Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২০ জুলাই, ২০১৮ ২১:২৭ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ২০ জুলাই, ২০১৮ ২১:৩০
রাসিক নির্বাচন
সংশয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত বুলবুলের
ছুটির দিনে জমজমাট প্রচারে প্রার্থীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী:
সংশয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত বুলবুলের

ভর বর্ষায় ভোট। তাই বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে প্রার্থীরা তাদের পোস্টার লেমিনেটেড করেছিলেন। তবে বৃষ্টি তো নেই, উল্টো সূর্য দহনে পুড়ছে রাজশাহী। ঘাম ঝরা তীব্র গরম আর প্রখর সূর্য দহন উপেক্ষা করেই রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে জোর প্রচারে নেমেছেন প্রার্থীরা। শুক্রবার ছুটির দিনে সকাল থেকেই জমজমাট প্রচারে নামেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। ভোটের দিন দ্রুত ঘনিয়ে আসছে তাই দম ফেলার সময় নেই কারও। জয়ের লক্ষ্যে ভোটারদের ঘর পর্যন্ত ছুটে যাচ্ছেন সবাই। 

সকালে নগরীর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। এসময় বুলবুল অভিযোগ করেন, তার প্রচার প্রচারণায় আওয়ামী লীগ বাধা প্রদান করছে। গণসংযোগের সময় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রচার মাইক দুপুর থেকে সারাক্ষণ বিরক্ত করছে। তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ফলাফল মেনে নেওয়া জন্য আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও সরকারকে পরামর্শও দেন।

নির্বাচন নিয়ে কোন প্রকার তালবাহানা সহ্য করা হবে না-এমন হুশিয়ারি দিয়ে বুলবুল বলেন, যেখানেই বাধা সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। বেগম জিয়ার মুক্তি, গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধার ও দেশের মানুষকে খোলা কারাগার থেকে রক্ষা করতে ধানের শীষে ভোট প্রদান করার আহ্বান জানান তিনি। 

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, নৌকার পক্ষে গণজোয়ার উঠেছে। রাজশাহীর সব মানুষ বুঝতে পেরেছে রাজশাহীর উন্নয়নে নৌকার বিকল্প নেই। তাই বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ও সাধারণ ভোটাররা এবার নৌকায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তা দেখে মাথা নষ্ট হয়ে গেছে বুলবুলের। কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে এসে ভোটের মাঠ উত্তপ্ত করতে চাইছে। নিজেদের প্রচারসভায় নিজেরাই বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে। রাজশাহীর মানুষ এখন লিটনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হলেও বুলবুল নিজের নেতাদের দ্বন্দ্বেই বেসামাল হয়ে উগ্র বক্তব্য দিচ্ছেন। 

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত বুলবুলের: 
এদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোন আলামত দেখছেন না উল্লেখ্য করে শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকবেন কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তবে বুলবুলের এই বক্তব্যকে আবেগ ও ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ বলে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেছেন, একটি সুষ্ঠু ও নিরোপেক্ষ নির্বাচন চান তিনি।

শুক্রবার দুপুরে রাজশাহী চেম্বর ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তারা বক্তব্য রাখেন।  ‘কেমন নির্বাচন চাই’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে চারজন মেয়র প্রার্থীসহ রাজশাহীর সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। 

সেখানে বুলবুল অভিযোগ করেন, ‘রাজশাহীতে এখন পর্যন্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোন আলমত নেই। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন কি না তার পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, ‘একজন মেয়র প্রার্থী নগরীর সব জায়গা দখল করে পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানার টানিয়ে দিয়েছে। অন্য কোন প্রার্থী এগুলো টানানোর কোন জায়গা রাখেনি। তারপরও ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আমাদের কোন অভিযোগ আমলেও নেওয়া হচ্ছে না।

কর্মীদের গ্রেফতার ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে বুলবুল বলেন, ‘আমার ১৪০০ পোলিং এজেন্টকে নিজ বাড়ি থেকে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এজেন্টরা যদি ভোট কেন্দ্রে যেতে না পারে তা হলে নির্বাচন করে আমাদের কোন লাভ নেই। ফলে ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত থাকবো কি-না সেটি নিয়ে এখন সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।’ 

একই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল আবেগ ও ক্ষোভ থেকে অনেক কিছু বলছেন। কখনও বলছেন, এ নির্বাচন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের নির্বাচন, কখনও বলছেন, সরকারের চেহারা উন্মোচনের নির্বাচন। আবার এটাও বলছেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না।’ বিএনপির আমলের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও মাগুরার নির্বাচন স্মরণ করিয়ে লিটন বলেন, এখন সে রকম নির্বাচন হয় না। খুলনা ও গাজীপুর নির্বাচন বিএনপি দেখেছে। সেখানে অনিয়ম হয়েছে এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তারা দিতে পারেনি। সে দুইটিতে অনিয়ম হলে তারা এ সিটি নির্বাচনে অংশ নিতেন না। লিটন বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হোক বা কোন অনিয়ম হোক; এমন কোন কাজ আমরা করতে দেব না।

ছুটির দিনে প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন লিটন : 
এদিকে শুক্রবার ছুটির দিনের সকাল থেকে ভোটের মাঠে ছিলেন এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। সকাল তিনি বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন। পরে একটি গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত হন। এরপর নগরীর হযরত শাহ মখদুম (র.) জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। তারসঙ্গে খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক ছাড়াও কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা ছিলেন। পরে তিনি মুসল্লিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং নৌকায় ভোট কামনা করেন। বিকেলে লিটন নগরীর ভদ্রা এলাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। 

সংসদীয় আসন পাওয়ার শর্তে বুলবুলকে সমর্থন দেওয়ার ঈঙ্গিত জামায়াতের : 
রাসিক নির্বাচনকে ঘিরে ভোটের মাঠে পক্ষে থাকতে বিএনপিকে শর্ত দিয়েছে জামায়াত। শুরু থেকেই চুপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত শেষ পর্যন্ত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে তাদের প্রার্থীতা দাবি করেছে বিএনপির কাছে। এনিয়ে নতুন মেরুকরণ দেখা দিয়েছে বিএনপিতে। ওই আসনে আগে থেকেই ঠিক করে রাখা বিএনপির মহানগর সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন জামায়াতের এ শর্তে নাখোস হয়েছেন। এ নিয়ে বিএনপি শিবিরে নতুন করে দ্বন্দ্বের আভাস পাওয়া গেছে।  

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকেই সমর্থন দেবে জামায়াত। আপাতত মাঠে প্রচারণায় না থাকলেও শিগগিরই তারা মাঠে নামবে। জোটের শরীক জামায়াতকে নিয়ে যে শঙ্কা শিগগিরই তা কেটে যাবে বলে দাবি বিএনপির। তবে এ শর্তে জামায়াতের সমর্থন পেলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপির একটি বড় অংশ বুলবুল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। জামায়াতের দাবি করা আসনে প্রার্থীতা ঠিক হয়ে থাকা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনের সমর্থন শেষ পর্যন্ত হারাতে হতে পারে বুলবুলকে। এনিয়ে এখন বিএনপিতে ঝড় বইছে বলেও জানা গেছে। 

এ কারণে বিএনপি কিছুটা অস্বস্তিতে আছে জোট সঙ্গি জামায়াতকে নিয়ে। বুলবুলকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী বলা হলেও এখন পর্যন্ত প্রচারণায় অংশ নেয়নি জামায়াত। উল্টো জামায়াতের নেতা আশরাফুল আলম ইমন বিএনপির মেয়রপ্রার্থী বুলবুলকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। জামায়াতের এই নেতা তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, রাজশাহী বিএনপির ঘাটি হওয়া সত্বেও জামায়াতের সঙ্গ বিহীন বুলবুল বিজয়ী হওয়া তো দুরের কথা ঠিক মত প্রতিদ্বন্দ্বিাতায় আসতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। 

জামায়াত নেতা ইমনের এই মন্তব্যের পরই জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় বিরোধটি প্রকাশ্য চলে আসে। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান, লক্ষ্য ও চেতনায় বিএনপি-জামায়াত এক আছে। শিগগিরই সব ঠিক হয়ে যাবে।  

স্থানীয় নেতাদের দাবি, কাউন্সিলর পদে ছাড় পেতে জামায়াত এখনও প্রচারণায় নামছে না। তারা ১৪ টি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়েছে, সেগুলোতে ছাড় দেওয়া হলে জামায়াত বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামবে। তবে ছাড় না দিলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াত বুলবুলকেই সমর্থন দেবে বলে মনে করেন নগর বিএনপির শীর্ষ এক নেতা। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের শর্তও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামায়াত বিএনপিকে সিটিতে ছাড় দেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৩ আসন দাবি করেছে। এ নিয়ে এখন দেনদরবার চলছে বলেও জানায় ওই সূত্রটি।


বিডি প্রতিদিন/২০ জুলাই ২০১৮/হিমেল

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow