Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৫:০৫ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৫:৪২
আজ সেই সূর্য সন্তানের জন্মদিন
সুলতান মোহাম্মদ মনসুর
আজ সেই সূর্য সন্তানের জন্মদিন
বঙ্গবীর আতাউল গণি ওসমানী

আজ সেই সূর্য সন্তানের জন্মদিন, যার নিজের যোগ্যতার রেঙ্ক দিতে বাধ্য হয়ে পাকিস্তানী জেনারেল তাচ্ছিল্য করে বলেছিল ‘তোমার হাইট যেখানে রিকোয়ারমেন্টের থেকে কম সেখানে কীভাবে সাহস কর জেনারেল রেঙ্ক নিতে?’
তখন ঠিক তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন- ‘Napoleon was two inches lower than me!!’
যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে বিভিন্ন রণাঙ্গনে অত্যন্ত বীরত্ব, ত্যাগ, সাহস ও রণনৈপুণ্যের পরিচয় দেয়ার পর ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে আইসিএস ক্যাডারে নিযুক্তি লাভ করেন এবং পরবর্তিতে জওহরলাল নেহরু কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়েও কূটনৈতিক পদ গ্রহণের প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। আর তিনি হলেন মরহুম বঙ্গবীর আতাউল গণি ওসমানী।
যার এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি তার জীবন কর্মকালীন এবং চিন্তা-ভাবনা দেশ ও জাতির জন্য উৎসর্গ করে অমর হয়ে রয়েছেন আমাদের হৃদয়ে।
উনার জীবন ইতিহাস থেকে জানা যায়, ওসমানীর পূর্বপুরুষ হলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীতে হযরত শাহজালাল (রহঃ)র সাথে আগত ৩৬০ জন আওলিয়ার অন্যতম আওলিয়া হযরত শাহ নিযাম উদ্দিন ওসমানী। হযরত শাহ নিযাম উদ্দিন ওসমানীর বংশধর খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ও জুবেদা খাতুনের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ছেলে ওসমানী ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর পিতার কর্মস্থল সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক স্থায়ী নিবাস সিলেট থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে বালাগঞ্জ থানার দয়ামীর নামক স্থানে। তিনি ১৯৪০ সালে ৫ অক্টোবর দেরাদূন সামরিক একাডেমী হতে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে আর্মির কিং কমিশন প্রাপ্ত হন। ১৯৪১ সালে ১৭ই ফেব্রুয়ারী ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং যোগ্যতার বলে তিনি ১৯৪২ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে ব্রিটিশ আর্মির সর্ব কনিষ্ঠ মেজর হন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে একটি ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক হয়ে বিশ্ব ইতিহাসে নজীরবিহীন রেকর্ড সৃষ্টি করেন।
তাকে ১৯৫৫ সালে ১২ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সেনা সদর অপারেশন পরিদপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এখানে তাকে ১৯৫৬ সালে ১৬ মে মাসে কর্নেল পদে পদোন্নতি প্রদান করে ডেপুটি ডাইরেক্টর এর দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়। এ-সময় আন্তর্জাতিক সংস্থা সিয়াটো ও সেন্টোতে ওসমানী পাকিস্তান বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে ওসমানীর দক্ষতার সাথে ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনের দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্নেল পদে কর্মরত থাকাকালীন ওসমানী একজন দৃড়চেতা বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত পেয়ে ছিলেন।
বঙ্গবীর ওসমানীর প্রস্তাবেই জেনারেল অকিনলেকের অনুরোধে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় পূর্ববাংলায় পি.এন.জি গঠন স্থগিত করে। ওসমানী নিজে প্রস্তাব করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন এবং উদ্যোগী হয়ে ১৯৫১ সালে বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হয়ে পূর্ব বাংলায় এসে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এই তিন বছর তিনি বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ও রেজিমেন্টাল সেন্টোরের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণার উৎস ছিল ওসমানীর গড়া বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এ ছাড়াও তিনি ১৯৫১ এবং ১৯৫৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ঢাকা, খুলনা, যশোর এবং চট্রগ্রামের স্টেশন কমান্ডার এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অতিরিক্ত কমান্ড্যান্ট নিযুক্ত হয়ে ই পি আর বাহিনীতে বাঙ্গালীদের কোঠা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবাঙ্গালী সেনাদের নিয়োগ বন্ধ করেন এবং প্রথমবারের মতো পার্বত্য উপজাতীয়দের ই. পি. আর-এ নিয়োগের ব্যবস্থা করেন।
অতঃপর তাকে ১৯৫৫ সালে ১২ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের সেনা সদর অপারেশন পরিদপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় সেখানে বাঙ্গালী সেনাদের স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি নিজের পদোন্নতির পর্যন্ত তোয়াক্ষাই করেন নাই। তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে’ দুই থেকে ছয় ব্যাটালিয়ানে উন্নীত, সেনা বাহিনীতে বাঙ্গালী নিয়োগ শতকরা দুই ভাগ থেকে দশ ভাগ বৃদ্ধি করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে অধিক হারে বাঙ্গালীদের নিয়োগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেগেছেন।
বাঙ্গালী সৈনিকদের মধ্যে ওসমানীর জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। বাঙ্গালী সেনারা তাকে পিতৃতুল্য শ্রদ্ধা করেন এবং তাকে ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের’ জনক হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বঙ্গবীর ওসমানীর বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে পূর্ণ সার্থকতা লাভ করেন। কর্নেল ওসমানী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ গানটিকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মার্চ সঙ্গীত মনোনীত করেন এবং সরকারীভাবে অনুমোদন করান। এছাড়া দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ ও বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ’ গান দুইটির সুর পাকিস্তান সামরিক বাদ্যযন্ত্রে বাজানোর প্রচলন করেন।
১৯৬৭ সালে এই মহান সেনানী অবসর গ্রহণ করেন। অনেক নেতৃবৃন্দ ওসমানীকে রাজনীতিতে যোগদান করার জন্য অনুরোধ জানান, কিন্তু ওসমানী উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে মিথ্যাচারিতা, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়মতান্ত্রিকতা ইত্যাদির কারণে রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তিতে জাতীয় স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭০ সনের জুলাই মাসে তার রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর কতিপয় বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঐক্যমত পৌছানোর পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করায় তাদের নেতৃত্বে সাড়া দিয়ে দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ আওয়ামী লীগের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
১৯৭০ সনের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জনগণ বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগকে জয়ী করেন। বঙ্গবীর ওসমানী নিজেও সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিশ্বনাথসহ চার এলাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এরপরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা। তাই আমি আর লম্বায় যাবোনা কেবল নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে জানাতে চাই, তার রাজনৈতিক বিশ্বাস যা তিনি তার "গণনীতির রুপরেখা" বইয়ে উল্লেখ করে গেছেন।

