Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ৪ অক্টোবর, ২০১৮ ১১:৫৬ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ৪ অক্টোবর, ২০১৮ ১১:৫৮
এক মধ্যবয়স্কা নারীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং আমাদের টানা অভিযান...
ইফতেখায়রুল ইসলাম
এক মধ্যবয়স্কা নারীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং আমাদের টানা অভিযান...
ইফতেখায়রুল ইসলাম

নাম মাকসুদা মায়া, মধ্যবয়সী এই নারী তার জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন কুয়েতে। নিজেকে ও পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে জীবনে একটা সময় খেই হারিয়ে ফেলেন। ইতোমধ্যে স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে চলে যান। মাকসুদা নামের এই নারীকে আমাদের সমাজের শ্রমজীবী নারীদের প্রতিচ্ছবি বলা যেতে পারে।

নারী জীবনে মাতৃত্বের স্বাদ মেলেনি মিসেস মাকসুদার! একাকীত্ব হয়তো এক সময় অতিষ্ঠ করে তোলে তাকে তাই বিদেশ বিভূঁই থেকে দেশে ফেরার সিদ্বান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। বাংলাদেশে এসে ডেমরা এলাকায় জায়গা কিনে নিজের অর্জিত সম্পদ দিয়ে দ্বিতল একটি বাড়ি করেন তিনি। স্বামী, সন্তান ছাড়া মাকসুদা বাসায় বড় ভাইয়ের ছেলেকে তদারকি করার জন্য নিয়োজিত করেন। দিনকাল কেটে যাচ্ছিল একরকম।

একাকী স্বচ্ছল নারীকে আমাদের সমাজে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে এগিয়ে চলতে হয়। এক সময়ে প্রয়োজনের তাড়নায় তাকে বাসা ভাড়া দিতে হয়। অতি সম্প্রতি দুই পরিবার বাসার নীচ তলা ভাড়া নেয়। সময় কেটে যায়। হঠাৎ জীবনে ছন্দপতন, হয়ে যান মৃত লাশ!

১১/০৯/২০১৮ তারিখে আমরা খবর পাই এক বাসা থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। বাসায় গিয়ে মাকসুদা নামের মহিলার মস্তক বিচ্ছিন্ন লাশ আমরা পড়ে থাকতে দেখি। পুরোপুরি ডিকম্পোজড হওয়া মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় অতি দ্রুত। তারপরে নেমে যাই আমরা তদন্তে। বিষয়টি সহজ ছিল না আমাদের জন্য, সন্দেহের তালিকায় প্রাক্তন স্বামী, দত্তক সন্তান, বড় ভাইয়ের ছেলে, নতুন আসা ভাড়াটিয়াদ্বয় কেউই বাদ ছিল না। এত বেশি ঘটনার সন্নিবেশ ঘটেছিল যা প্রতিনিয়ত আমাদের দ্বিধান্বিত করে তুলছিল।

ইতোমধ্যে তদন্তে বেরিয়ে আসে এক ভাড়াটিয়া নিজেদের গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে পাশের ভাড়াটিয়াকে জানিয়ে। ঘটনার দিন বিকেলে হঠাৎ মনে হয় ভাড়াটিয়ার রুম চেক করা প্রয়োজন। চাবিও পেয়ে গেলাম। তালা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতেই প্রথম খটকা লাগে যখন দেখি ডাল ও পেয়াজ মাখানো কিন্তু রান্না করা হয়নি, চার টুকরো রুই মাছের টুকরো রান্না করা কিন্তু খাওয়া হয়নি! কিছু খাতা পেলাম সবগুলো পৃষ্ঠা ছেড়া। খাতার উপরে একটি লেখা ছিল যেটি আমার প্রথম ক্লু এই হত্যাকান্ডে! পরবর্তী সময়ে ইন্সপেক্টর তদন্ত সেলিম কিছু কাগজ পায় যা আমাদের দ্বিতীয় ক্লু!

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই ভাড়াটিয়া সম্পর্কে কেউই তথ্য দিতে পারছিলেন না, এমনকি তার নামটুকুও জানা ছিলনা অন্য কারও। প্রথম ক্লুর উপর ভিত্তি করে আমরা তার নাম জেনে যাই, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মা বাবা ফ্যাশন টেইলার্স ছিল আমাদের পাওয়া প্রথম ক্লু। দ্বিতীয় ক্লু দিয়ে আমরা তার বাড়ির ঠিকানা বের করে ফেলি এবং এরপর চলতে থাকে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেয়ার বিষয়। ইতোমধ্যে ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন আজিজ একেক সময় একেক এলাকায় অবস্থান করতে থাকে। তদন্তের এক পর্যায়ে সন্দেহভাজন আজিজ এর স্ত্রী মিষ্টির অবস্থান পেয়ে যাই আমরা এবং তার সহায়তায় পেয়ে যাই অতি প্রত্যাশিত ভাড়াটিয়া আসামি আজিজকে।

সন্দেহভাজন আসামীর অতীত ইতিহাস ঘেটে সুবিধাজনক কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না! অনেকে তার কাছে টাকা পায়, প্রায়শই মোবাইলের সিম পাল্টে ফেলে সে, সব মিলিয়ে ৫৫-৬০ টি সিম রয়েছে তার! তার স্ত্রীর ভাষ্যমতে সে যা বলে ৯৫ ভাগই মিথ্যা বলে। জিজ্ঞাসাবাদে তার বেশ ভাল ছায়া দেখতে পেলাম। বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়, একটা সময় পর সে ঘটনার সাথে নিজের সংযুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে কিন্তু আরও চারজন ব্যক্তির নাম সে জড়িয়ে নেয়। তার ভাষ্যমতে সেই ৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের প্রত্যেকের সাথে আলাদাভাবে কথা বলে এবং নানা প্রক্রিয়ায় যাচাই করে তাদের সংশ্লিষ্টতা কোনভাবেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যা আমাদের অনেকটাই দ্বিধান্বিত করে দেয় আবারও। কারণ হত্যাকাণ্ডের মত একটি বিষয়ে জড়িত না থেকেও কেউ যদি অল্প সময়ের জন্যও কারাবাস ভোগ করেন সেটি আমাদের বুকে চিনচিন বেদনা জাগায়। সেই জায়গা থেকেই চেক, ক্রস চেক এর পর এটি নিশ্চিত হওয়া যায় সন্দেহভাজন আসামির উল্লেখিত ব্যক্তিগণ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নন।

কিন্তু মূল আসামি তার সিদ্ধান্তে অনড়, বেড়ে যায় খটকা! আবারও জিজ্ঞাসাবাদ এক সময় মূল সন্দেহভাজন আসামি স্বীকার করে নেয় কীভাবে একা একা সে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করে। একই জবানবন্দি সে পুলিশ ও বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রদান করে ০২/১০/১৮ তারিখে।

মূলত ভিকটম মাকসুদার গলায় তিন ভরি ওজনের দুটি সোনার চেইন তাকে লোভী করে তোলে, অন্যদিকে তার বিভিন্নজনের কাছে করা ঋণ তাকে হিংস্র করে দেয় সেই মুহূর্তে। আসামি তার স্ত্রীকে এক আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেয় এবং সকলের অনুপস্থিতিতে নীচ তলা থেকে উপরে যায় রাতে। ভিকটিম মাকসুদার কক্ষে যেয়ে সে হাত থেকে ইচ্ছেকৃত কিছু কয়েন ফেলে দেয়, ভিকটিম যখন কয়েনগুলো মেঝে থেকে তুলছিল তখনি আসামি আজিজ চাপাতি দিয়ে ভিকটিমের গলায় কোপ বসিয়ে মাথা আলাদা করে দেয়। এরপর আরও কিছু কোপ বসিয়ে ভিকটিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে তার গলার চেইন নিয়ে পরদিন তা বিক্রি করে দেয় দুইটি স্বর্ণের দোকানে। যা দোকানিরা কিনেছিল সরল বিশ্বাসে কারণ আসামি বলেছিল তার বউ অসুস্থ তাকে বাঁচাতেই এই চেইন বিক্রি করতে হবে। স্বর্ণের দোকানিদের কাছ থেকে গলিয়ে ফেলা চেইনের আলামত সংগ্রহ করা হয়। উদ্ধার করা হয় ভিকটিমের হারিয়ে যাওয়া মোবাইল, আসামির আত্মীয়ের বাসা থেকে।

০৬/০৯/১১ তারিখ রাতে ভিকটিমকে হত্যা করা হয়। মৃতদেহ গলে গন্ধ ছড়িয়ে যায় ১১/০৯/১৮ তারিখে এরপর থেকে টানা অভিযান চলতে থাকে আমাদের। ডিসি ওয়ারী স্যারের কঠোর ও যথাযথ নির্দেশনা, এডিসি ডেমরা স্যারের ক্যারিশম্যাটিক জিজ্ঞাসাবাদ, এসি ডেমরা জোন'র একনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্টতা ও অভিযান চালানো, ইন্সপেক্টর তদন্ত ডেমরা থানা ও ইনভেস্টিগেশন অফিসার শাহাদাতের দিনরাত নিরলস পরিশ্রমের ফলাফল আমাদের এই অর্জন!

যতটা সহজভাবে এটি বলা হলো ততটা সহজ আসলে তা ছিল না। এখানে অর্জন দুটি ১) মূল আসামিকে গ্রেফতার করে আইনের কাছে সোপর্দ করা এবং ২) ৪ জন নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাওয়া থেকে রক্ষা করা। সেই ৪ জনের করুণ চোখগুলোর কান্না এবং কৃতজ্ঞতা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

ভিকটিম মিসেস মাকসুদাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, তার আসামিকে আইনের হাতে সোপর্দ করে এবং বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। জীবনযুদ্ধে চরম কষ্ট করা নারী মাকসুদা আপনার, আমার যে কারো আত্মীয় হতে পারতো, তাই একটি বিষয় খেয়াল রাখবেন ভাড়াটিয়ার সার্বিক তথ্য নিয়েই তাকে বাসা ভাড়া দেবেন। ভাড়াটিয়াকে যেন আপনার যে কোনো আত্মীয় স্বজন চেনে এতটুকু নিশ্চিত করবেন! নয়তো যে কোনো সময় আপনার মহাবিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে অসাধু চরিত্রের ভাড়াটিয়া।

(তদন্ত ও অভিযানের অনেক বিষয় ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে)

লেখক: সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (ডেমরা জোন)
(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow