Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:২৩

বায়তুল মোকাররমের খুতবা

ইসলামে মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মুফতি এহসানুল হক জিলানীপেশ ইমাম

ইসলামে মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বান্দার জন্য যত নিয়ামত দিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো তাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষা মানুষের জন্য আল্লাহর অপার দান। মাতৃভাষাতেই মানুষ নিজের চিন্তা, চেতনা ও মনের ভাব সর্বোত্তম উপায়ে প্রকাশ করতে পারে। ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম মায়ের প্রতি যেমন অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি মাতৃভাষার প্রতিও অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে। মাতৃভাষায় ভাব প্রকাশের ক্ষমতা মানুষের সহজাত ক্ষমতা। আর এ ক্ষমতাই মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে পৃথক ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। আল্লাহ-তায়ালা ঘোষণা করেন,

‘দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিক্ষা দিয়েছেন “বয়ান” বা ভাব প্রকাশের ক্ষমতা তথা প্রত্যেকের মাতৃভাষা।’ সূরা আর রাহমান, আয়াত ১-৪।

এই পৃথিবীর বৈচিত্র্য আল্লাহর অসীম কুদরতের অনুপম নিদর্শন। পৃথিবীর মানুষ, প্রকৃতি ও অন্যসব সৃষ্টির বৈচিত্র্যের মতো মানুষের ভাষাগত বৈচিত্র্যও আল্লাহর কুদরতের অন্যতম নিদর্শন। আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশম-লী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণে বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।’ সূরা রুম, আয়াত ২২।

উপরোক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায়, আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাও আল্লাহর কুদরতের একটি অনুপম নিদর্শন। তাই আমাদের উচিত একে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা এবং এর প্রতি সম্মান ও মর্যাদার আচরণ করা। যুগে যুগে আমাদের পূর্বসূরিরা তা-ই করেছেন। ইতিহাস সাক্ষী, মুসলমানরাই বাংলা ভাষাকে স্বমহিমায় সমুন্নত করেছে। আর এটা তো অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে, মুসলিম মননে মাতৃভাষাপ্রীতি সঞ্চারিত হয়েছে ইসলামের মাতৃভাষার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপের কারণে। সুতরাং মাতৃভাষার স্বকীয়তা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য। মানুষ আল্লাহর অত্যন্ত মুহব্বতের সৃষ্টি। তাই আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে মানুষের মতো তাদের মাতৃভাষাও অত্যন্ত প্রিয়। আর সে কারণেই আল্লাহ যুগে যুগে মানুষকে হেদায়াতের পথে পরিচালিত করার জন্য যত নবী-রসুল প্রেরণ করেছেন, তাদের প্রত্যেককে তাদের স্বজাতির ভাষায় তথা মাতৃভাষাতেই পাঠিয়েছেন, যাতে তারা মানুষকে তাদের মাতৃভাষায় আল্লাহর পথে ডাকতে পারেন, সহজে তাদের দীনের কথা বোঝাতে পারেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রসুলকে তাদের স্বজাতির ভাষা তথা তাদের মাতৃভাষাতেই প্রেরণ করেছি, যাতে তারা তাদের বোঝাতে পারে।’ সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৪।

আসমানি প্রসিদ্ধ চারটি কিতাব চার ভাষায় এবং প্রতিটি কিতাব প্রত্যেক নবী ও তাঁর উম্মতের মাতৃভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। দাউদ (আ.)-এর প্রতি জবুর অবতীর্ণ হয়েছে ইউনানি ভাষায়, যা তাঁর মাতৃভাষা ছিল। মূসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত অবতীর্ণ হয়েছে হিব্রু ভাষায়, যা ছিল ইহুদিদের মাতৃভাষা। ঈসা (আ.)-এর প্রতি অবতীর্ণ ইনজিলের ভাষা ছিল সুরয়ানি (গ্রিক), যা খ্রিস্টানদের মাতৃভাষা ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন তাঁর মাতৃভাষায় তথা আরবি ভাষায়। আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোরআনকে আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ সূরা ইউসূফ, আয়াত ২। তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোরআনকে আপনার ভাষায় (আরবি) সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর দ্বারা মুত্তাকিদের সুসংবাদ প্রদান এবং কলহকারী সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারেন।’ সূরা মারিয়াম, আয়াত ৯৭। ‘এমনিভাবে আমি আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল করেছি এবং এতে নানাভাবে সতর্ক বাণী ব্যক্ত করেছি; যাতে তারা আল্লাহভীরু হয়। অথবা তাদের অন্তরে চিন্তার খোরাক জোগায়।’ সূরা তোয়াহা, আয়াত ১১৩। মাতৃভাষা শিক্ষা ও এর বিশুদ্ধ চর্চার প্রতি ইসলাম সব সময়ই উৎসাহিত করেছে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাতৃভাষা ছিল আরবি। আর তিনি ছিলেন তাঁর মাতৃভাষা তথা আরবিতে সবচেয়ে সুন্দর বিশুদ্ধভাষী। ভাষা ও সাহিত্যে সর্বাধিক নৈপুণ্যের অধিকারী। তাঁর মুখনিঃসৃত কথা ছিল সাহিত্যের মানদণ্ডে অত্যন্ত উঁচু মাপের। তাঁর বক্তৃতা ও বাচনভঙ্গি ছিল অতুলনীয়। তার রেখে যাওয়া হাদিসের ভার আরবি সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্থান দখল করে আছে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৈশবেই বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা করেছিলেন এবং বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতেন, যা শুনে লোকজন আশ্চর্য হয়ে যেত। মাতৃভাষার চর্চা এবং তাতে দক্ষতা অর্জন করা নবীদের সুন্নত। মাতৃভাষায় বিশুদ্ধতার চর্চা স্বয়ং রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা। এক সাহাবি তাঁর দরবারে হাজির হয়ে বাইরে থেকে অনুমতি প্রার্থনা করেন এভাবেÑ ‘আ-আলিজু?’ তিনি খাদেমকে বললেন, একে অনুমতি প্রার্থনার তরিকা শিক্ষা দাও। একে বল, ‘আসসালামু আলাইকুম, আ-আদখুলু?’ এ শিক্ষা পেয়ে সাহাবি বিশুদ্ধ ভাষায় অনুমতি প্রার্থনা করলে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দিলেন। আবু দাউদ। উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। তাই ইসলামের প্রচার-প্রসার, ওয়াজ-নসিহত, কথা-বক্তৃতা লেখনীর ক্ষেত্রেও মাতৃভাষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।


আপনার মন্তব্য