"‘সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ, অস্ত্রমুক্ত শিক্ষাঙ্গণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকল্প নেই । “গণতন্ত্রের বিকল্প হচ্ছে সেনা শাসক। উর্দিপরা সেনা শাসকরা পাকিস্তানে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে। বাংলাদেশেও যেন এর উদ্ভব না হয়”।

আমার পরম সৌভাগ্য আমি তার সান্নিধ্য ও স্নেহের পরশ পেয়েছি। তিনি বলতেন "সুলতান মনসুর মুক্তমতের চর্চাই হল গণতন্ত্র, এর কোনো বিকল্প নেই"।
আজ তার জন্মদিন আর তাই এই দেশপ্রেমিক, গণতন্ত্রমনা ব্যক্তিত্ববান মানুষের জন্য দেশ বাসীর কাছে দুয়া কামনা করছি।
আর প্রত্যাশা করছি এই দেশ, সশস্ত্রবাহিনী, সকল আইন শৃংখলা বাহিনী, প্রশাসন সহ সর্বপরি আপাময় জনসাধারণের জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়া একজন ওসমানীর চিন্তার গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়ীক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সকল দল ও মতের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠাই যেন হয় তার জন্মশত বার্ষিকীর দিপ্ত শপথ। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
জয় হোক বাংলার জনগণের।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিডি-প্রতিদিন/ সালাহ উদ্দীন

আপনার মন্তব্য

up-arrow