Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:৪৮
মাইজভাণ্ডারী গানের হালচাল
আলাউদ্দীন মাজিদ
মাইজভাণ্ডারী গানের হালচাল

মাইজভাণ্ডারী গানের অবস্থা এখনো ভালো। ক্যাসেট, অ্যালবাম, সিডি না থাকায় এখন এই গান হয়তো আগের মতো সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তারপরও এর আবেদন একটুও কমেনি।

 

দমে দমে জপ রে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, দমে দমে জপ রে মন গাউছে মাইজভাণ্ডার, আমার গাউছুল আজম  কেবলা কাবা— এমন অসংখ্য ভাণ্ডারী গান এখনো মাইজভাণ্ডার ভক্তদের মনকে পুণ্যতার দিকে টেনে নেয়, করে বিমোহিত, পুলকিত। আমার গাউছুল আজম কেবলা কাবা মাইজভাণ্ডারী গান মাইজভাণ্ডারী ধারার অনুসারীদের গাওয়া মরমি গান। এ ধারার প্রবর্তক গাউছুল আজম হজরত মাওলানা সৈয়দ আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.) এবং গাউছুল আজম হজরত মাওলানা সৈয়দ  গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী প্রকাশ : বাবা ভাণ্ডারী। একশ বছরেরও আগে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায় এ ধারার গানের উদ্ভব হয়। এ পর্যন্ত শতাধিক ভক্ত-কবি হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন। রমেশ শীল, আবদুল জব্বার শাহ্ মিমনগরী, আবদুল হাদি, বজলুল করিম, আবদুল গফুর হালী, মনমোহন দত্ত, মাহাবুব উল আলম প্রমুখ মাইজভাণ্ডারী গান রচনা করে সুনাম অর্জন করেন। মাইজভাণ্ডারী মরমি গানের উদ্ভব ঘটে মূলত উনিশ শতকের শেষের দিকে। সৈয়দ আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারী এই অঞ্চলে মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রতিষ্ঠা করলে এই তরিকার অন্যতম অপরিহার্য অংশ হিসেবে মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভব ঘটে। মাইজভাণ্ডারী দর্শন বা তরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সেমা মাহফিল। আর সেমা মাহফিলের অন্যতম সহায়ক উপাদান হচ্ছে মরমি গান বা মাইজভাণ্ডারী সংগীত। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় দশ হাজারেরও অধিক মাইজভাণ্ডারী গান উপমহাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মূলত মাইজভাণ্ডারী গান হচ্ছে একটি আধ্যাত্মিক সংগীত যা স্রষ্টার প্রেমে ভক্তকুলের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে ভাব-বিহ্বলতায় বিভোর করে দেয়।   মাইজভাণ্ডারী মরমি গান রচনায় মাইজভাণ্ডারের সাংস্কৃতিক দূত, অভিবক্ত বাংলার কবিগানের কিংবদন্তির নায়ক কবিয়াল সম্রাট রমেশ শীল এক বিশেষ অবস্থান অধিকার করে আছেন। রমেশ শীল তার প্রতিটি গান রচনার শীর্ষে এর তাল সম্পর্কে নির্দেশ দিতেন। মাইজভাণ্ডারী গানের অন্যতম গীতিকার রমেশ শীলের জন্ম বাংলা ১২৮৪ সালের ২৬ বৈশাখ, ৯ মে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডী গ্রামে। কবিয়াল হিসেবে রমেশ শীলের যশ-খ্যাতি আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে উপমহাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ১৯২৩ সালের (৯ মাঘ ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) সাধক জমিদার সারদা বাবুর সঙ্গে মাইজভাণ্ডার শরিফ গমন করে কুতুবুল আকতাব হজরত গাউছুল আজম শাহ সুফি মাওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভাণ্ডারীর সান্নিধ্যে গিয়ে কৃপাপ্রাপ্ত হন। রমেশ শীলের গানে এমন সুরের ঝঙ্কার রয়েছে, যা মানুষকে নৃত্যপ্রবণ করে তোলে। তাল, লয়, ভাব, কথা ও সুরের এক অপূর্ব সমাবেশ রয়েছে রমেশের গানে। ফলে প্রতিটি গানেই এক অপূর্ব সাবলীল গতি রয়েছে। মাইজভাণ্ডারী গানের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এই গানের রানী খ্যাত শিল্পী কল্যাণী ঘোষ বলেন, মাইজভাণ্ডারী গানের অবস্থা এখনো ভালো। ক্যাসেট, অ্যালবাম, সিডি না থাকায় এখন এই গান হয়তো আগের মতো সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তারপরও এর আবেদন একটুও কমেনি। তার কথায় সত্তরের দশকে আমি যখন মাইজভাণ্ডারী গান শুরু করি তখন আমিই একমাত্র এই গানের মেয়ে শিল্পী ছিলাম। তখন শ্রোতারা আমাকে এই গানের রানী আখ্যা দেয়। একটা হিন্দু মেয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের গান গাইছে এটি একটি অসাধারণ ব্যাপার। প্রশংসার ফুলঝুরিতে ভাসতাম আমি।

এখনো নিয়মিত মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফসহ বিভিন্ন স্থানে ভাণ্ডারী গান করে যাচ্ছি। আঞ্চলিক গানের গীতিকার ফারুক হাসান বলেন, আঞ্চলিক ও ভাণ্ডারী গান হচ্ছে চট্টগ্রামের মানুষের প্রাণের গান। দুঃখ এসব গানকে অবিকৃতভাবে ধরে রাখতে আর কেউ এখন সাধনা করে না। নতুন করে এসব গান রচনার তাগিদ অনুভব করে না। পুরনো গানগুলোর চর্বিত চর্বন করে যাচ্ছে এখনকার শিল্পীরা। তাও আবার মডিফাই আর রিমিক্স করতে গিয়ে এই গানের মৌলিকত্ব নষ্ট করছে। এটি আমাদের কাম্য নয়।

ফারুক হাসানের কথায় রমেশ শীল যুগের পর সেলিম নিজামী, আবদুর রশিদ কাওয়ালরা যথাযথভাবে ভাণ্ডারী গান উপস্থাপন করতেন। তারা মারা যাওয়ার পর এখন কেবল আবদুল মান্নান কাওয়াল আর কল্যাণী ঘোষের কাছ থেকেই প্রকৃত মাইজভাণ্ডারী গানের প্রাপ্তি ঘটছে শ্রোতাদের।

এই গানকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ দরকার। এ গান সংরক্ষণ করতে আর্কাইভেরও প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন মাইজভাণ্ডারী গানের ভক্তরা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow