Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ মার্চ, ২০১৭ ২১:৪৪
আইয়ুব বাচ্চুর ইন্টারভিউ
‘‘এখন কষ্টটা ইলেকট্রনিক, দুঃখটা ইলেকট্রনিক সুখটাও ইলেকট্রনিক...
...আমি হচ্ছি ভাড়া খাটা গিটারের ভাড়াটে প্রেমিক.... ’’
‘‘এখন কষ্টটা ইলেকট্রনিক, দুঃখটা ইলেকট্রনিক সুখটাও ইলেকট্রনিক...

প্রথম গিটার শো সাউন্ড অব সাইলেন্স শুরু হচ্ছে। হঠাৎ করে এমন একটি সলো গিটার-শো করার চিন্তা মাথায় কী করে এলো?

আমি প্রতিটি শোতেই কিছু কিছু গিটারের সলো বাজিয়ে থাকি।

আর দিন দিন এটার জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। কিন্তু একজন শ্রোতা বা দর্শক হিসেবে আপনি বলতেই পারেন, স্টেজে এতক্ষণ কেন গিটার বাজাচ্ছেন? আমার মনে হয় এই ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের মতো গিটার যে কথা বলতে পারে, গিটারের মনেও যে একটি আকুতি আছে তা দর্শক ও শ্রোতাদের বুঝাতেই এই শো-টি করার চিন্তা মাথায় আসে।

 

     আপনি কি মনে করেন, আমাদের দেশের দর্শক-শ্রোতারা এমন একটি শো শুনতে প্রস্তুত?

হ্যাঁ। কারণ আমি যখন এই খবরটি আমার ফেসবুকে শেয়ার করি তখন অনেকে জানতে চেয়েছেন কবে থেকে শো-টি শুরু হবে, টিকিট কোথায় পাবে ইত্যাদি। তাদের আগ্রহের জায়গা থেকে এই দুঃসাহসটা করতে যাচ্ছি। এ ছাড়া আমার কাছে মনে হচ্ছে, এখন সময় হয়েছে এমন একটি শো করার। আমি শুরুটা করে দিয়ে যাচ্ছি। সবাই মিলে এটিকে ধরে রাখতে হবে। এ ছাড়া আমার ইচ্ছা আছে, গিটারিস্টদের নিয়ে একটি ‘গিটার ফেস্ট’ করার।

 

     আইয়ুব বাচ্চু আর গিটার দুটোকে কখনই আলাদা করা যায় না। গিটারের সঙ্গে এ প্রেমের খবর কী?

আমার ভালোবাসার সবটা অংশজুড়ে আছে গিটার। মনের অজান্তে যে কোনো মেয়ের চেয়ে গিটারকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। ও যখন আমার কাঁধে থাকে তখন মনে হয় পুরো দুনিয়াটাই আমার। যখন তারগুলোতে হাত বুলাই তখন মনে হয়, তার চুলগুলোতেই হাত বুলাচ্ছি। যখন আমি গান গাইতে থাকি, গিটার বাজাই তখন মনে হয়, পৃথিবীতে এর চেয়ে শান্তির আর কোনো বিষয় নেই। গিটার আমার কাছে অক্সিজেনের মতো। গিটার ছাড়া আমি একটা অসম্পূর্ণ পদার্থের মতো। শুধু মাইক্রোফোন নিয়ে গান গাওয়া আমার জন্য কঠিন একটা কাজ। গিটার আমার অলংকার, অহংকার। গিটার আমার প্রেম।

 

     আপনি বেশকিছু রিয়েলিটি শোর বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। রিয়েলিটি শো থেকে বেরিয়ে আসা শিল্পীরা টিকে থাকতে পারছে না কেন?

রিয়েলিটি শো হচ্ছে একটি প্রাথমিক স্তর। এখান থেকে যারা বেরিয়ে আসছে আমরা মনে করছি তারা ভালো গান করবে। কিন্তু টিকে থাকতে হবে নিজের যোগ্যতায়। মনে রাখতে হবে, অন্যের গান গেয়ে টিকে থাকা যায় না। টিকে থাকতে হলে মৌলিক গান করতে হবে। অন্যের গান গেয়ে বেশি দিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যায় না।

 

     আশি ও নব্বই দশককেই বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগ বলছেন অনেকে; ওই সময় ফিরে আনতে হলে আমাদের কী করতে হবে বলে মনে করেন?

আমাদের প্রেমগুলো কেমন জানি ইলেকট্রনিক প্রেম হয়ে গেছে। এখন কষ্টটা ইলেকট্রনিক, দুঃখটা ইলেকট্রনিক, সুখটাও ইলেকট্রনিক। সব কিছুই কেমন যেন সহজ হয়ে গেছে। একটা সময় ছিল যখন একটি ছেলে একটি মেয়েকে প্রেমপত্র লিখত ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগিয়ে। তার চেয়েও বেশি কষ্টের ছিল, সে চিঠিটা প্রেমিকার হাতে পৌঁছানো। কিন্তু এখন একটি নম্বর আর একটি ফোনের মধ্য দিয়ে খুব সহজে আমরা মনের কথাগুলো জানিয়ে দিতে পারছি। এখন ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’—এই কথাটার কোনো মূল্য নেয়, এটি ছলনার আশ্রয় মাত্র। আমি বলতে চাই, মন থেকে কাজগুলো করতে হবে। তবেই আবার গানের জগতে সুদিন ফিরে আসবে।

 

     আপনাদের পরবর্তী সময়ে প্রচুর মেধাবী ব্যান্ড দল আসছে। তারা কেমন করছে বলে আপনি মনে করেন?

আমি মনে করি প্রতিটি ব্যান্ড তার আপন গতিতে চলছে। কিন্তু সব সময় একটা অভিযোগ অন্যরা করে— ‘তরুণ প্রজন্মের কেন আপনাদের মতো হচ্ছে না? কেন হচ্ছে না?’ আরে আমাদের মতো হওয়ার কথা না তো, ও তো এ যুগের সন্তান। ওকে এ যুগের মতো করে গাইতে দিতে হবে। এ যুগে যারা ব্যান্ডে আসছে, সবাই খুব ভালো করছে। তাদের নিজস্ব স্টাইলে ভালো করছে। শুধু তাদের প্রতি আমাদের উদারতার প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু অনেক আগেই নতুনকে বরণ করে নিতে অনেক কথায় বলে গেছেন। এটা জানতে হবে, বুঝতে হবে।

 

     আপনার অনেক গানের কথা যেন এক-একটা গল্প। বিশেষ করে হকার গানটি তো বটেই। এখন আর গান লিখছেন না কেন?

গান লিখতে হলে দুঃখ পেতে হয়। এখন আমি আর দুঃখ পাই না। তার মানে এই না যে, এখন আর গান লিখছি না। আমার সমস্যা হচ্ছে, আমি এমনি গান লিখতে পারি না। আমি ঠিক তোমার সঙ্গে যেরকমভাবে কথা বলছি, আমার গানগুলোও অনেকটা এরকম। আমি জীবনে বাস্তবে দেখা কিছু গল্প নিয়ে গান লিখি। যেমন— ‘ফেরারি এ মনটা আমার’ গানটা আমার স্ত্রীকে মনে করে লেখা। ওর পরিবার থেকে আটকে রাখা হতো। তার সঙ্গে অনেক দিন দেখা করতে দেয়নি আমাকে। ওই দুঃখ থেকে গানটা লেখা আরকি। তো ওই গানটা যে এত বিখ্যাত হয়ে যাবে, এটা আমি কখনই চিন্তা করিনি।

    

     এখন হিন্দি গান দখল করে নিয়েছে আমাদের গ্রাম-গঞ্জগুলোকেও। আগে গ্রামের বিয়েতে বাজত বাংলা সুন্দর সুন্দর গান। এই জায়গাটাও দখল করে নিয়েছে হিন্দি গান। এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

গান তো গানই। হোক এটি বাংলা, ইংরেজি বা হিন্দি। হয়তো এটি আমাদের ব্যর্থতা। হয়তো বিয়েতে যে বিটের গান বাজানোর প্রয়োজন ওই বিটের গান আমরা দিতে পারছি না। তা ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, এটি মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগ। এখানে ভালো-মন্দ দুটোই আছে। কিন্তু আমাদের ভালোটা বেছে নিতে হবে। যাতে আমাদের বাংলা সংস্কৃতি নষ্ট না হয়— আমাদেরই সচেতন হতে হবে।

 

     একটি গিটার ফেস্টিভ্যাল করার কথা বলছিলেন। এটা নিয়ে কিছু বলুন

আমি হচ্ছি ভাড়া খাটা গিটারের ভাড়াটে প্রেমিক। একজন মানুষ ৩০ টাকার বিনিময়ে আমার কাছে গিটার ভাড়া দিতেন। ওই সময় আমি গিটার বাজিয়ে পেতাম ৬০ টাকা। আমার হাতখরচ ছিল ১৫ টাকা। গিটার ভাড়া দিতাম ৩০ টাকা। বাকি ১৫ টাকা আমার পকেটে থাকত। যত রাতেই শো শেষ হোক না কেন, আমি তার বাড়িতে গিয়ে গিটারটি পৌঁছে দিয়ে আসতাম। আমি ওই অবস্থা থেকে উঠে এসেছি। আমি দামি জায়গা, বাড়ি, গাড়ি কিছু কিনিনি। আমি অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে বেশকিছু গিটার কিনে ফেলেছি। এতগুলো গিটার চুপ হয়ে বসে থাকবে তা মেনে নেওয়া যায় না। সেখান থেকেই এই ভাবনা— গিটারের একটি সলো শো করব, বহু আগে থেকেই এটা আমার পরিকল্পনায় ছিল। আট-নয় বছর আগে আমি ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ নামের একটি সলো অ্যালবাম করেছিলাম। ওই সময় এই অ্যালবামটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আমার ইচ্ছা আছে, বাংলাদেশে গিটারের ফেস্টিভ্যাল শুরু করব। এখানে সারা দেশের সব গিটারিস্ট গিটার বাজাবেন।

 

     একটি মিউজিকের স্কুল করার কথা বলেছিলেন। ওটার কী খবর?

মানুষের তো অনেক স্বপ্ন থাকে। সব কি আর পূরণ হয়? আমারও স্বপ্ন আছে মিউজিকের একটি স্কুল করার। যেখানে সারা দেশ থেকে ছেলে-মেয়েরা আসবে মিউজিক শিখতে। কিন্তু এমন একটি মিউজিক্যাল স্কুল খুলতে অনেক টাকার প্রয়োজন। যদি কোনো দিন সে পরিমাণ টাকা হয় তবে একটি মিউজিকের স্কুল বানাব।

 

এলআরবি নতুন কী করছে?

আমরা এখন ব্যস্ত আছি স্টেজ শো নিয়ে। এখন আর কোনো অ্যালবাম করছি না। আগে শ্রোতাদের কথা দিতে হবে, তারা পাইরেটেড সিডি কিনে গান শুনবে না। তারপরই আমরা নতুন অ্যালবাম করব। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অ্যালবাম দিয়ে আসব।

 

     ভক্ত কিংবা শ্রোতাদের উদ্দেশে কি কিছু বলতে চান?

আমার আশা থাকবে, ইউজার্ড শোবিজের ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ শোতে সবাই আসবেন। আমার মতো একজন মিউজিশিয়ানের পক্ষে স্পন্সর পাওয়া কষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এখনো আমরা কোনো স্পন্সর পাই না। স্পন্সর না পেলে আমরা নিজেরাই শো-টি করব। কিন্তু আমি তো কারও কাছে মাথানত করব না। আমরা গিটার শো করবই। আমরা আমাদের নিজেদের মতো কিছু একটা করতে চাই। আমি স্বাধীনতা নিয়ে কাজটা করতে চাই। শ্রোতাদের ভালোবাসাই জীবনের সেরা প্রাপ্তি। তাদের জন্যই আমার সব গান।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : আলী আফতাব

এই পাতার আরো খবর
up-arrow