Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : ৬ মার্চ, ২০১৭ ১২:১৩ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ৬ মার্চ, ২০১৭ ১২:১৯
প্রথম সন্তান বোধ করি একটু সহজ সরল হয়
রিমি রুম্মান (নিউইয়র্ক), যুক্তরাষ্ট্র
প্রথম সন্তান বোধ করি একটু সহজ সরল হয়

পরিবারের প্রথম সন্তান বোধ করি একটু সহজ সরল হয়। আপা এমনই এক সহজ সরল মানুষ।

চাহিদা নেই। যা দেয়া হয়, তাই হাসিমুখে মেনে নেয়। কিন্তু আমার তা নয়। যা কিছু চাই, চাই-ই চাই। দুঃখী, করুন চেহারা করে, এটা সেটা বলে আব্বাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আদায় করে নিতাম সব। তবুও সেই সময়গুলোতে আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিল জীবনভর কেবল ঠকেই এসেছি আমি, আর আপা না চাইতেই সব পেয়ে যায়! এখন এই বড়বেলায় এসে বুঝি, আসলে তেমনটি ছিল না।

ছুটিতে চাঁদপুর এলে বাসায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সহ কত কাজ করে আপা একাকী! আমি অলস ঘুমিয়ে, শুয়ে, বসে আরাম করি দিনভর। সামান্য তিরস্কারের স্বরে আপা বলতো, এমন এক সময় আসবে জীবনে, কাজ করে কূল পাবি না। তবুও আমি খাটে বসে পা দোলাতে থাকি। কাজ শেষে দুপুরে শুয়ে শুয়ে ভার্সিটি, হোস্টেল, ওখানকার ডায়নিং এর খাবার নিয়ে নানান গল্প শুনাতো। আমি গভীর আগ্রহে সেই সব শুনতাম। এক ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসবার সময় ডায়নিং এ দেয়া ভাজা মাছ প্যাকেটে মুড়িয়ে নিয়ে আসে আমাদের দেখাবে বলে। পাঁচ সদস্যের পরিবারের আমরা সকলেই জটলা করে সীমাহীন বিস্ময়ে তা দেখি। অশ্রুসজল হয়ে উঠি। অস্ফুটে বলি, "এতো ছোট টুকরা"! হোস্টেলে ডালে কব্জি ভিজিয়ে ভাত খাওয়ার বর্ণনা আরো বেদনাবিধুর করে তোলে পরিবেশ। ছুটি শেষে আপার ফিরে যাবার দিনে আম্মা আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে ব্যাগে চাল, ডাল, বিস্কুটসহ এটাসেটা পোটলা পুঁটলি দিতে থাকে, দিতেই থাকে।

ভার্সিটি জীবনের একেবারে শেষ সময়টায় আমায় সাথে নিয়ে যায় দেখাতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। মনোরম গাছপালা, পাহাড় পরিবেষ্টিত। ডায়নিং এ কিংবা টিভিরুমে যেখানেই যাই, কেমন করে যেন সকলেই চিনে ফেলে আমায়। "তুমি লিপি'র ছোট বোন?" এমন প্রশ্নে বিস্ময়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াতাম। যদিও আমাদের দু'বোনের চেহারায় কোন মিল ছিল না। আপার সাথে এক সপ্তাহের হোস্টেল জীবনে বিকেলে ওর বন্ধুরাসহ একসাথে ঘুরতে যাওয়া, গলা ছেড়ে গান গাওয়া, পিকনিকে যাওয়া, সবমিলে জীবনের শ্রেষ্ঠতম কিছু সময় ছিল। শেষদিনে তল্পিতল্পা গুটিয়ে অনিশ্চিত জীবনের উদ্দেশ্যে আপা এবং তাঁর ক্লাসমেট বন্ধুরা অশ্রুজলে একে অপরের কাছ হতে বিদায় নেয়। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! আমি সেই বেদনাবিধুর দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলাম।

এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য জীবনে আরেকবার দেখেছি আমার দেশ ছেড়ে আসবার দিনে। ততোদিনে আপা ধানমণ্ডিতে নিজের সংসারে। আট/নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা আপা স্বামীসহ আমায় বিদায় জানাতে আসে এয়ারপোর্টে। পুষ্টিহীনতায় ভোগা রোগীর মতন চোখজোড়া কোটরে। ক্ষণে ক্ষণে চোখ মুছছিলো। আমি দৃষ্টিসীমায় মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অসহায় চাহনিতে চেয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

পাঁচ বছর বাদে যখন দেশে ফিরলাম, সবকিছুই কেমন বদলে গেলো, বদলে গেলাম আমিও! যে আমি আগে প্রায় প্রতিদিনই নানান প্রয়োজনে নীলক্ষেত, নিউমার্কেটের চৌরাস্তা অনায়াসে পার হতাম, সেই আমি ছোটখাটো রাস্তাও পার হতে পারি না! এতো মানুষ, রিক্সা, গাড়ি বেপরোয়া ছুটে চলে! রিক্সায় বসলে আপাকে খামচি দিয়ে ধরে থাকি। মনে হতো উল্টে পড়ে যাচ্ছি। রাস্তা পার হবার সময় ভয়ে আতঙ্কে চুপসে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকি। এক পা এগোলে তিন পা পিছিয়ে আসি। আপা একরকম টেনে হিঁচড়েই হাত ধরে রাস্তা পার করে দেয়!

এতোকিছু লিখেছি যে কারণে

সবকাজ শেষে করোনা এভিনিউ ধরে বাড়ি ফিরছি যখন, তখন সামনে সন্ধ্যার রক্তিম আকাশ। উত্তরে একঝাঁক পাখি উড়ছিলো। একঝাঁক দক্ষিনাকাশে। দু'টো ঝাঁক এক হয়ে মিছিলের মতো উড়ে গেলো সামনে, দূরে, বহুদূরের আকাশে। পাখিরাও কি ব্যস্ততায় উড়ে যায়? আপা ঠিকই বলতো, "এমন এক সময় আসবে জীবনে, কাজ করে কূল পাবি না"। দু'দিন আগে জন্মদিন গেলো আপা'র। আমার উইশ করা হয়নি তাঁকে! বিদেশ বিভূঁইয়ের ভয়ানক ব্যস্ততায় কতো কি ভুলে যাই আজকাল!

জীবন এগিয়ে চলুক জীবনের নিয়মে। ভালো থাকুন সকলে...

(লেখিকার ফেসবুক পেইজ থেকে সংগৃহীত)

বিডি-প্রতিদিন/০৬ মার্চ, ২০১৭/মাহবুব

আপনার মন্তব্য

up-arrow