Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:০৯
ভালো নেই বড় পর্দার এক্সট্রা শিল্পীরা
এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর ‘আমগাছতলা’ খ্যাত স্থানে এক্সট্রাদের নির্দিষ্ট ঠিকানা গড়ে ওঠে। একসময় রমরমা অবস্থা ছিল তাদের। এখন বেকার, নিঃস্ব। কেউ মঞ্চে উদ্দাম নৃত্য করছে। কেউ মিউজিক ভিডিওতে মডেল হচ্ছে। কেউবা অনৈতিক কাজে গা ভাসিয়েছে
আলাউদ্দীন মাজিদ
ভালো নেই বড় পর্দার এক্সট্রা শিল্পীরা
এক্সট্রা নাসির এখন এফডিসিতে সিগারেট বিক্রি করেন

চলচ্চিত্রে এক্সট্রা শিল্পী বলে আর কিছু নেই। ছবির অভাবে বেকার তারা।

এক্সট্রাদের অবস্থা এখন খুবই করুণ। এক সময় এফডিসির আমতলা ছিল এক্সট্রাদের নির্দিষ্ট ঠিকানা। এখানে তারা জড়ো হতেন। দিনে কয়েকটি ছবিতে ডাক আসত। এখন আমতলা ফাঁকা। কারণ ছবি নির্মাণ উদ্বেগজনক হারে কমেছে। এদিক-সেদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এক্সট্রারা। হাপিত্যাশ করে অনাহারে দিন কাটছে তাদের।

নাসিরের বাড়ি বরিশাল। নব্বই দশকের শুরুর দিকে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসা তার। এক সময় এক্সট্রা শিল্পী হিসেবে কাজ পেয়ে যান। দৈনিক এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় ছিল। বেশ ভালোই চলছিল জীবন। ২০০৮ সালের পর ছবি নির্মাণ কমে আসলে কোনো দিন ৩০০ টাকা পেলে তা দিয়ে কোনোভাবে সপ্তাহ পার করতে হতো। এখন কাজ নেই বললেই চলে। আর কতদিন উপোস থাকা যায়। তাই পান, সিগারেট, চকলেট আর কলম বিক্রি করেন এফডিসিতে।

নূপুর। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। আশির দশকের শেষ ভাগ থেকেই এক্সট্রা হিসাবে কাজ শুরু। সচ্ছলতার মধ্য দিয়েই চলছিল জীবন। কিন্তু চলচ্চিত্র শিল্পের দৈন্যদশায় জীবনে অন্ধকার নেমে আসে তার। পিতৃহারা সন্তানকে মানুষ করতে পরিচালক সমিতিতে ঝাড়ুদারের কাজও করতে হয় তাকে। অভাব অনটনে দুই চোখে এখন শুধুই অন্ধকার তার।

ষাটোর্ধ্ব নাজমা আক্তার এফডিসির আঙিনায় কাজের অপেক্ষায় থাকেন। তার কথায় এক সময় অবস্থা রমরমা ছিল। দাইমা, ডাক্তারের চরিত্রও করেছি। দিনে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় ছিল। ৩৭ বছর আগে মেয়ে নূরজাহানের জন্মের পর চলচ্চিত্রে আসি। তখনকার দিনে সাড়ে তিন হাজার টাকা ঘর ভাড়া দিতাম। এখন বস্তিতে থাকি। তখন আয়ের টাকা দিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এখন উপোস করি। কল্পনা, আলেয়া বুড়ি, দিলবাহারী, বিনা, শুকুর জাহানের অবস্থাও আমার মতো। তারাও নামমাত্র বেঁচে আছে। শাহানা জানান, ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। মা, বোন, ভাবি যখন যে চরিত্র পান তাতেই অভিনয় করেন। সর্বশেষ কাজ করেছেন নায়ক শাকিব খানের সিনেমায়। কাজের পরিমাণ কমে গেছে বলে মিরপুর থেকে এখন এফডিসিতে কম আসেন। সকাল থেকে কাজের আশায় বসে আছেন বীণাও। মলিন মুখ তার। এসেছেন রামপুরা থেকে। কথা বলতে গেলে বিরক্ত হন। তিনি বলেন, ‘কাজ পাওনের লাইগ্যা বইস্যা থাকতে হয়। আগে তো প্রায় প্রতিদিনই নায়িকার বান্ধবী বা অন্য রোলে অভিনয়ের ডাক পাইতাম। এখন দিনের পর দিন অপেক্ষায় থাকি। কাজ আর পাই না। ’

রাবেয়া, মর্জিনা, আলেয়া, রেবেকা, সেলিম, মেরিসহ প্রায় অর্ধশত এক্সট্রা শিল্পীর জীবনকাহিনী এমনই মানবেতর।

এক্সট্রা শিল্পীদের জুনিয়র আর্টিস্টও বলা হয়। তাদের নিয়ে জুনিয়র আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠন থাকলেও এর কোনো কার্যকারিতা নেই। প্রায় ৩৫০ সদস্যকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ নামমাত্র এই সংগঠনটি। সামান্য আয়ের টাকার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ তুলে দিতে হয় দালাল ও চাঁদাবাজদের হাতে। অভিনয় করতে গিয়ে আহত হলে চিকিৎসা পায় না নির্মাতা কিংবা সংগঠনের পক্ষ থেকে। এক্সট্রাদের অভিযোগ শিল্পী দূরে থাক, আমরা মনে হয় মানুষের কাতারেই পড়ি না। দিনমজুরের অবস্থাও এর চেয়ে ভালো। কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করা মানে তা অনধিকার চর্চার পর্যায়ে পড়া। চড়া মাশুল দিতে হয় এ জন্য। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মিজানুর রহমানের কথায়, চলচ্চিত্রের নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে, শিল্পীদের পারিশ্রমিকও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু নিম্নগামী হয়েছে এক্সট্রাদের অবস্থান। এক্সট্রা বলে কথা বলার অধিকার বা মূল্যায়ন কখনো ছিল না তাদের। এখন তো চলচ্চিত্র নির্মাণের ধরন বদলেছে। আইটেম গান যুক্ত হয়েছে। নায়ক-নায়িকার সখা-সখী বা গানের দৃশ্যে নির্মাতা নিজের মানুষ বা ডান্স গ্রুপের সদস্যদের আনেন। এতে প্রকৃত এক্সট্রারা অবহেলিত হয়ে পড়েছে।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আজিজুর রহমান, হাফিজউদ্দীন, শাহজাহান চৌধুরীসহ অনেক সিনিয়র নির্মাতার কথায়  চলচ্চিত্রে অপরিহার্য এক্সট্রা শিল্পী। এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর ‘আমগাছতলা’ খ্যাত স্থানে এক্সট্রাদের নির্দিষ্ট ঠিকানা গড়ে ওঠে। এক সময় রমরমা অবস্থা ছিল তাদের। এখন বেকার, নিঃস্ব। কেউ মঞ্চে উদ্দাম নৃত্য করছে। কেউ মিউজিক ভিডিওতে মডেল হচ্ছে। কেউবা অনৈতিক কাজে গা ভাসিয়েছে। অনেকেই এসবের সঙ্গে আপস না করে উপোস অবস্থায় এফডিসিতে তীর্থের কাকের মতো কাজের অপেক্ষায় থাকে। এক্সট্রাদের বেশির ভাগই আসে অভাবী সংসার থেকে। তবে নায়ক-নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়েও অনেকের আগমন এবং স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখনকার জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা অভাবের তাড়নায় নয়, চলচ্চিত্রকে ভালোবেসেই এক্সট্রা হিসেবে এ অঙ্গনে আসেন। ১৯৬২ সালে ৯ বছর বয়সে ‘নতুন সুর’ ছবিতে ছোট্ট মেয়ের চরিত্রে ১৯৬৩ সালে ‘তালাশ’-এ নৃত্যশিল্পী, এরপর ‘আবার বনবাসে রূপবান’, ‘ডাকবাবু’সহ অনেক ছবিতে এক্সট্রা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৭ সালে ‘চকোরী’ ছবির মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে যাত্রা শুরু তার। নায়করাজ রাজ্জাকও প্রথমে ‘১৩ নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’সহ কয়েকটি ছবিতে এক্সট্রা শিল্পী হিসেবেই অভিনয় করেন। পরবর্তীতে অনেকের মধ্যে এক্সট্রা থেকে নায়ক-নায়িকা হয়েছেন আলেকজান্ডার বো, শাহীন, দিলদার, সাহারা, ময়ূরী, শানু, সুচনা, নদী, ঝুমকা, জিনিয়া, নাসরিন, সোনিয়া, শাহনূর প্রমুখ।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow