Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:১৭
নাট্যোৎসব নিয়ে যত কথা
নাট্যোৎসব নিয়ে যত কথা
bd-pratidin

নাট্যোৎসব নাট্যাঙ্গনের শোভা বাড়ায়। কারণ মঞ্চে দর্শক টানতে নাট্যোৎসবের কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে স্বাধীনতা-পরবর্তী থিয়েটারের অন্যতম অর্জন দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনী। তবে এই সময়ে এসে শুরু হয়েছে করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় বিনা টিকিটে নাটক দেখা, যা থিয়েটার চর্চার অন্তরায়। তাই নাট্যোৎসবে করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতার নানা দিক নিয়ে কিছু বিশিষ্ট নাট্যজনের সঙ্গে কথা বলেছেন— পান্থ আফজাল

 

 

বাংলাদেশে প্রথম একটিমাত্র নাটক ‘রিজওয়ান’ এর একটানা ১৯টি পরিবেশনার মাধ্যমে একক নাট্যোৎসবের আয়োজন হয়। এ নাট্যোৎসবের মাধ্যমে প্রথম বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মীয়সম্প্রদায়ের ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ঈদের সঙ্গে মঞ্চনাট্যকে যুক্ত করা হয়। সেসময় ছিল দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়। টিকিট না পেয়ে অনেকে ফিরেও যায়। এরপর থেকে একের পর এক নাট্য দলের নাটক মঞ্চায়নে দর্শক বৃদ্ধি পেতে থাকে। দর্শনীর বিনিময়ে দর্শক নতুন নতুন নাটক দেখতে শুরু করে। চলতি বছরে প্রাঙ্গণেমোর, থিয়েটার, প্রাচ্যনাট, ঢাকা থিয়েটার, পদাতিক, বটতলা, দেশনাটক, হৃত্মঞ্চ, বাতিঘর, নাগরিকসহ বেশ কিছু দলের আয়োজনে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক প্রদর্শনী হয়। এর আগে গ্রে-কমিউকেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কোক কোম্পানিও নাট্যোৎসব করে। তবে সেটা দর্শনীর বিনিময়ে। তবে থিয়েটারে করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক উৎসবই হয়। এবারই প্রথম বিনা টিকিটে শিল্পকলায় পাঁচ দিনব্যাপী আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের উদ্যোগে নাট্যোৎসব শুরু হয়েছে। অনলাইন থেকে বিনামূল্যে নাটকের টিকিট সংগ্রহ করে উৎসবে নাটক উপভোগ করছে দর্শক। তবে, নাটকের মতো শ্রমসাধ্য মাধ্যমকে এভাবে বিনামূল্যে প্রদর্শনীর কড়া সমালোচনা করেছেন নাট্যকর্মীরা। অনেকে বলেছেন, বিনা টিকিটে নাটক দেখার এ আয়োজন যদি জাতীয় নাট্যশালার বাইরের কোনো ভেন্যুতে হতো, তাহলে আয়োজকদের সাধুবাদ জানানো যেত। তাদের মতে, নাটককে তারা নিজেদের বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহার করছে। আর এই চর্চা সুফল না হয়ে হিতে বিপরীত হতে পারে। তবে মঞ্চনাটকের অভিনেতা-কলাকুশলীদের উন্নত প্রশিক্ষণ, সম্মানী ও মঞ্চনাটকের মান বাড়াতে সংস্কৃতিমনা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে এগিয়ে আসায় সাধুবাদ জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী।

 

আতাউর রহমান

কয়েকদিন আগে আইডিএলসির পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ ঝেড়েছেন। তবে মন্ত্রী বলেছেন, কোনো ক্ষোভের কারণ নেই। বাইরের দেশে ব্যাংক স্পন্সর দিয়ে নাটক অনেক আগে থেকেই হয়, আমাদের দেশেও হয়। তবে কম। আইডিএলসির এই নাট্যোৎসবে অংশগ্রহণ করা প্রত্যেকটি দল ৩০ হাজার করে পাচ্ছে—এটা তো মন্দ নয়! আর ব্যাংকের করপোরেট লোকেরা তো নাটক দেখেন না; তারা তো এই সুবাদে দেখছেন। তবে হ্যাঁ, ফ্রিতে নাটক দেখানো হচ্ছে। এটা নিয়মিত হোক আমিও চাই না। বছরে অন্তত একবার হোক। তবে করপোরেট সাহায্য নিয়ে শিল্পচর্চা তো নতুন কিছু নয়। আর দর্শনীর বিনিময়ে তো ব্যাংকের ৩০ জন ভদ্র লোককে একসঙ্গেও করা যায় না। এই উদ্যোগের ফলে নাটকের প্রচার-প্রসার হচ্ছে। দেখে থাকবেন, শিল্পকলায় শুক্র-শনিবার কিছু লোক হয়। খোলা মাঠে কোনো অনুষ্ঠান হলে ২০-২৫ জনও লোক পাওয়া যায় না। গ্রে কমিউনিকেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় এর আগে নাট্যোৎসব হয়েছে। কোনো অসুবিধা নেই তাতে। এই উদ্যোগের ফলে ভদ্রলোকের যে নাটক দেখছে তাতে ভালো হয়েছে। এতে কারও ক্ষতি হয়নি। শিল্পকলারও না, নাটকের লোকদেরও না।

 

মামুনুর রশীদ

আসলে পৃষ্ঠপোষকতা করার দরকার রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। তাতে কোনো সম্মানহানি হয় না। এর আগে গ্রে কমিউনিকেশন করেছিল। তবে সেটা দর্শনীর বিনিময়ে ছিল। কিন্তু এবার আইডিএলসি করছে ফ্রি টিকিটে। আর আমিও বুঝি না, এরা কারা? এদের সঙ্গে কি শিল্পকলা যুক্ত, না নাটকের দলের লোক? কারা আয়োজন করেছে সেটা কিন্তু একটা রহস্য! তাদের স্বার্থে কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে তারা করে থাকলে সেটা ক্ষতিকর। একটি নাট্যোৎসবের সঙ্গে নাটকের দলের ও শিল্পকলা যুক্ত থাকা দরকার। স্পন্সর নিয়ে হতেই পারে, তবে দর্শনীর বিনিময়ে। স্পন্সর ব্যাংকের সিএসআর থেকে পেতেই পারে। তবে কোনো করপোরেট উদ্দেশ্য নিয়ে করা উচিত নয়। আর আমার বোধগম্য নয়, এরা কীভাবে হল বরাদ্দ পায়? কী তাদের উদ্দেশ্য?

 

আসাদুজ্জামান নূর

নাটক একটি ব্যয়বহুল শিল্পমাধ্যম। এ থেকে আয় করে শিল্পী তথা নাট্যকর্মীর জীবিকা নির্বাহ তুলনামূলকভাবে কঠিন। সেজন্য দেশের ব্যবসায়িক বা আর্থিক কোনো প্রতিষ্ঠান নাটকের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসলে নাট্যকর্মীদের উচিত সে সুযোগ গ্রহণ করা। সেটি নাটকের জন্য ভালো হবে। নাটক এগিয়ে যাবে এবং সমৃদ্ধ হবে। নাট্যকর্মীদের যাদের জীবন-জীবিকা মূলত নাটকের ওপর নিভর্রশীল, তাদের বাছাই করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক-সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বাৎসরিক সম্মানির ব্যবস্থা করতে পারে। এদিকে উপজেলা পর্যায়ে মঞ্চ তৈরির মাধ্যমে সরকার তৃণমূল পর্যায়েও নাট্যচর্চার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। থিয়েটার চর্চাকে একটি উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

 

তারিক আনাম খান

পৃষ্ঠপোষকতা অবশ্যই জরুরি, এটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এটা শুধু আমাদের দেশেই কম হয়, বাইরের দেশে অনেক হয়। বাইরের দেশে শিল্পচর্চা হয় বিভিন্ন কোম্পানি, ব্যাংক থেকে স্পন্সর নিয়ে। সরকারি অনুদান, পৃষ্ঠপোষকতা দোষের কিছু নয়। তবে নিজের বোধ, শিল্প, সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করা ঠিক নয়। কোনো কোম্পানি যদি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য এইসবের সঙ্গে যুক্ত হয় সেটা গোটা শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। এর আগে আমরাও উৎসব করেছি। গ্রে কমিউনিকেশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে কোক  কোম্পানি উৎসব করেছে। তবে অবশ্যই দর্শনীর বিনিময়ে করেছে। এ ছাড়াও তারা দেশ, ভাষাকে প্রাধান্য দিয়েই উৎসবটি হয়েছিল, ক্যাম্পেইন করেছিল। কিন্তু শুনেছি এবার যারা করছে, তারা বিনা টিকিটে নাটক দেখানোর ব্যবস্থা করেছে। এটা নিয়ে তো আমার আপত্তি আছে। দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চা অনেক বছরের আন্দোলনের ফসল। টিকিট কেটে যখন একজন নাটক দেখে, তখন তার মধ্যে একটা দায়িত্ববোধের জন্ম হয়। বিনা টিকিটে নাটক দেখা গ্রুপ থিয়েটার দর্শনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। আমাদের দরকার এখন গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো জায়গায় মঞ্চ নির্মাণ। নাটক প্রদর্শন করে থিয়েটার চর্চাকে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। তাই দর্শনীর বিনিময়ে নাটক মাস্ট।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow