Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২১:৫৩
এসব কী হচ্ছে এফডিসিতে
এসব কী হচ্ছে এফডিসিতে

এফডিসির এখনকার চিত্র দেখলে কষ্ট হয়, বুক ভেঙে কান্না আসে। একসময় তারকাদের ঢল থাকত এখানে। আর এখন ছবি নির্মাণ নেই বলে এফডিসি জনশূন্য হয়ে পড়েছে। এমন ক্ষোভ আর হতাশা এখন সিনিয়র নির্মাতা, শিল্পী আর কলাকুশলীদের। কেপিআইভুক্ত এই এলাকায় নিয়মবহির্ভূত নানা কর্মকাণ্ড চললেও প্রশাসনের টনক নড়ে না। এসব নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন— আলাউদ্দীন মাজিদ

 

নানা অঘটন

এফডিসিতে মারামারি, হাতাহাতি, মাদক সেবন, মদ্যপ অবস্থায় অপমৃত্যু, একে অপরকে বহিষ্কার, অসামাজিক কার্যকলাপ, সমিতির অফিসে বসে নায়করাজ রাজ্জাক সম্পর্কে মানহানিকর মন্তব্য করাসহ সবকিছুই চলে প্রশাসনের নাকের ডগায়, অথচ প্রশাসন এসব দেখেও দেখে না। ফলে অনিয়ম-অন্যায়ের মাত্রা বেড়েই চলেছে। গত ১৭ জুলাই এফডিসিতে চলচ্চিত্র উৎপাদন ব্যবস্থাপক সমিতি ও চলচ্চিত্র সহকারী পরিচালক সমিতির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রাত ৮টার সময় এফডিসির কড়ইতলায় শাপলা মিডিয়া প্রযোজিত ‘বয়ফ্রেন্ড’ সিনেমার শুটিং স্পটে ছবিটির প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন জিয়াউল হক মুনির। কর্মরত অবস্থায় সহকারী পরিচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সরদার মামুন ও এ সংগঠনের সহ-সভাপতি কাজী মুনির দলবল নিয়ে জিয়াউল হক মুনিরের ওপর হামলা করেন। আহত হন মুনির। এর আগে এমডির সভাকক্ষে চলচ্চিত্রকারদের সঙ্গে মতবিনিময় কালে এমডি আমির হোসেনের উপস্থিতিতে প্রযোজক আজিজ ও ইকবাল চরম বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন এবং সভা পণ্ড হয়ে যায়। গত ২৬ আগস্ট রাত ৯টার দিকে এফডিসির আট নম্বর ফ্লোরের দ্বিতীয় তলা থেকে মদ্যপ অবস্থায় পড়ে মারা যান চলচ্চিত্র ব্যবস্থাপক আবু সিদ্দিক। এমন সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে এফডিসিতে। অথচ এমডি বলেন তিনি কিছুই জানেন না।

 

এফডিসিতে কেন সমিতি

এফডিসি হচ্ছে কেপিআইভুক্ত এলাকা। যেখানে কোনো সমিতি বা ট্রেড ইউনিয়নের অফিস থাকা অবৈধ। তা সত্ত্বেও কীভাবে এসবের অনুমতি দেওয়া হলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র চলচ্চিত্রকার জানান, আশির দশকের শুরুর দিকে সংস্থার এমডি কর্নেল [অব.] শাহাবউদ্দীন এফডিসির মূল কাস্টমার প্রযোজকদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের একটি রিটায়ারিং রুম করার অনুমতি দেন। এরপরের এমডি গ্রুপ ক্যাপ্টেন [অব.] সাইফুল আজম ১৯৮১ সালে পরিচালকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য তাদের একটি স্টাডি রুমের অনুমতি দেন। একই কারণে ১৯৮৪ সালে শিল্পীদেরও স্টাডি রুমের অনুমতি দেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই চলচ্চিত্রকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পড়াশোনার কোনো বালাই নেই। স্টাডিরুম হয়ে গেছে সমিতি। এখানে নিত্যদিন চলে রাজনীতি, দলাদলি, অসামাজিক কার্যকলাপ আর আড্ডাবাজি। সম্প্রতি শিল্পী সমিতির এক কর্মকর্তা রীতিমতো আলোকসজ্জা করে ও আতশবাজি ফুটিয়ে সমিতির অফিসে ঘটা করে তার জন্মদিন পালন করেন। যা কেপিআইভুক্ত এলাকায় বেআইনি।

 

 

সমিতির ভাড়া বকেয়া

এফডিসিতে রয়েছে আটটি চলচ্চিত্র সমিতি ও দুটি কলাকুশলীর ট্রেড ইউনিয়ন অফিস। এসব অফিসের মাসিক ভাড়া আড়াই হাজার টাকা করে। বিদ্যুৎ ও পানির বিল আলাদা। এফডিসি প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, এত অল্প ভাড়া সত্ত্বেও সমিতিগুলো ভাড়া পরিশোধ করে না। গত বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৪ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ আর পানির বকেয়া বিলসহ এর পরিমাণ কোটি টাকার ওপরে। বর্তমানে এই বকেয়ার পরিমাণ প্রায় দুই কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা। তার কথায় সমিতিগুলো যদি নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করত তাহলে সংস্থাটি কিছুটা হলেও লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারত।

পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন বলেন, আমরা তো চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য কাজ করছি। পার্টি আনছি। এতে সংস্থাটিই লাভবান হচ্ছে।

আবার ভাড়া দিতে যাব কেন?

 

নামেমাত্র আধুনিকায়ন

বেশ কজন চলচ্চিত্রকার জানালেন ২০১১ সালে সরকার এই সংস্থার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য প্রায় ৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ ২০১৪ সালের জুনে তা তো শেষ হয়নি বরং অনেক দেরিতে গত বছর শেষ হলেও তা হয়েছে নামেমাত্র। কোথাও আধুনিকায়নের ছোঁয়া নেই। সময়মতো যথাযথভাবে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রায় ৫৩ কোটি টাকা খরচ হওয়ার পর বাকি টাকা সরকার ফেরত নিয়ে গেছে। যেসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে তা যথাযথ না হওয়ায় অধিকাংশই পরিত্যক্ত ও অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এগুলো কিনে শুধুই অর্থের অপচয় হয়েছে। ভবনগুলোর বাইরে ভিতরে সংস্কারকাজ দায়সারা গোছের হওয়ায় অল্প সময়ে তা বিবর্ণ হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টিতে প্রশাসনিক ভবন আর ফ্লোরসহ বিভিন্ন ভবনের রুমগুলোর ছাদ চুয়ে পানি পড়ে কাগজ ও আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে। শুটিং ফ্লোরগুলোর কোনো সংস্কারই হয়নি। ফলে এখনো ভগ্নদশায় রয়েছে এফডিসি।

 

 

মেকআপ রুমের ভগ্নদশা

সম্প্রতি এক নম্বর শুটিং ফ্লোরের কাছে যেতেই আমবাগানে জটলা আর ফ্লোরের মেকআপ রুম থেকে শোরগোলের শব্দ। হঠাৎ একজন মাথায় করে হাত-পা ভাঙা একটি চেয়ার নিয়ে মেকআপ রুম থেকে বেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছেন। মেকআপ রুমে ঢুকতেই নায়ক সম্রাট এগিয়ে এসে বললেন দেখুন তো কী কাণ্ড, বসতে গিয়ে দেখি চেয়ারের হাত-পা ভাঙা। খেয়াল না করে বসে পড়লে আজ নিশ্চিত দুর্ঘটনা ঘটত। এসি চলে না, অপরিচ্ছন্ন ওয়াশরুমের দুর্গন্ধে এখানে বসা দায়। চেয়ার নিয়ে হৈচৈ করার পর যে চেয়ারটি এনে দিয়েছে তাও ছেঁড়া, ভাঙাচোরা। এ অবস্থায় এখানে কাজ করব কীভাবে?  এমন ভগ্নদশা প্রতিটি মেকআপ রুম আর শুটিং ফ্লোরের। অথচ সরকার এফডিসির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য প্রায় ৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। সেই টাকার কী হলো। এমন প্রশ্ন এখন সব নির্মাতা-শিল্পী কলা কুশলীর।

 

 

চলচ্চিত্রের নির্মাণ কাজ নেই কেন?

এফডিসিতে এখন চলচ্চিত্রের নির্মাণ কাজ হয় কালেভদ্রে। গতকালও এখানে কোনো শুটিং ডাবিং হয়নি। কেন? এর জবাবে নির্মাতাদের বক্তব্য হলো— এমনিতে ছবি নির্মাণ কমে গেছে।

তার ওপর এফডিসিতে কাজ করতে গেলে বেসরকারি সংস্থা থেকে এখানে ফ্লোর কিংবা যন্ত্রপাতির ভাড়া বেশি গুনতে হয়। আবেদন করলে সহজে ফাইল নড়ে না। এ টেবিল সে টেবিল ঘুরতে ঘুরতে শিডিউল ঘাপলায় পড়তে হয়। তা ছাড়া নোংরা পরিবেশ তো আছেই। এত ঝক্কিঝামেলা দেখলে তো কোনো প্রযোজকই আর নির্মাণে আসবেন না।

 

 

নিরাপত্তা রক্ষীদের ক্ষোভ

এফডিসির নিরাপত্তা রক্ষীরা বলেন, কম জনবল নিয়েও আমরা যথাসাধ্য দায়িত্ব পালন করে আসছি। সরেজমিন দেখা গেছে গেটে সতর্ক পাহারায় নিয়োজিত রক্ষীরা। আগের মতো উেকাচ নিয়ে কাউকে আর প্রবেশ করানো হয় না। তারপরেও বেশ কিছু লোক অহরহ ঢুকছে।

কয়েকজন লোককে দেখা গেল ভিতরে ঢোকার জন্য রক্ষীদের চাপ দিচ্ছে। একপর্যায়ে আগত একজন লোক তার মোবাইল ফোনটি একজন রক্ষীকে দিয়ে বলেন, ধরেন কথা বলেন, এরপর ওইসব লোককে ভিতরে যেতে দিলেন সেই রক্ষী। ব্যাপার কী? জানতে চাইলে হতাশার সুরে তিনি বলেন, কিছু নির্মাতা, শিল্পী কলাকুশলীর লোকজনকে সংশ্লিষ্টরা ফোনে আমাদের শাসিয়ে এভাবে ঢুকতে দিতে বাধ্য করেন। এফডিসির মতো স্পর্শকাতর একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এসব ঘটনা উদ্বেগের ও অপমানজনক।

 

 

এমডি যা বললেন

এফডিসির এমডি আমির হোসেনের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তার কথায়— সমিতিগুলোকে বার বার তাগাদা দিলেও তারা বকেয়া ভাড়া দিতে আগ্রহ দেখায় না।

শুটিংফ্লোরসহ এফডিসির যত ভগ্নদশা রয়েছে তা সংস্কার করতে সরকারের কাছে ১৫ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ চেয়েছি। এটি পেলে ডিসেম্বরের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর নানা অঘটনের বিষয়টি আমি এখন থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখব। এসব বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow