Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:১৮
সত্যজিতের চোখে উত্তম
শোবিজ প্রতিবেদক
সত্যজিতের চোখে উত্তম

উত্তমকে যখন প্রথম বড় পর্দায় সত্যজিৎ রায় দেখেন, তখনো তিনি পরিচালকের খাতায় নাম লেখাননি। কিন্তু বহুমুখে উত্তমকীর্তন শুনে তার অভিনয় দেখার একটা আগ্রহ তো ছিলই।

ওই যুগের বাংলা চলচ্চিত্র তখন দুর্গাদাস ব্যানার্জি, প্রমথেশ বড়ুয়া, সায়গল, ধীরাজ ভট্টাচার্যের শাসনে। হঠাৎই উদয় উত্তম কুমারের। সাবলীল অভিনয় দিয়ে তত দিনে নজর কেড়েছেন বিখ্যাত পরিচালকদের। প্রাক-উত্তম যুগে বাংলার কোনো নায়ককেই তুলনা করা যেত না হলিউড অভিনেতাদের সঙ্গে। শুধু উত্তমের বেলায় ব্যতিক্রম।

সত্যজিৎ গুটিকয়েক সিনেমায় উত্তমের অভিনয় দেখলেন। এর মধ্যে একটি সিনেমা আবার তৎকালীন প্রতিভাধর পরিচালক নির্মল দে নির্মিত। প্রথম দর্শনে খুব একটা খারাপ লাগল না হবু পরিচালকের। সুদর্শন পুরুষটির উপস্থিতিতে ছবির গল্প এগিয়েছে তরতর করে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়, উত্তম ছিলেন মঞ্চ অভিনেতা। অথচ রুপালি পর্দার অভিনয়ে তার কোনো ছাপই পাওয়া যায় না। এ অভিনেতার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, তা এক রকম ধরেই নিয়েছিলেন বিশ্ববরেণ্য এ পরিচালক। তার সঙ্গে কাজ করার যখন সময় হলো, উত্তম তখন মহানায়ক। কিংবদন্তিদের তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে তিনি, বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের বিপরীতে। সেলুলয়েড জগতে যথারীতি পরিচিতি পেয়ে গেছে এ রোমান্টিক জুটি। আর উত্তম? হলিউড রীতিতে উত্তম রীতিমতো তারকা। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের তখনো মহানায়ককে ঠিক ‘মহানায়ক’ বলে মেনে নিতে দ্বিধা ছিল। কারণ হলিউডে অনেকেই রাজত্ব করেন অভিনয়গুণে নয়। তাদের তারকাখ্যাতি ভক্তদের কল্যাণে। এ ক্ষেত্রে গ্রেগরি পেকের কথাই বিশেষ মনে হতো তার। মনে হতো, এ অভিনেতার সত্যিকারের অভিনেতা হতে আরও পরিশ্রম ও অনুশীলনের প্রয়োজন। উত্তমকেও সেই ধারার অভিনেতা মনে করতেন তিনি। কিন্তু উত্তমের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তার ধারণা একেবারেই পাল্টে গেল। মহানায়কের মেধা তো ছিলই, সঙ্গে ছিল পারফেকশনিস্ট হওয়ার অধ্যবসায়। সত্যজিতের মতে, এটি গ্রেগরির অভিনয়ে খুঁজে পাওয়া ভার।

অস্কারজয়ী এ পরিচালক উত্তমের সঙ্গে কাজ করার জন্য এক রকম মুখিয়ে ছিলেন বলা যায়। তাকে মাথায় রেখেই লিখলেন চিত্রনাট্যের একটি ছোট্ট অংশ। গল্পটি এক মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণকে ঘিরে। সেই তরুণ ফিল্মে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। আর একটি সিনেমায় অভিনয় করেই পৌঁছে গেছেন খ্যাতির স্বর্ণশিখরে। গরিব থেকে ধনী হওয়ার কাহিনীটি উত্তম কুমারের বাস্তব জীবনের সঙ্গে কিঞ্চিত সামঞ্জস্যপূর্ণ। উত্তম মনে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব না রেখেই একবাক্যে রাজি হয়ে যান এ ছোট্ট অংশে অভিনয়ের জন্য। শুটিংয়ের কিছুদিন আগেই গুটি বসন্ত থেকে সেরে উঠেছেন তিনি। মুখে দাগ রেখে গেছে অসুখ। তা সত্ত্বেও অভিনয়ের সময় মেকআপ নিতে চাননি তিনি। অবশ্য এ ছোট চরিত্রে অভিনয় করতে হয়নি তাকে।

উত্তমের সঙ্গে কাজের সময়টিকে তার সিনেমা নির্মাণের জীবনের স্মরণীয় সময় বলে অভিহিত করেছেন পরিচালক সত্যজিৎ।   উত্তম কুমারের মধ্যে সেই নিষ্ঠার অন্ত ছিল না। বিশ্লেষণধর্মী অভিনয়ের ক্ষেত্রে খুব কম সময়ই নির্দেশনা দিতে হতো তাকে। নিজের মতো চরিত্র আত্মস্থ করে নিজের সহজাত অভিনয়টি করে যেতেন খুব সহজভাবে। সবচেয়ে মজার বিষয়, শুটিং বা অভিনয় নিয়ে উত্তমের আলোচনা। শুটিংয়ের সময় চিত্রগ্রহণ নিয়ে এমন সব পরামর্শ দিতেন, যা সত্যজিতের কাছেও অপ্রত্যাশিত।

উত্তম কুমারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ভেঙে সত্যজিৎ কাজ করলেও কোথাও ছিল একটা সূক্ষ্ম দূরত্ব। কাজ করেছেন দুটি চলচ্চিত্রে ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’য়। নায়ক সিনেমাটি একজন চিত্রতারকার রেল ভ্রমণ ঘিরে। কলকাতা থেকে দিল্লি, ২৪ ঘণ্টার ভ্রমণ। পথ চলতে চলতে দেখা হয় তরুণী সাংবাদিক শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে। নায়কের সঙ্গে আলাপনে এগিয়ে আসেন সাংবাদিক। অটোগ্রাফের জন্য খাতা বাড়িয়ে দেন নায়কের দিকে। সেই সঙ্গে জানিয়ে দেন অটোগ্রাফটি নিজের জন্য নয়, খুড়তুতো বোনের জন্য। শুটিংয়ের সময় উত্তম পকেট থেকে তুলে নিলেন কলম। এ কলমই বাস্তবে ভক্তদের অটোগ্রাফ দেওয়ার জন্য সচরাচর ব্যবহার করেন। অটোগ্রাফ দেওয়ার সময় দেখলেন কলম থেকে কালি পড়ছে না। কালি শুকিয়ে কাঠ। ওই সময়ও উত্তম চালিয়ে গেলেন সাবলীল অভিনয়, যেন কিছুই হয়নি। সংলাপ বলার সঙ্গে কলম বার দুয়েক ঝাঁকিয়ে নেওয়ার পরও যখন কালির দেখা মিলল না, নিবটি ভিজিয়ে নিলেন সামনে রাখা গ্লাসের জলে।

অটোগ্রাফ দিলেন, বাস্তব জীবনে ভক্তদের ঠিক যেভাবে দেন। সত্যজিৎ রায় মোক্ষম সময়ে ‘কাট’ বলতেও ভুলে গিয়েছিলেন। কোনো প্রস্তুতি ছাড়া একজন সত্যিকারের অভিনেতাই পারেন এমনভাবে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow