিসেবে লেখেন না, এ নিয়ে আমার আক্ষেপ আছে।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফ্্ফর আহমদের বইটি যেমন পড়েছি, তেমনি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শেখ আবদুল আজিজের অগোছালো বইটি পাঠ করতেও ভুলিনি। কাজী জাফর আহমদের অসমাপ্তি বইটিও পাঠ করেছি। কবি নির্মলেন্দু গুণ থেকে কবি বেলাল চৌধুরীর স্মৃতিচারণামূলক জীবন ও সময়ের ঘটনাপ্রবাহ পড়েছি। বাদ দিইনি তসলিমা নাসরিনের ‘ক’ পড়তেও। কৈশোরে জেমস বন্ড, মাসুদ রানা, কুয়াশা, দস্যু বনহুর, দস্যু বাহরাম থেকে জেমস বন্ডের গোয়েন্দা সিরিজ পাঠ করা হয়েছিল। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কবিতা-উপন্যাসের প্রতি ঝোঁক ছিল বেশি। সুনীলের উপন্যাস রোমান্টিক হৃদয়কে যেমন স্পর্শ করেছে, তেমনি সমরেশের উপন্যাস রক্তে বহমান দ্রোহ ও বিপ্লবের চেতনাকে কখনো নাচিয়েছে, কখনো সম্মোহন করেছে।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান একজন ভদ্রলোক। প্রখর হিউমার সেন্সসম্পন্ন পড়াশোনা জানা আড্ডাবাজ সজ্জন মানুষ। তিনি একদিন সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের জীবনী নিয়ে লেখা সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর ঢাউস সাইজের বইটি পড়তে দিলেও পড়া হয়নি। চীনপন্থি ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা দুই সহোদর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুব উল্লাহ ও সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ দুজনই অত্যন্ত মেধাবী মানুষ হলেও চিন্তা-ভাবনা ও চেতনাজুড়ে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের ভক্তই নন, বিএনপির রাজনীতিরও ঘোর সমর্থক।

বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে এটিএন বাংলার একটি টকশোয় মাহফুজ উল্লাহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে পরিবার-পরিজনসহ মানবসভ্যতার ইতিহাসে যে নৃশংসতার মধ্য দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, সেটিকে সেই সময়ের অনিবার্য পরিণতি বলে যখন মন্তব্য করেছিলেন, তখন আমার বুকের ওপর তীব্র আঘাতই অনুভূত হয়নি, সুদর্শন মাহফুজ উল্লাহকে নিয়ে মনের মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ মনোভাব জন্ম নিয়েছিল। সেই টকশোয় অংশ নেওয়া জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু তার বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন।

সেনাশাসক জিয়াকে নিয়ে মাহফুজ উল্লাহর বইটি অনাদর-অবহেলায় কোথায় রেখেছি জানি না। কিছুদিন আগে তিনি কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী নিয়েও আরেকটি বই লিখেছেন। যার নাম ‘বেগম খালেদা জিয়া, হার লাইফ হার স্টোরি’। এ বইটিও আমার পাঠ করা হয়নি। তবে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান ইউটিউবের সুবাদে দেখা ও শোনার সুযোগ হয়েছে। বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আমার দুজন প্রিয় সহকর্মী বক্তৃতা করেছেন। যারা সৎ ও সাহসী মানুষ হিসেবে আমার কাছে অনেক প্রিয়। তারা হলেন- নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। যিনি বামপন্থি বা চীনপন্থি ছাত্র রাজনীতি থেকে সাংবাদিকতায় উঠে এসে তার নিজস্ব নীতির ওপর নিজেকে ধরে রেখেছেন। রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতিকে চিন্তাধারায়ই নয়, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে তিনি নির্মোহভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন এবং অকপটে বলেন, আরেকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক আসিফ নজরুল।

নূরুল কবীর আমাদের অগ্রজ হলেও পরেরজন আমার সমবয়সী। দুজনই আমার খুব পছন্দের মানুষ। আমরা যে ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময়ে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা নিয়ে ছাত্র রাজনীতি করেছি, নূরুল কবীরও সেই সময়ে ছাত্র রাজনীতিতে তার অবদান রেখেছেন। আসিফ নজরুল ছাত্র রাজনীতিতে কোন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। তবে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে মেধার স্বাক্ষর রাখেন এবং একজন পরিশ্রমী রিপোর্টার হিসেবে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় আলোচিত হন।

সেনাশাসক এরশাদের জমানায় ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনকে অস্ত্রের দাপটে দলীয় ক্যাডারের পদচারণে সন্ত্রাসকবলিত শিক্ষাঙ্গনে পরিণত করে। সেই সময়ে সেনাশাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা যেমন সাহসী ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্ত্রবাজ, দলীয় ক্যাডারদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিলেন। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আরও দু-একটি ছাত্র সংগঠনকেও অস্ত্রবাজ দলীয় ক্যাডার পুষতে হয়। সময়টা এমন ছিল যে, সেনাশাসনের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে গণতন্ত্রকামী মানুষ একদিকে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের দিকে তাকিয়ে ছিল, অন্যদিকে তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রবাজ ক্যাডারদের দাপটে অনেকে সন্ত্রস্ত হয়েছিল। ছাত্র সংগঠনগুলোর অস্ত্রবাজ ক্যাডারদের সংঘর্ষ ও গুলিতে সহপাঠীর লাশ যেমন পড়েছে, মায়ের বুক যেমন খালি হয়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য কলঙ্কিত হয়েছে। অস্ত্রের ওপর ভর করে সেই সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলই নয়, জাসদ ছাত্রলীগ, কোথাও ছাত্রমৈত্রী, কোথাও বা ছাত্রশিবির দখলদারিত্বের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল। ছাত্র রাজনীতির প্রতি জনমনে ভীতি ও অশ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছিল। যদিও অস্ত্রের দাপটে দখলদার সেসব ছাত্র সংগঠন এখন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে এতিম, কেউ বা অস্তিত্বহীন। কথিত আছে সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতির মেধাবী যেসব বিপথগামী সন্তান ছাত্রদলের হয়ে অবৈধ অস্ত্র তুলে নিয়ে রোমান্টিসিজমে আক্রান্ত হয়ে নিষিদ্ধ বেআইনি অন্ধকার পথ নিয়েছিলেন তাদের কারও কারও সঙ্গে ড. আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগত সখ্য এতটাই গভীরে ছিল যে, তাদের নিয়ে তিনি উপন্যাসও লিখেছেন।

ড. আসিফ নজরুলকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা আমার লেখার লক্ষ্য নয়। চিন্তা ও মননে তিনি কতটা বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী, তা বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রমাণ করেছেন। সেই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তার দেওয়া বক্তব্যের কিছু অংশ যেমন সত্য মনে হয়েছে তেমনি কিছু অংশ পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে বিবেচিতই হয়নি, মনে হয়েছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তের সিঁড়িপথে ক্ষমতার সিংহাসনে বসা সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের প্রতি ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতির দুর্বলতার অন্ধ প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে অর্ধসত্যও বলেননি, নির্মমতা ও নিষ্ঠুর সত্য এড়িয়ে গেছেন।

আমার পছন্দের মানুষ হিসেবে আসিফ নজরুলের বক্তব্য বিবেচনাপ্রসূত মনে হয়নি। নূরুল কবীরের বক্তব্য বা আলোচনা যতটা যুক্তিনির্ভর ও নির্মোহ মনে হয়েছে ততটাই আসিফ নজরুলের বক্তব্য একপেশে এবং বিএনপির রাজনীতি ও নিষ্ঠুর সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। হৃদয়ের জখমটা আমার এখানেই হয়েছে। নূরুল কবীরের বক্তব্যে মনে হয়েছে, নির্মোহ চিত্তে তিনি বইয়ের পক্ষপাতহীন আলোচনা ও নিজের দৃষ্টিভঙ্গি যেভাবে উন্মোচিত করেছেন, ঠিক তার উল্টোটি করেছেন ড. আসিফ নজরুল।

আমি সব সময় বিশ্বাস করতাম, কখনো লেখালেখির কারণে কিংবা স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য বিপদে পড়লে অমর একুশের গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী পাশে না দাঁড়ালেও যারা দাঁড়াবেন তাদের অন্যতম নূরুল কবীর ওড. আসিফ নজরুল। তার পরও আসিফ নজরুলের বক্তব্যের সমালোচনা করতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছে, নিজেকেই কষ্ট দিচ্ছি। কারণ একজন পছন্দের মানুষের সমালোচনা করা কঠিন।

আর আসিফ নজরুল ফরমায়েশি লেখক বা বক্তা না হয়েও একজন সামরিক শাসকের পক্ষে অন্ধের মতো সাফাই গেয়েছেন। একজন রাজনীতিবিদ রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য, একদিকে যেমন বিশাল অবদান রাখবেন, বর্ণাঢ্য জীবনের মেধা-দক্ষতা নেতৃত্ব দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়নে অনবদ্য ভূমিকা রাখবেন, তেমনি এও সত্য তিনি কখনো-সখনো ভুলও করবেন। জগদ্বিখ্যাত রাজনীতিবিদরাও কখনো-সখনো ভুল করেছেন। তাদের সঠিক নেতৃত্ব ও অবদান যেমন তাদের ইতিহাস অমরত্ব দেয়, তেমনি কিছু কিছু ভুলের জন্য তার নেতিবাচক প্রভাব মানুষের ওপর পড়ার কারণে সমালোচনাও হয়। ড. আসিফ নজরুল বেগম খালেদা জিয়ার জীবনীগ্রন্থ নিয়ে মাহফুজ উল্লাহ ও তার লেখা দুটি বইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি একাডেমিক আলোচনা করবেন না। কিছু অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ঘটে আমার মনে আছে, আমার বয়স মাত্র নয় বছর। আমাদের একটি লাল রেডিও ছিল। আমার বাবা একজন অর্ডিনারি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। উনি বঙ্গবন্ধুকে শেখ সাহেব বলতেন। আমি হঠাৎ করে দেখলাম, তিনি লাল রেডিও নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। খুবই অস্থির। আর বলছেন, শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে, শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে। আমি তখন বুঝি নাই এর মধ্যে অস্থিরতার কী আছে! তারপর যখন ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ড ঘটে আমার বাবাকে দেখলাম অঝরে কাঁদছেন। তখন আমি বুঝতে পারি, কেন কাঁদছেন এবং আমি নিজেও কাঁদছি। আমার তখন মনে পড়ছে এক বছর আগে বিভিন্ন বোর্ড থেকে যারা স্ট্যান্ড করেছে তাদের সঙ্গে আমাকেও বঙ্গভবনে নিয়ে গেছেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

সাংবাদিকতা জীবনে ঢোকার পর যাদের সাহচর্যে এসেছি, বিশেষ করে বিচিত্রাকেন্দ্রিক পরিবার, তাদের কাছে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কয়েকটি কথাই শুনতাম। একটা হচ্ছে, তার অসম্ভব সততা। শাহদাৎ ভাই বলতেন, উনি (জিয়া) উনার ভাইদের বলেছেন তাদের কেউ যেন বঙ্গভবনে না আসেন। আপনারা কি লক্ষ্য করেছেন? বাংলাদেশে এমন কোনো লিডার নাই যাদের ভাই-বোনের নাম আমরা জানি না? এবং বলত উনার যে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল, যেটা প্রথম উনার নিজের নামে এবং সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামে দিয়েছিলেন, সেটা কীভাবে উজ্জীবিত করেছিল। এরকম একজন মানুষ যখন মারা যায়, তখন সারা দেশের মানুষ শোকে আচ্ছন্ন ছিল। বাংলাদেশের আর কারও জানাজায় এত মানুষ হয়নি, যেটা উনার জানাজায় হয়েছিল।’ আসিফ নজরুল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়া সহানুভূতি নিয়ে রাজনীতিতে এলেও পরবর্তীতে আনপ্যারালালভাবে গণতন্ত্রের নেত্রী হিসেবে নিজের ইমেজ তৈরি করার কথা বলেছেন। এমনকি ক্ষমতায় এসে জাতিসংঘে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে অভিশাপ সেটি তুলে ধরে বক্তব্যদানের জন্য প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে আপসহীন নেত্রী হলেও জনগণের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও এই রাষ্ট্রের জন্মের প্রশ্নে যে মহান নেতার অবদানকে ইতিহাস সোনার হরফে লিখে অমরত্ব দিয়েছে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হিমালয়সম উচ্চতার এই নেতা জীবন-যৌবন জেলে কাটিয়ে, ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে আপস না করে দীর্ঘ সংগ্রামের ভিতর দিয়ে এ জাতিকে স্বাধিকার-স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে এক মোহনায় মিলিত করে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। সেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারও তুলনা করছি না। কিন্তু ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে তা একজন ব্যক্তি ও একটি দলের প্রতি কতটা আনুগত্যপ্রবণ সেটি বোঝা যায় তখনই, যখন তিনি জিয়াউর রহমানকে একজন মার্শাল ল ডিক্টেটর বলেন না। আসিফ নজরুলের কাছে প্রশ্ন থেকে যায়। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান কি রাজনীতিবিদ ছিলেন? তিনি কি রাজনীতি করে জনগণকে নিয়ে গণতান্ত্রিক পথে গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে যাকে অসম্ভব সৎ বলছেন, তিনি কতটা নৈতিকতার বিচারে অসৎভাবে অস্ত্রের জোরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তিনি যে ক্ষমতায় বসেছিলেন, সেই সত্যটি কেন বললেন না? সেনাশাসক জিয়াউর রহমান একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহায়তাকারী দক্ষিণপন্থি মুসলিম লীগ, চীনপন্থি ও অতি-বামদের নিয়ে দল গঠন করে নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি জামায়াত-শিবিরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেছিলেন, সেই সত্যটি কেন উচ্চারণ করেননি? আসিফ নজরুলের ভাষায় অসম্ভব সৎ সেনাশাসক জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সময় সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ভাষ্যমতে, তিনি পট-পরিবর্তনের ও মুজিব সরকারের উৎখাত সম্পর্কে অবহিত হয়েও যে নীরব ছিলেন তা একজন উপ-সেনাপতির জন্য কতটা সততার? বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর অবৈধ মোশতাক শাসন থেকে ক্যু-পাল্টা ক্যুর ভিতর দিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেও যদি সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নিয়ে থাকেন তাহলে তিনি কি একটি গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে স্বপদে ফিরে গিয়েছিলেন? যদি উত্তর ‘না’ হয়ে থাকে তাহলে তিনি একজন উচ্চাভিলাষী, ক্ষমতালোভী সেনাশাসক নন? মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীরউত্তম’ খেতাব পেয়েছেন। সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু তাকে ডেপুটি প্রধান করেছেন। তবু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকান্ডের প্রতিরোধে কি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? সেনাবাহিনীতে তিনি যদি জনপ্রিয় ও প্রভাবশালীই হোন তাহলে কাপুরুষ, অথর্ব জেনারেল শফিউল্লাহ যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেখানে তিনি কেন সফল হলেন না? কেন ঘাতকদের বিচারের আওতায় আনতে ক্ষমতায় এসেও ভূমিকা না রেখে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন? যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে নিহত মুজিবের লাশ সেনা প্রহরায় রেখে অবৈধ খুনি সরকার কারফিউ জারি করে নিহতদের জানাজা পড়তে দেয়নি, রাষ্ট্রীয় অস্ত্রবাজ খুনিদের পাহারায় জনকের লাশ হেলিকপ্টারে নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় তড়িঘড়ি করে দাফন করা হলো তখন কোথায় ছিল জিয়ার সাহস ও সততা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের খবরে আসিফ নজরুলের পিতা যখন অস্থির হয়ে ছুটছেন তখন ভেবেছেন এতে অস্থির হওয়ার কী আছে? আর জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের পর তার পিতা যখন অঝরে কেঁদেছেন, তখন তিনি নিজেও অঝরে কেঁদেছেন। এর শানে নজুল বুঝতে পারিনি। অসম্ভব সৎ ও পরিশ্রমী হিসেবে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেও জেনারেল মঞ্জুরদের আপত্তি সত্ত্বেও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহের বীরউত্তমকে সেনাশাসক জিয়াউর রহমান যখন প্রহসনের বিচারে ফাঁসিতে ঝোলালেন তখন আসিফ নজরুলের মনটা একবারও ডুকরে কেঁদে ওঠেনি? বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সব স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে নির্বাসিত জীবন থেকে শেখ হাসিনা যখন এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরলেন তখন তাকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে প্রবেশ করতে না দেওয়া সততা না নিষ্ঠুর শাসকের দম্ভের প্রতিহিংসার প্রতিফলন? কেন সেদিন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী জেলে ছিলেন জিয়ার শাসনে? মুক্তিযুদ্ধ, তার চেতনা ও ইতিহাস নির্বাসনেই পাঠানো হয়নি, সে সময় বঙ্গবন্ধুর নাম জাতীয় প্রচারমাধ্যমে নিষিদ্ধ করে রাখা কত বড় স্বৈরশাসক হলে সম্ভব! এটা কি আসিফ নজরুল একবারও চিন্তা করেননি? সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের ’৭৫-এর ‘হ্যাঁ’, ‘না’ গণভোট, ’৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ’৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন কি সততার নজির ছিল? এ ধরনের নির্বাচন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় কোন ডিকশনারিতে বৈধতা পায়? একজন ব্যক্তি সেনা কর্মকর্তা থেকে সেনাপ্রধান, মার্শল ল ডিক্টেটর থেকে প্রহসনের ভোটে বন্দুকের ক্ষমতায় দল গঠন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে সততা ও পরিশ্রমের কারণে সব অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ডকে কি বৈধতা দিতে পারেন? তিনি রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসেননি। রাজনীতি করেও আসেননি। তাই তার ভাইবোনদের চেনার কথা নয়।

বঙ্গবন্ধুসহ সব জাতীয় নেতা পাকিস্তানি শাসক-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যখন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, আন্দোলনের মিছিলে, সংগ্রামে তাদের স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়স্বজন শামিল হয়েছেন। তাই তাদের নাম স্বাধীনতার আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষ চেনে। এটা শুধু আওয়ামী লীগ পরিবারই নয়, বামপন্থি রাজনৈতিক পরিবারেরও চিত্রপট।

বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় জনআকাক্সক্ষার কারণে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, নাকি কারাবন্দী সেনাশাসক এরশাদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করতে শেখ হাসিনার সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে একাত্ম হয়েছিলেন, সেটি ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রশ্ন। যিনি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পাগল ও শিশুর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, তিনি দেশের স্বার্থে নত হয়েছিলেন, নাকি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন?

নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলন মানুষ যেমন ভোলেনি, শেখ হাসিনার জনতার মঞ্চ ঘিরে গণআন্দোলনের জনজোয়ার আমাদের চোখের সামনে থেকে সরে যায়নি। বেগম খালেদা জিয়া আপসহীন হলেও ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে কোন বিদেশি শক্তির সঙ্গে আপস করেছিলেন, তা সাধারণ মানুষ না জানুক ড. আসিফ নজরুল কি জানেন না? সেনাশাসক এরশাদের জাতীয় পার্টি ও যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে নিয়ে আপস করে চারদলীয় জোটের ঐক্যের কাবিননামায় সই করেননি? ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের হাত এখানে প্রসারিত হতে দেননি? হাওয়া ভবনকে ঘিরে প্যারালাল সরকারকে প্রশ্রয় দেননি? জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে দেননি? কাদের পৃষ্ঠপোষকতায় একুশের গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান এসেছিল। আসিফ নজরুলরা কি জানেন না? খালেদা জিয়া কি যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিসভায় নিয়ে লাখো শহীদের রক্তে ভেজা পতাকা তাদের গাড়িতে তুলে দেননি? বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের কারও নির্যাতন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও বিনা বিচারে মানুষ হত্যার দুয়ার খুলে দেননি?

সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের ভাইবোনদের নাম মানুষ না জানলেও বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র, পুত্রের বন্ধুবান্ধব, কর্মচারী এমনকি নিজের ভাইবোন, আত্মীয়-পরিজনের নাম কি মানুষ ভুলে গেছে? আসিফ নজরুলের মতো স্পষ্টভাষী একজন মানুষ একজন একপেশে মানুষের একপেশে লেখা বই নিয়ে আলোচনা করবেন, ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করবেন, তখন আংশিক সত্য বলবেন আর গোটা সত্য লুকিয়ে রাখবেন, তা কি গ্রহণযোগ্য? আসিফ নজরুল একজন গণতন্ত্রমনা বা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র দেখতে চাইবেন অথচ মার্শাল ল ডিক্টেটর জিয়াউর রহমানের নিষ্ঠুরতা ও ভ্রান্তনীতি তুলে আনবেন না? বেগম খালেদা জিয়ার সাফল্যের জয়গান গাইবেন, তার শাসনামলের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করবেন না, এটা কেমন কথা? কারও জীবনী ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার আলো-অন্ধকার দুই নয়ন দিয়ে দেখে বিচার-বিশ্লেষণ করে উন্মোচন না করলে কার্যত তা দলদাস বুদ্ধিজীবীর বক্তৃতায় পরিণত হয়। আর আসিফ নজরুল যদি সত্যিকার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হোন তাহলে তিনি কীভাবে অবৈধ সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের নিষ্ঠুর স্বৈরশাসনের দিকটি বললেন না? নূরুল কবীর যেখানে মাঝখানে দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন, আসিফ নজরুল সেখানে জিয়া ও খালেদার দিকে অন্ধের মতো ঝুঁকেছেন!

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow