Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ অক্টোবর, ২০১৬ ২১:৪৪
নাটকে তারকাদের এক ধারার অভিনয়
নাটকে তারকাদের এক ধারার অভিনয়

টিভি চ্যানেলগুলোয় প্রচার হয় দেশীয় শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম ধারক-বাহক নাটক। এসব নাটকের মান, তারকাদের অভিনয়, সংলাপ ও গল্প নিয়ে দর্শক মনে থাকে  নানা প্রশ্ন।

চ্যানেল ও প্রযোজকদের চাহিদা আর তারকাদের এক ধারার অভিনয় দেশীয় নাটককে নিয়ে যাচ্ছে খাদের দিকে। এসব নাটকে তারকাদের এ ধরনের অভিনয় ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কয়েকজন গুণী নির্মাতার সঙ্গে কথা বলেছেন— পান্থ আফজাল

 

বৃন্দাবন দাস

তারকাদের এক ধারার অভিনয়ে নতুন সিঁড়িটি সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। ভালো কারেকটারও বের হয়ে আসছে না। এখন তো স্ক্রিপ্ট ছাড়াই কাজ হয়। এটা একটা আত্মঘাতী প্রক্রিয়া। এমনিতেই আমরা সমস্যার মধ্যে আছি। ডিরেক্টর কে, স্ক্রিপ্ট কী, কে অভিনয় করছে, তা তাদের কাছে মুখ্য নয়। চ্যানেলের কাছে অমুক হলেই হবে। এসব তারকা আসলে জোর করে অভিনয় করছেন। বিভিন্ন ডিরেক্টরও তাদের দিয়ে চাহিদামাফিক অভিনয় করাচ্ছেন। অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও আজকাল স্ক্রিপ্ট দেখছেন না। এ সবকিছুই আসলে একটা আত্মঘাতী প্রক্রিয়া। এভাবে চললে নতুন শিল্পী তৈরি হবে না। শিল্পীরা আসলে ডিরেক্টরদের হাতের পুতুল। সময়, বাজেট আর চ্যানেল ডিমান্ড অনুযায়ী তারা কাজ করে যাচ্ছেন কোনো প্রকার বৈচিত্র্যতা ছাড়াই। এটা ভবিষ্যৎ নাট্যজগতের জন্য শুভকর নয়।

 

সকাল আহমেদ

প্যাকেজ নাটক বরাবরই তারকানির্ভর হয়ে আসছে। সেই আফজাল-সুবর্ণা বা জাহিদ-শমী কায়সারের সময় থেকেই নাটকের এই ট্রেন্ড চলে আসছে। আজকাল ডিরেক্টররা তাড়াহুড়া করে কাজ নামান। তারকারাও সময়মতো আসেন না, তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করার জন্য চাপ দেন। ভালো কাজ কী করে হবে? অনেক নাটক আবার গল্পের বিষয় বা চরিত্রকে ভিত্তি করেই নির্মিত হয়। তারকারা আসলে গল্পের প্রয়োজনেই নাটকে যুক্ত হন। তারা নাটকের ডিমান্ড অনুযায়ী অভিনয় করেন। তারকাদের অভিনয়ে যদি বৈচিত্র্যতা না থাকে তাহলে সেটা খুবই খারাপ। মেধা খাটাতে হবে, আশপাশে দেখা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। সে অনুযায়ী চরিত্রে তা অ্যাপ্লাই করতে হবে।   

 

ইমরাউল রাফাত

আমরা আসলে চ্যানেল ডিমান্ড বা ভিওয়ারস ডিমান্ড অনুযায়ী নাটক বানাচ্ছি। আমাদের কারিশমা দেখানোর জায়গাটা খুবই কম। ভালো গল্প বা ভালো কোনো কাহিনী পাচ্ছি না। চ্যানেল থেকে কারেকটার আর্টিস্ট, বাজেট ঠিক করে দেওয়া হয়। সেখানে ভালো গল্প মুখ্য নয়। পূর্বের তারকাদের মতো এখন আর কোনো কম্বিনেশন প্যাকেজ নেই নাটকে।

সেই সুঅভিনেত্রী, সুন্দরী বা সুন্দর কণ্ঠ— কিছুই তেমন নেই আজকালের তারকাদের মধ্যে। আসলে তারকাদের দোষ নেই; ডিরেক্টরের কাছে সে পুতুল। সব তারকাই ভালো কিছু করতে চান। তারকাদের ঢেলে সাজাতে হবে। আমাদের কোনো ভালো গল্প নেই, ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটার নেই। গল্প নিয়ে ভাবনা নেই। সবই করা হচ্ছে হিন্দি সিরিয়ালের কপি। ভালো বাজেট, ডিরেক্টর ভাবনা আর তারকাদের মেধার সঠিক ব্যবহার হলে অবশ্যই ভালো কিছু হবে।   

 

চয়নিকা চৌধুরী

আসলে আমার মতে, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কোনো দোষ নেই। সব দায় সর্বপ্রথম ডিরেক্টরদের, তারপর প্রযোজক এবং চ্যানেল সংশ্লিষ্ট মালিকদের। যেমন আমাদের হাসির নাটক পুরোটাই ফাজলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। হাসির নাটক হবে স্বাভাবিক, প্রাণোচ্ছল। সব বয়সী দর্শক দেখে হাসবে, মজা পাবে। কিন্তু যা হচ্ছে সবই অস্বাভাবিক। একটা নাটক নির্মাণ হবে পরিচালকের মেধা দিয়ে, স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনা দিয়ে।

এখন নাটকে কিছু তারকাকে যুক্ত করা হচ্ছে একচেটিয়াভাবে। তাদের একঘেয়েমি অভিনয়ে বিরক্ত হচ্ছে নাটকের দর্শক। কাকে মানাবে, কী করতে হবে— তা ডিরেক্টরদের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। সেখানে প্রযোজক কোনো ইন্টারফেয়ার করবে না। হুজুগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নাটকের কাজগুলো যদি নাটকের মানুষের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে একঘেয়েমি মার্কা নাটকের হাত থেকে পরিচালকরা বাঁচবে।

 

 জি এম সৈকত

অভিনয়ের ক্ষেত্রে বেসিক জ্ঞানার্জনের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের নেই। প্রতিষ্ঠিত তারকারা থিয়েটার থেকেই এসেছেন। নির্মাতাদের মধ্যে অনেকেই অর্থের জন্য নির্মাণে আসেন। শিল্পীদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেওয়া বা তাদের কাজ শেখানোর মতো যোগ্যতা অনেকের নেই। তাদের বলা হয় আর্টিস্টনির্ভর নির্মাতা। কোনো একটি নাটকে কোনো সংলাপ বা চরিত্র দর্শকপ্রিয় হলে নির্মাতারা একাধারে সেগুলোরই পুনরাবৃত্তি ঘটান। এতে অভিনয় আর নাটকের গল্প একই ধাঁচের হয়ে যায়। এতে শিল্পীরাও একই ধাঁচের অভিনয় আঙ্গিক থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। নাটকে এখন প্রমিত ভাষা ও উচ্চারণচর্চা হারিয়ে যাচ্ছে। এতে দর্শক চরম বিরক্তিতে ভুগছে। বিনোদনের জন্য নাটক এ কথা সত্যি। বিনোদনের পাশাপাশি তাতে রাষ্ট্র, সমাজ ও জাতির জন্য কল্যাণকর মেসেজও থাকতে হবে। এই দিকটা এখনকার নির্মাতারা ভুলতে বসেছেন। ফলে একটি নাটক অন্য নাটককে বা এক চরিত্র অন্য চরিত্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারছে না।

 

মাহমুদ দিদার

আজকাল প্রায়ই দেখি, অভিনয় করার প্রতিযোগিতা! কোনো একটা গল্প ভাবলেই বলা হয় কে কে আছে! নায়ক-নায়িকার মুখই প্রধান। গল্পের বিষয় অনেক সময় চাপা পড়ে যায় কাস্টিংয়ের চাপে! মানে কাস্টিং চাই, গল্প, দূর, ছাই! ক্রম নিম্নগামী বাজেটে প্রথম সারির আর্টিস্ট নিতে গেলে বাজেটের একটা বড় অংশ চলে যায় তাদের পেছনে। অনেক সময় অভিযোগ আসে, অনেকে ঠিকমতো ফোন ধরে না, সেটে আসে না, শুটিংয়ে সহযোগিতা করে না! কিন্তু টাকা নেওয়ার বেলায় হিংস্র হয়ে ওঠে! কাজের প্রতি প্রেম নেই। যারা নাটক ব্যবসায় জড়িত আছেন আপনারা পরিপূর্ণভাবে পরিচালকের ওপর ছেড়ে দিন, গল্প বুঝে চরিত্র জেনে ডিরেক্টর সমস্ত কাস্টিং প্ল্যান করবেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow