Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ২৭ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৬ জুন, ২০১৬ ২৩:০৯
জেএসসি পরীক্ষার পড়াশোনা
শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
জেএসসি পরীক্ষার পড়াশোনা

সুধীর বরণ মাঝি, সাবেক শিক্ষক

ড. মালিকা কলেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চতুর্থ অধ্যায়

যবানিকা : উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি আগামী প্রজন্মের জাবতীয় সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে বর্তমান প্রজন্মের সুস্থ প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর। তাই এই বিষয়ে সবার সজাগ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

৪।         প্রজনন স্বাস্থ্য কাকে বলে? অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের প্রতিরোধ সম্পর্কে আলোচনা কর। অথবা অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ রোধে প্রয়োজন সচেতনতা ও আইনের সঠিক বাস্তবায়ন। মতামত দাও।

            ভূমিকা : জন্ম থেকে মানুষের জীবনের বৃদ্ধি ও বিকাশ এক অবিচ্ছিন্ন ধারায় এগিয়ে চলে। এই এগিয়ে চলার ধারা অব্যাহত রাখার জন্য স্বাস্থ্য বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে হয়।      

            প্রজনন স্বাস্থ্য : বিখ্যাত শিক্ষাবিদ আরনেস্ট জোনস বলেন, ‘বিকাশমান জীবনের শুরু থেকে অর্থাৎ জন্ম থেকে প্রৌঢ়ত্ব- প্রতিটি স্তরেই তার সাধারণ স্বাস্থ্যের সঙ্গে প্রজনন স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি জড়িত। ’ শরীরের যেসব অঙ্গ সন্তান জন্মদানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, সেসব অঙ্গের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়কে প্রজনন স্বাস্থ্য বলে।                                         

            অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের প্রতিরোধ : দেশের প্রচলিত আইনে বিয়ের বয়স হওয়ার আগে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিলে তা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ রোধে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ও সচেতনতামূলক নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন :                                   

            ১। বাল্যবিবাহ বন্ধ করা :  অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের প্রতিরোধ করার জন্য অপরিণত বয়সে বিয়ে অর্থাৎ বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে  আইনের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে  হবে এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকজনকে এগিয়ে আসতে হবে।

            ২। কর্মসংস্থান সৃষ্টি : প্রবাদ আছে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। তাই নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের প্রতিরোধ করা যায়।                                            

            ৩। সচেতনতা বৃদ্ধি : অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের কুফল সম্পর্কে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, নাটক, গান প্রভৃতির মাধ্যমে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে সভা, সেমিনার, ওয়ার্কসপ প্রভৃতির মাধ্যমে। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণকে নিরুৎসাহিত করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।

৫।        প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার উপায় ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর।                                                                                             

            আথবা নিরাপদ ও উন্নত জীবনের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্যের সুরক্ষা জরুরি- ব্যাখ্যা কর।  

            ভূমিকা : প্রজনন স্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি অংশ। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপদ জন্ম ও সুস্বাস্থ্য এবং বর্তমান প্রজন্মের সার্বিক সুস্বাস্থ্য প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর  করে।                               

            প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার উপায় : প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার প্রথম কথা হলো বয়ঃসন্ধি যেসব শারীরিক পরিবর্তন, সেসব বিষয়ে একটি কিশোর-কিশোরীর করণীয় কী তা ভালোভাবে জেনে নিতে হবে এবং সে অনুযায়ী চলতে হবে।   পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এ সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঋতুস্রাব বা বীর্যপাত ঘটলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থাকা, নিয়মিত গোসল করা দরকার। এ সময় পুষ্টিকর খাবার ও প্রচুর পানি পান করতে হবে। কোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

            প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা : আমাদের দেশে প্রতিবছর সন্তান জন্মদান করতে গিয়ে অনেক মা মৃত্যুবরণ করেন। এর কারণ অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে ও সন্তান ধারণ। ফলে বিভিন্ন প্রকার রোগে আক্রান্ত হয় এবং স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। এতে পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয় এবং পরিবারে অশান্তি নেমে আসে। মেয়েরা পরিণত বয়সে অর্থাৎ ২০ বছরের পর গর্ভধারণ করলে প্রসূতি মায়ের ও শিশুমৃত্যুর হার কমবে। আবার ঘনঘন সন্তান নিলে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য সন্তান জন্মদানের মধ্যে বিরতি দিতে হবে। এর ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যের সুস্থতা ও বজায় থাকবে এবং শিশুরা স্বাস্থ্যবান ও নীরোগ হবে এবং পরিবারে ও সমাজে শান্তি বিরাজ করবে। আসবে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা।

            যবানিকা : উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি আগামী প্রজন্মের যাবতীয় সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে বর্তমান প্রজন্মের সুস্থ প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর। তাই এই বিষয়ে সবার সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

৬।        বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীরা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন, হয়- বর্ণনা কর।

            বয়ঃসন্ধির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Puber:y। এটা ল্যাটিন শব্দ Puber:es থেকে উত্পত্তি হয়েছে। Puber:y এর মূল অর্থ হলো বয়ঃপ্রাপ্তি। জীবনচক্রের যে পর্যায়ে ছেলে-মেয়েরা যৌনক্ষমতা অর্জন করে সেই পর্যায় বা কালকে বয়ঃসন্ধি বলে। বয়ঃসন্ধিকাল একটি নেতিবাচক পর্যায়। এ সময়ে ছেলে-মেয়েরা জীবন সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। এই ধরনের নেতিবাচক মনোভাব ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা দেয়।

            বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের দেহের দ্রুত বৃদ্ধি ও পরিবর্তনজনিত কারণে তারা ক্লান্তি ও অস্থিরতা বোধ করে। ফলে হজমের গণ্ডগোল দেখা দেয় এবং খাদ্য গ্রহণের প্রতি ইচ্ছা হ্রাস পায়। গ্রন্থি ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকৃতি ও অবস্থানের পরিবর্তন দেখে ছেলে-মেয়েরা ভয় পেয়ে যায়। বয়ঃসন্ধিকালে দৈহিক পরিবর্তন তাদের মানসিক অবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।            

এ সময় কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব, একাকিত্বের ইচ্ছা, আবেগের আধিক্য, অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ, একঘেয়েমি ভাব, অতি লজ্জা ভাব ইত্যাদি দেখা দেয়।

বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশারীদের যে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়, তা মেনে নিতে হবে এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ দেখাতে পারলে তাদের যে মানসিক ও শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হয়, তা লাঘব করতে পারবে। বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে-মেয়েদের অসুবিধাগুলোর প্রতি সমবেদনা দেখানো উচিত। ছেলে-মেয়েদের বিরূপ ধারণাগুলোর সংশোধন করা না গেলে তা স্থায়ী হয় এবং পরবর্তীতে এই ছেলে-মেয়েরা হীনমন্যতায় ভোগে। যা অনেক অপরাধের জন্ম দেয়।

৭। মা-বাবার সহযোগিতাই পারে সন্তানের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা সমাধান করতে- মতামত দাও।

জীবনচক্রের যে পর্যায়ে ছেলে-মেয়েরা যৌনক্ষমতা অর্জন করে সেই পর্যায় বা কালকে বয়ঃসন্ধি বলে।

বয়ঃসন্ধিকাল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বয়ঃসন্ধিকালে যে দৈহিক পরিবর্তন সংঘটিত হয় তা ছেলে-মেয়েদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। সন্তানের মধ্যে সহনশীলতার অভাব দেখা দেয়। এ সময় পিতা-মাতাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে পাশে থাকতে হয়। বয়ঃসন্ধির পরিবর্তনকে গ্রহণ করার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বাবা-মায়ের থাকতে হবে। শৈশবের শেষ পর্যায়ের পরবর্তী সময়ে বয়ঃসন্ধির পরিবর্তন ছেলে-মেয়েদের অনেকটা অবাক করে দেয়। এ জন্য অনেকে লজ্জাবোধ করে বা ভয় পায়। এরূপ পরিবর্তনের মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়। এ বয়সের দৈহিক পরিবর্তন সম্পর্কে বোঝার সামান্য ক্ষমতাও ছেলে-মেয়েদের থাকে না। বয়ঃসন্ধিকালে দৈহিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে ছেলে-মেয়েদের কি করণীয় মা-বাবার কি দায়িত্ব ও কর্তব্য হতে পারে, তা জানা থাকা প্রয়োজন। বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানদের যে সব সমস্যা দেখা দেয় তা সমাধানের জন্য মা-বাবাকেই এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং সন্তানদের সাহস জোগাতে হবে এবং আচার-আচরণে বোঝাতে হবে এই সময়ে শারীরিক এসব পরিবর্তন ক্ষতিকর নয়। এসব পরিবর্তন স্বাভাবিক এবং তা প্রত্যেকের জীবনেই কাম্য। কোনো মানুষই এসব পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে নয়। পিতামাতাই  সন্তানের সর্বোত্তম বন্ধু। বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন নিয়ে এক ধরনের জড়তা কাজ করে যা অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দেয়। সন্তানের মঙ্গলের জন্য সব জড়তার ঊর্ধ্বে ওঠে এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করাই শ্রেয়। মা-বাবার সহযোগিতাই সন্তানের বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যা সমাধান দিতে সক্ষম এবং প্রধান নিয়ামক।   

এই পাতার আরো খবর
up-arrow