Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২১:০৪ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২১:০৫
আহা আমার ‘বেনীআসহকলা’ বন্ধুরা
মেহের আফরোজ শাওন
আহা আমার ‘বেনীআসহকলা’ বন্ধুরা
মেহের আফরোজ শাওন

ছোটবেলায় রোগা পটকা ছিলাম বলে প্যারেডে সুযোগ পাইনি কোনোদিন। চেষ্টা করেছিলাম বেশ কয়েকবার। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বিশাল মাঠে আমাদের পিটি ক্লাস হতো। বীনা আপা (আমরা ডাকতাম পিটি আপা) গম্ভীর মুখ করে আমাদের শরীর চর্চার ক্লাস নিতেন। সেখানে যারা ভালো করতো সেরকম শক্ত পোক্তদের নিয়ে স্কুল ছুটির পরে মাঠে প্যারেডের প্র্যাকটিস হতো। আমি পিটি ক্লাসেই কাহিল হয়ে যেতাম। কোনোদিন প্যারেড প্র্যাকটিসের জন্য মনোনীত হইনি। ছুটির পর যেদিন যেদিন বাসা থেকে গাড়ি আসতে দেরী হতো, আমি মাঠে গিয়ে দাঁড়াতাম। তৃষিত নয়নে প্র্যাকটিস দেখতাম। ধুমধাম শব্দে ড্রাম বাজতো। গলার জোর আছে এমন বন্ধুরা লিডারশিপ পেয়ে যেত। 
“সমাবেশ... আরামে দাঁড়াবে। আরামেএএএ দাঁড়াও।
সমাবেশ... সোজা হবে। সোজাআআআ হও।
সমাবেশ... এগিয়ে যাবে। এগিয়েএএএ যাও।
ডান বাম ডান- ডান বাম ডান... ডান বাম ডান...”
১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগে আগে প্র্যাকটিসের মাত্রা বেড়ে যেত। ড্রাম বাজানো বন্ধুরা ক্লাসরুমের ডেস্কে বাড়ি দিয়ে আর হাতের উল্টোপিঠে তালি দিয়ে প্র্যাকটিস করতো আর আমরা তাল মিলাতাম। কি যে ভালো লাগতো আমাদের! কেমন একটা ‘জোস’ এসে যেত শরীরে, মনে!
১৬ ডিসেম্বর খুব সকালে আমাদের যোগ্য বন্ধুরা স্টেডিয়ামের প্যারেড গ্রাউন্ডে যেত। আর আমরা দূর্ভাগারা টেলিভিশনের পর্দায় দেখতাম। কি সুন্দর যে লাগতো! লং শটে কোনো এক বন্ধুর মুখ হঠাৎ টিভি পর্দায় দেখা গেলে উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠতাম! আর তাদের মধ্যে নিজের উপস্থিতি টের পেতাম।
অবশেষে আমারও সুযোগ হলো! ১৯৯২ সালে আমাদের স্কুল বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে নতুন এক পরিকল্পনা করলো। আমি তখন ক্লাস সেভেনে। বিশাল এক মানব রঙধনু বানাবে ভিকারুননিসার মেয়েরা। সাত রঙের শাড়ি পরে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে অর্ধচন্দ্রের মতো বসে থাকবে। তাদের হাতে থাকবে নিজ নিজ পরনের শাড়ির রঙা পাখা। কিছুক্ষণ পর পর হাতের পাখাগুলো উঁচু করে নাড়বে। দূর থেকে মনে হবে রঙধনু। আমি পিটি আপার কাছে গিয়ে নাম লেখিয়ে ফেললাম। আমার মতো যারা প্যারেডে সুযোগ পায় না তাদের জন্য মহা আনন্দের ব্যপার! আমার ভাগে পড়ল কমলা রঙ। এবার ক্লাসের পর আমরাও স্কুলের মাঠে বসে থাকি। একটু পর পর হাত উপরে উঠিয়ে পাখা নাড়ার রিহার্সেল করি!
১৫ ডিসেম্বর নিজ নিজ শাড়ি হাতে পেলাম সবাই। উফফফ কি উত্তেজনা। শাড়ির রঙ মিলিয়ে আর সবকিছুও যে লাগবে আমার! 
১৬ ডিসেম্বর ভোরে কমলা সাজে স্কুলে পৌঁছলাম। ওমা!!! চারদিকে ঝলমল করছে আমাদের ‘ভিকি’রা..! ‘বেনীআসহকলা’ এই সাতরঙে রঙিন আমরা বাসে চেপে স্টেডিয়ামে রওনা হলাম। গ্যালারিতে বসিয়ে দিলেন আপারা। আমরা একটু পর পর পাখা নাড়ছি আর মাঠের ভেতরকার অন্য সবার অসাধারণ সব পারফর্মেন্স দেখছি! ভারতেশ্বরী হোমস এর বিস্ময়কর উপস্থাপন দেখে বিষম খেলাম! তিন চারবার হাতের পাখা নাড়তে ভুলেও গেলাম! পিটি আপার বকা খেয়ে আবার পাখা নাড়ানাড়ি শুরু হলো।
সকাল ৭ টা থেকে দুপুর ১.৩০... পানি ছাড়া আর কিছু পেটে পড়েনি- মুগ্ধতা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি হয়নি!
আজ ২৬ বছর পর আরেক বিজয় দিবসে আমার পুত্রদের এই গল্প বলতে গিয়ে সবকিছু ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠলো!
আহা আমার ‘বেনীআসহকলা’ বন্ধুরা! তোমাদের জন্য ২০১৮ এর মহান বিজয় দিবস এর শুভেচ্ছা... ভালোবাসা...।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন

আপনার মন্তব্য

up-arrow