Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২৩:৪৬
ইন্টারভিউ
মহান বিজয় একইসঙ্গে আনন্দের, গর্বের ও সম্মানের
মহান বিজয়  একইসঙ্গে আনন্দের, গর্বের ও সম্মানের
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সালেহ আহমেদ নামে সংবাদ পাঠ করতেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনেও তার ভূমিকা অগ্রগণ্য। এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন- পান্থ আফজাল

 

চলছে মহান বিজয়ের মাস। এই মাসকে আপনি কীভাবে স্মরণ করেন?

বিজয় তো আমাদের বাঙালির কাছে আনন্দের, গর্বের ও সম্মানের। তবে এবারের বিজয় দিবসে হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনের আগের সময় যেহেতু তাই এই মাসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এই মাসে নির্বাচন নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। কারণ, নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি অংশগ্রহণ করছে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে চাই এরা যেন নির্বাচিত না হয়। এটা তাহলে আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। এই মাসে চাই সবাই যেন মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদ, মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করে। আর সবাই যেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে। বিজয়ের মাসে এটাই আমার চাওয়া।

 

যে উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা অজির্ত হয়েছে সেটা কি সফল হয়েছে?

অনেক কিছুই হয়েছে আবার অনেক কিছুই হয়নি। তবে সাম্প্রদায়িক উত্থান, মৌলবাদীর উত্থান বর্তমানে কমেছে। আমি মনে করি, সব মানুষ সমান। সব ধর্মের, সব সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার দরকার। বিশেষ করে রাজনৈতিক অধিকার থেকে সামাজিক অধিকার বেশি দরকারি। 

 

স্বাধীনতা আন্দোলনে ’স্টপ জেনোসাইড’ এবং ’রূপান্তরের গান’ এর ভূমিকা কেমন ছিল?

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র দলিল ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ এবং স্টপ জেনোসাইড’ নির্মিত হয়। আমাদের স্টপ জেনোসাইড দেখে অনেক বিপক্ষ দেশে জনগণ উদ্বুদ্ধ হয়েছে । তখন মুক্তিকামী শিল্পী সংস্থায় আমিসহ ছিলাম ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন এবং মুস্তাফা মনোয়ার। আমরা যুবকদের নিয়ে স্কোয়াড গঠন করেছিলাম। ’৪৭-৭১-এর পটভূমিতে করা ‘রূপান্তরের গান’ এর ধারা বর্ণনা তখন আমি করতাম। রচনায় ছিল শাহরিয়ার কবির। রূপান্তরের গান নিয়ে তখন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলাম।

 

আর ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’র ভূমিকা...

১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে আমাকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় শিল্পীদের প্রতিবাদী সংগঠন ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’। সবাই তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পাকিস্তান বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বর্জন করি। গণআন্দোলনের চাপে পাকিস্তানি সরকার ৮ মার্চ থেকে বেতার টেলিভিশনের দায়িত্ব বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের হাতে  ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ২৫ মার্চের পর আমি মুজিব নগরে চলে যাই এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের নাট্য বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে নিযুক্ত হই। আমি তখন বেতার কেন্দ্র থেকে সালেহ আহমেদ নামে বাংলা সংবাদ পাঠ করতাম। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংবাদ পাঠের দায়িত্ব পালন করি। আমরা ২টি কমিটি করে বেতার-টেলিভিশনের প্রচার চালাই। আর পাকিস্তানের প্রচার মাধ্যম আমাদের কাজে ব্যবহার করি। এরপর প্রবাসী সরকারের

নেতৃত্বে স্বাধীন সরকার গঠিত হলো। যারা বেতার-টেলিভিশন থেকে ভারতে চলে গিয়েছিল তাদের ফিরিয়ে এনে ২৫ মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার শুরু হলো।

 

সেসময় আমাদের সমর্থন দিয়েছিল কারা?

পৃথিবী তখন ২ ভাগে বিভক্ত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য সরকারগুলো তখন আমাদের বিপক্ষে ছিল আর সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত এবং পূর্ব ইউরোপ আমাদের পক্ষে ছিল। মজার ব্যাপার হলো, কোনো কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান আমাদের বিপক্ষে থাকলেও জনগণ কিন্তু আমাদের সমর্থন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শিল্পী, বিশেষ করে বিটলসের শিল্পীরা আমাদের সমর্থন করেছে, পাশে থেকেছে। চাঁদা তুলে মুক্তিযুদ্ধের কাজে সহায়তা করেছে।

 

আপনার সাম্প্রতিক ব্যস্ততা কী নিয়ে?

যতটুকু পারছি কাজ করে যাচ্ছি। বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক আন্দোলন, মৌলবাদী আন্দোলন এবং গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করছি। বয়স তো আর কম হলো না। ৮৩ পার করছি। এখনো নাটক, চলচ্চিত্র, সিরিয়াল ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছি।

 

জীবনে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব করেন?

না, করতে চাই না। দেশকে স্বাধীন করেছি, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ব্যক্তি কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, আকাক্সক্ষা বা কোনো হতাশাও নেই ।

up-arrow