Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২২ জুলাই, ২০১৬ ২২:২৫
নায়িকা আছে নায়িকা নেই
আলাউদ্দীন মাজিদ
নায়িকা আছে নায়িকা নেই

চলচ্চিত্রে নায়িকা আছে। পুরনোরা আছেন আবার নতুন মুখরাও কাজ করছেন।

তারপরেও চলচ্চিত্রে নায়িকা নেই। বিষয়টি ভাবতে গেলে চরম হতাশায় ডুবতে হয় নির্মাতাদের। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কিভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন তাই নিয়ে ভাবনার অন্ত থাকে না। শিল্পী ছাড়া কী ছবি নির্মাণ সম্ভব? মোটেও না। তাও আবার নায়িকা। ছবিতে নায়িকা হলো প্রধান উপাত্ত। গ্ল্যামারের অনুষঙ্গ। বিনোদনের পূর্ণ মাত্রা। নায়িকা ছাড়া ছবি নির্মাণ অকল্পনীয়।

কেন আমাদের ছবিতে নায়িকা সংকট। এর কারণ অনেক। অশ্লীলতার সময়টাই মূলত এর জন্য দায়ী। এসময় ভালো ঘরের অনেক মেয়ে মান বাঁচাতে নায়িকার স্বপ্ন ছেড়ে ঘরমুখী হন। তারা তো আর ফিরেননি বরং অভিজাত ঘরের কোনো মেয়ে ভুলেও আর এই অঙ্গনে পা রাখার চিন্তা করেনি। এই দুর্ভোগের জের টানতে হচ্ছে এখন ঢালিউডকে। অনেক কারণের মধ্যে আরেকটি হচ্ছে- পুরনোরা আগের মতো নিয়মিত নন আর নতুনরা দর্শকমন কাড়তে পারছেন না। একটি ছবি করেই ঝরে পড়ছেন। অভিনয়ে দক্ষতা নেই নতুনদের। কাজ শেখারও চেষ্টা নেই। কাজ নয়, অর্থই তাদের কাছে প্রধান। ভাবটা এমন শুধু ‘নায়িকা’ তকমা পেতেই আসা। আর এই তকমা ব্যবহার করে অল্প সময়ে বাড়ি-গাড়ি আর অর্থবিত্তের মালিক হওয়া। এতে চলচ্চিত্র জগেকও তারা কিছু দিতে পারছে না আর নিজের স্বপ্নও পূরণ হচ্ছে না। ফলে ঢালিউডে নায়িকা সংকট আর কাটছেই না।

পুরনোদের মধ্যে মৌসুমী, শাবনূর, পপি, পূর্ণিমারা অনেক আগেই নানা কারনে বড় পর্দার অভিনয়ে অনিয়মিত। নির্মাতাদের কথায় বয়স হয়ে যাওয়ায় নায়িকা হিসেবে তাদের যাত্রা ফুরিয়েছে। এই চারজনের পর নায়িকা হিসেবে যোগ্যতা দেখিয়েছিলেন অপু বিশ্বাস আর মাহিয়া মাহি। কিছুদিন ধরে অপু চলচ্চিত্রে অনিয়মিত। গত মার্চ থেকে নিখোঁজ তিনি। হাতে থাকা বেশ কটি ছবির কাজ ছেড়ে দিয়েছেন অন্তরালে যাওয়ার আগে। নতুন ছবির জন্য নির্মাতারা খুঁজে পাচ্ছেন না তাকে। অন্যদিকে মাহিয়া মাহি জাজ মাল্টিমিডিয়া থেকে ছিটকে পড়ার পর তেমন ছবি পাচ্ছেন না। এরপর আবার সম্প্রতি বিয়ে করে ঘোষণা দিয়েছেন বছরে দুই-একটির বেশি ছবিতে কাজ করবেন না। ঢালিউডের এই দুই দর্শকপ্রিয় নায়িকার অনুপস্থিতি চলচ্চিত্র নির্মাণকে প্রায় অনিশ্চিত করে তুলেছে।

নির্মাতারা কিন্তু এই দুর্যোগে বসে নেই। নতুন মুখ আনার পাশাপাশি মডেল আর ছোট পর্দার অভিনেত্রীদের দিয়ে বৈতরণী পারের চেষ্ট চালিয়ে যাচ্ছেন। সে হিসেবে চলচ্চিত্রে এসেছেন জয়া আহসান, বিদ্যা সিনহা মিম, নুসরাত ইমরোজ তিশা আর নুসরাত ফারিয়ার মতো ছোট পর্দার সফল নায়িকারা। কিন্ত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে তাদের চলাফেরা সীমিত। জয়া বেশিরভাগই কলকাতা আর ভিন্ন স্বাদের ছবিতে অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত। দুই-একটি বাণিজ্যিক ধারার ছবিতে কাজ করলেও তাতে দর্শক বিপুলভাবে গ্রহণ করেনি তাকে। বিদ্যা সিনহা মিমেরও একই অবস্থা। বাণিজ্যিক ছবিতে আহামরি গোছের কিছু করতে পারেননি। জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ভিন্ন ধারার ছবি ‘জোনাকির আলো’র জন্য। মানে বাণিজ্যিক ছবির নিয়মিত নায়িকার তকমা তার কপালে জুটছে না। তিশা  ‘মেন্টাল’ শিরোনামের একটি বাণিজ্যিক ছবিতে শাকিবের বিপরীতে কাজ করেন এবং দর্শক প্রশংসা পান। তারপরও তাকে ঢালাওভাবে বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা ভাবতে নারাজ নির্মাতারা। নির্মাতাদের কথায় ছোট পর্দার নায়িকাদের বড় পর্দায় ক্রেজ নেই বললেই চলে। তাই সবাই তিশাকে নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইবে না। নুসরাত ফারিয়া এখনো জাজ মাল্টিমিডিয়ার ঘরে বন্দী। যৌথ প্রযোজনার ছবিতেই কাজ করছেন। ‘আশিকী’, ‘হিরো ৪২০’ ও ‘বাদশা’ ছবিতে কাজ করলেও এসব ছবির নায়ক কলকাতার অংকুশ, ওম আর জিৎ-এর পাশে খুব একটা জ্বলে উঠতে পারেননি তিনি। তাই তাকে নিয়ে বড় মাপের কোনো স্বপ্ন দেখতে ভরসা পাচ্ছে না নির্মাতারা।

সবমিলিয়ে বড় পর্দার আগের নায়িকারা নিয়মিত নেই। ছোট পর্দার নায়িকারা খুব সফল বলা যায় না। নতুনরাও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারছে না। ট্যালেন্ট হান্ট কার্যক্রম যেমন সুপার হিরো হিরোইন প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ মিমো, নিলয়, শখ, সাগর, শম্পা, রোজরাও বড় পর্দায় ব্যর্থ। তাহলে কি চলচ্চিত্রে নায়িকা সংকট কাটবে না। কেন নতুনরা সফল হচ্ছে না। এ নিয়ে কথা বলেছেন কয়েকজন সিনিয়র চলচ্চিকার। নায়করাজ রাজ্জাক বলেন, আমাদের সময়ের নায়িকারা অভিনয়কে ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে নিতেন। এখন যারা আসছে তাদের মধ্যে কাজের প্রতি একাগ্রতা নেই। এতে সংকট বাড়ছে। জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুচন্দা বলেন, চলচ্চিত্র আর অভিনয়কে ভালোবাসতে হবে। দক্ষতা দেখাতে হবে। না হলে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব নয়। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন বলেন, আমাদের সময় কাজ শিখিয়ে তা আদায় করে নেওয়া হতো। ওই সময়ের নায়িকাদের মধ্যে শেখার আগ্রহও ছিল। এখন তা আছে বলে মনে হয় না। ফলে সংকট কাটছে না। বরং বাড়ছে। চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, এখন জহির রায়হান, কাজী জহির, কামাল আহমেদ, ্এহতেশাম, মোস্তাফিজ, খান আতা, সুভাষ দত্ত, আজিজুর রহমান, আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল প্রমুখের মতো নির্মাতা কোথায়। তারা হাতে-কলমে কাজ শিখিয়ে নায়িকা তৈরি করেছেন। এসব নির্মাতাকে শিল্পী তৈরির কারিগরও বলা হয়। সর্বশেষ সোহানুর রহমান সোহানও শিল্পী তৈরিতে সফল হন। শুধু নতুন মুখদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। শিল্পী তৈরিতে নির্মাতাদের ভূমিকা রাখতে হবে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ছটকু আহমেদ বলেন, অপুর এবং মাহির পরে অনেক নায়িকাই এসেছে। তারা মোটেও জমাতে পারেনি বা পারছে না। দুই-একটি ছবি করেই ঝরে পড়ছে। ফলে ঢালিউডে নায়িকা সংকট এখন মহাসংকটে পরিণত হয়েছে। এ সংকট দূর করতে সত্যিকারের নায়িকা হতে আসতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে নির্মাতাদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।

এদিকে সফল না হওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক নতুন মুখ অভিযোগের সুরে বলেন, আমরা অভিনয় করতেই আসি। নানা অনিয়ম আমাদের এগুতে দেয় না। কী সেই অনিয়ম। এমন প্রশ্নে সংকোচ নিয়ে বলেন অভিনয় করানোর চেয়ে নির্মাতারা আমাদের নিয়ে আনন্দই বেশি করতে চান। অনেক ক্ষেত্রে স্ক্রিপ্ট বা ক্যারেক্টারের বালাই থাকে না। নির্মাতাকে খুশি করতে পারলেই হলো। ক্যমেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে সংলাপ বলতে বলা হয়। এভাবে সত্যিকারের অভিনয় করা কিভাবে সম্ভব। প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। গ্রমিং বলতে কিছু নেই। মানে ছবি করাটা মুখ্য নয়, নায়িকা এনে ফুর্তি করাটাই আসল কাজ। এ কারণে আমাদের দোষ দেওয়ার আগে সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করা দরকার। নতুন মুখরা আরও বলেন, একথা অস্বীকার করছি না যে, অনেকে আসলেই অর্থ প্রতিপত্তির মোহ নিয়ে এই জগতে আসে এবং অনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে নানা স্ক্যান্ডালের জন্ম দেয়। তাদের কারণে চলচ্চিত্র জগৎও প্রশ্নের মুখে পড়ে আর ঢালাওভাবে সবাই বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ে। এ অবস্থার অবসান না হওয়া পর্যন্ত সফল হওয়া তো দূরের কথা নতুনরা চলচ্চিত্রে এসে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না।

চলচ্চিত্রবোদ্ধা অনুপম হায়াৎ বলেন, নতুনদের সফলতা নির্ভর করছে তাদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলার ওপর। শুধু চলচ্চিত্র নয়, যে কোনো কাজে আগে প্রশিক্ষণ দরকার। না হলে কাজটি সম্পর্কে ধারণা জন্মাবে কীভাবে। বর্তমানে সরকার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থা করেছে। তাছাড়া প্রাইভেট অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রে কাজ করাতে গেলে আগে গ্রমিং-এর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এখন তো গ্রমিং বলতে কিছু নেই। তাই নতুনদের অভিনয় মনে দাগ কাটে না। তারা স্থায়ীও হতে পারে না। এই দায় প্রথমে নির্মাতার। নির্মাতা সচেতন হলে এখনো ঢালিউডে শাবানা, ববিতা, কবরী, সুচন্দার মতো নায়িকা তৈরি হতে পারে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow