Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৫৩
একঘেয়ে নাটক, নাটকে একঘেয়েমি
একঘেয়ে নাটক, নাটকে একঘেয়েমি

দেশীয় চ্যানেলে বর্তমানে নাটক নির্মিত হচ্ছে লাগামহীনভাবে। টিভি চ্যানেল ছাড়াও ডিজিটাল প্লাটফর্মে প্রচার হচ্ছে প্রচুর নাটক। কিন্তু মানসম্মত কাজ কি তেমন করে হচ্ছে? তরুণ অপেশাদার নাট্যনির্মাতা, প্রযোজক, বিজ্ঞাপন এজেন্সি বা চ্যানেল মালিক কি পারছেন নাটকের দর্শকদের সঠিক মূল্যায়ন করতে? ইদানীং রোমান্টিক, কমেডির নামে নাটকে পরিলক্ষিত হচ্ছে একঘেয়েমি আর ভাঁড়ামি। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণে কিছু নাট্যব্যক্তিত্বের সঙ্গে কথা বলেছেন— পান্থ আফজাল

 

আলী যাকের

এখন তো অনেক চ্যানেল! এত এত চ্যানেল হলে তো মান ধরে রাখা যায় না। দর্শকপ্রিয়তা আসলে আপেক্ষিক ব্যাপার। শিল্প-কারখানার মতো প্রোডাকশন হচ্ছে এখন। মান কি করে ভালো হবে? দর্শক বাড়াতে হলে নাটকের মানের দিকে নজর দিতে হবে। আমি মনে করি, প্রকৃত মেধা আর মান দিয়ে নাটক বানালে দর্শক দেখে। অতিমাত্রায় টিভি চ্যানেল হয়ে যাওয়ায় সময়ের অভাবে যত্ন নিয়ে নাটক নির্মাণ বা অভিনয়ের দক্ষতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর অতিরিক্ত নাটক নির্মাণ, নাটকের বাজেট হ্রাসসহ একাধিক কারণে নির্মাণ আর অভিনয়, দুইয়ের মানই কমেছে। নাটক আর অভিনয়ে গভীরতা কমে গেছে। নাটক হয়ে গেছে শুধুই প্রেমকেন্দ্রিক। সমাজ বা পরিবারের গল্প তেমনভাবে নাটকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কৌতুকের নামে চলে ভাঁড়ামি।

 

মামুনুর রশীদ

এখনকার নাটকে বাবা থাকলে মা নেই আবার মা থাকলে বাবা নেই! তাই এসব নাটক দর্শকদের মধ্যে কোনো আবেগ সৃষ্টি করতে পারছে না। চরিত্র কাটছাঁট করা হচ্ছে। আর অভিনয়ে আগের সেই গভীরতা নেই। কমেডির নামে চলে ভাঁড়ামি। নাটক হয়ে গেছে প্রেম আর কমেডির নামে ভাঁড়ামো কেন্দ্রিক। পারিবারিক আবহের গল্প তেমনভাবে এখনকার নাটকে খুঁজে পাওয়া যায় না। চ্যানেল মালিক আর এজেন্সি এগিয়ে আসলে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব।

 

আবুল হায়াত

এখন তো নাটকই হচ্ছে চ্যানেলের ডিমান্ডে। এরা যেভাবেই চাইছে সেভাবেই হচ্ছে। তাদের যদি বোধোদয় না হয় তাহলে কীভাবে ভালো কিছু হবে? যারা ভালো বানায়, তারা না বানালে ভালো কিছুই হবে না। যারা মেকার না, তারা এখন কীভাবে এত এত নাটক বানাচ্ছে? প্রপারলি নাটক বানাতে হবে, প্রপার বাজেট হতে হবে—তাহলেই ভালো নাটক নির্মিত হবে। এক্ষেত্রে চ্যানেল-এজেন্সি যদি আরও বেশি সিরিয়াস হয়, তবে ভালো ভালো রোমান্টিক, কমেডি কিংবা সিরিয়াস ধারার নাটক আমরা পাব। আর নাটক প্রচারের আগে ঠিকমতো প্রিভিউ করতে হবে। খারাপ হলে ফেরত দিতে হবে। এতসব নাটক কারা কারা বানাচ্ছে? এর ফলে নাটক ইন্ডাস্ট্রিতে অরাজকতা সৃষ্টি হচ্ছে। চ্যানেল কি কোয়ালিটি কন্ট্রোল ঠিকমতো করছে? আমি কিন্তু কমেডি নাটকের বিপক্ষে নই; কিন্তু মানের দিক থেকে এইগুলো সস্তা পর্যায়ের হচ্ছে। প্রপার মেকিংয়ের কোনো চেষ্টা নেই কারও। বাজেটের কারণে তাড়াহুড়ো করে নাটক বানানো হচ্ছে ।

 

 

দিলারা জামান 

বাজেট স্বল্পতা দেখিয়ে নির্মাতারা দিনে দিনে চরিত্র কাটছাঁট করছেন। ৩-৪ জনকে নিয়ে নাটক বানাচ্ছেন। নির্মাতারা এখন নাটক ২/৩ দিনের মধ্যে শেষ করছেন, যেখানে সিনিয়র শিল্পী সংখ্যা নেই বললেই চলে। কমেডি নাটক হয়ে গেছে নিম্নমানের। যা হচ্ছে সবই ভাঁড়ামি। রোমান্টিক নাটকে হয়ে যাচ্ছে নায়ক-নায়িকা আর  মোবাইল ফোন নির্ভর। নাটকের কোনো গল্প নেই, নেই নির্মাণের তেমন কোনো মুনশিয়ানা। এক্ষেত্রে চ্যানেল-এজেন্সিদের এগিয়ে আসতে হবে। নাটকের বাজেট ঠিকঠাক মতো দিতে হবে।

 

হানিফ সংকেত

এখন নাটকে কোনো অনুভূতি নেই। কমেডির নামে এখন যে নাটকগুলো হচ্ছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের। কমেডি মানে কিন্তু ভাঁড়ামো নয়। আর নাটক নির্মিত হয় এখন মাত্র তিনটি চরিত্র নিয়ে। নাটকে এখন বাবা, মা, ভাই বোন, বাঙালি সংস্কৃতি, দেশ ও সমাজের চিত্র, জীবন-যাপনের চিরচেনা চিত্র ও চরিত্র অনুপস্থিত। প্রেম ছাড়া এখন যেন আর কোনো গল্পই নেই। এখন কিছু নাটকে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এসব নাটকে আঞ্চলিকতার ব্যবহার ঠিকমতো হচ্ছে না। কিছু কিছু নাটকে নির্মাতারা বিকৃত ভাষার জন্ম দিচ্ছে। অন্যদিকে একজন শিল্পী একদিনে দুই-তিনটা নাটকের শুটিং করছে। রয়েছে কাহিনীর দুর্বলতা। একজন নির্মাতা বা শিল্পী তড়িঘড়ি করে অল্প সময়ে প্রচুর কাজ করতে গিয়ে মানহীন কাজের কবলে পড়েন। নাটক চলে গেছে এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে। তাই টিভি চ্যানেলের পক্ষে নাটকের মান, নির্মাতা আর শিল্পী দেখার কোনো সুযোগ থাকে না। এ ছাড়াও রয়েছে নাটকের বাজেট স্বল্পতা।

 

মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী

এসব উত্তরণের জন্য সব রকমের প্রোডাকশনই লাগবে। সেটা রোমান্টিক, কমেডি কিংবা সিরিয়াস ধরনের হোক না কেন। তবে সবাই একই রকম প্রোডাকশন বানালেই সমস্যা। এটা নাটক ইন্ডাস্ট্রির জন্য অন্তরায় বলা চলে। গত্বাঁধা যে কমেডি বা রোমান্টিক নাটক হয়, তার বাইরে ভিন্ন রকমের নাটক বানাতে হবে; যেন সব কাজের মধ্যে বৈচিত্র্যতা থাকে। তাহলে ভারসাম্য আসবে।

 

গিয়াস উদ্দিন সেলিম

এই বিষয় নিয়ে অনেক বলেছি। মূল কথা হলো, একটি নাটকের বাজেট যদি ঠিকমতো পাওয়া না যায়, তাহলে আমরা ভালো কিছু আশা করি কীভাবে? প্রপার বাজেট ছাড়া তো আর নাটক হবে না। অতিরিক্ত বাজেট হলে অবশ্যই ভালো নাটক হবে। তখন কমেডি নাটক আর ভাঁড়ামি মনে হবে না। আর রোমান্টিক নাটকও একঘেয়েমি লাগবে না। অন্যদিকে নাটকের মধ্যে বৈচিত্র্যতা আসবে।

 

অমিতাভ রেজা

এখন কিন্তু ভালো নাটক হচ্ছে। যেমন ভাই-ব্রাদারের কাজ। ভালো কাজ মানেই হলো ঠিকঠাক মতো কাজ করে যাওয়া। অবশ্যই বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক নাটক হওয়া উচিত। রোমান্টিক, কমেডি নাটক তো আর খারাপ না। কিন্তু নির্মাণ খারাপ হলে দর্শক সেটা পছন্দ করে না। আর বাজেট কিন্তু তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গল্প খারাপ হলে, নির্মাণ খারাপ হলে নাটক খারাপ হতে বাধ্য। বাকিগুলো তেমন কোনো ফ্যাক্টর নয়। অনেক নাটকের মধ্যে কিছু তো ভালো নাটক হয়! অন্যদিকে এত নির্মাতা আমাদের দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর অন্য কোনো দেশে নেই। নির্মাণ, গল্প, চিত্রনাট্য খারাপ হলে নাটক হয়ে যায় নিম্নমানের। এইগুলোর দর্শক গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে হবে?

এই পাতার আরো খবর
up-arrow