Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ২ জুন, ২০১৬ ২৩:৪৫
উচ্চাভিলাষী আয়ের লক্ষ্যবিলাসী বাজেট
রুকনুজ্জামান অঞ্জন

যদি প্রশ্ন করা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে কী আছে যা আগের বাজেটে নেই? উত্তর হবে একসঙ্গে দশটি মেগা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে পৃথক বরাদ্দ, যাকে প্রবৃদ্ধি সঞ্চারে নতুন মাত্রা বলে অভিহিত করা হচ্ছে। আর পেনশনসহ বাজেট কাঠামো সংস্কারের আভাস। একটু ঘুরিয়ে আবার যদি প্রশ্ন করা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে কী এমন আছে যা আগের বাজেটেও ছিল? উত্তর হবে, উচ্চাভিলাষ আর লক্ষ্যবিলাস। অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রাক্কলিত রাজস্ব নিয়ে রয়েছে অর্থমন্ত্রীর উচ্চাভিলাষ, আর প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন নিয়ে রয়েছে লক্ষ্যবিলাস।

এই মিল-অমিলের বাইরে আগের বাজেটের সঙ্গে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের নতুন বাজেটের তেমন কোনো পার্থক্য চোখে পড়েনি খাতভিত্তিক বরাদ্দ বাদে। করারোপের বিষয়েও অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান করহারই বহাল রয়েছে। ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে যে বড় ধরনের উল্লম্ফনের আশা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে তাও হচ্ছে না। তাহলে প্রস্তাবিত বাজেটে যে ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা রাজস্বের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা কীভাবে অর্জন করা হবে, এটিই এখন ‘লাখ টাকার প্রশ্ন’। বাজেটে অর্থমন্ত্রী একটি আয়ের কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন, যা থেকে জানা যাচ্ছে, এনবিআর থেকে আয় আসবে ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। এনবিআর-বহির্ভূত খাত থেকে আসবে ৭ হাজার ২৫০ কোটির টাকা। আর করবহির্ভূত খাত থেকে আয় ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এভাবেই ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকার আয়ের হিসাব মেলানো হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্বের প্রাপ্তি ধরা হয়েছিল প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। নানামুখী চ্যালেঞ্জের কারণে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় তা কমিয়ে সংশোধিত বাজেটে ১ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, সংশোধিত বাজেটের চেয়ে নতুন বাজেটে আরও প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয় করতে হবে। এর মধ্যে শুধু এনবিআরের আয় বাড়াতে হবে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। নতুন ভ্যাট আইন হলে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি আয় করতে পারত এনবিআর। তা আর হচ্ছে না। অন্যদিকে নতুন বাজেটে কিছু ক্ষেত্রে যেমন শুল্কহার বাড়ানো হয়েছে, কমানোও হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। এ অবস্থায় ভ্যাট, আয়কর ও আমদানি শুল্ক মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের যে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১৮ শতাংশ, আগামীতে তাকে ৩৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। গত কয়েক বছরের রাজস্বের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে এটি হবে এনবিআরের জন্য হিমালয়ের চূড়া জয়ের মতোই কঠিন চ্যালেঞ্জ। নতুন বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ লক্ষ্য নির্ধারণেও বিলাসী মনোভাব দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অবশ্য মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছানোর জন্য যে পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা রয়েছে তা ছাড়াও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর লক্ষ্য মেনেই প্রবৃদ্ধির এ হার দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে তা অর্জনের মতো পরিবেশ রয়েছে কিনা তাই এখন প্রশ্ন। চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা করছে সরকার, যা নিয়ে সিপিডি, বিশ্বব্যাংকসহ অনেকেরই সংশয় রয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে তা অর্জন করতে হলেও চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় দশমিক ২ শতাংশ বিন্দু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। কিন্তু এ পরিমাণ জিডিপির জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার তা কোত্থেকে আসবে, তাও একটি বড় প্রশ্ন। অব্যাহত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে দেশে আগে উৎপাদন বাড়াতে যতটুকু মূলধন ব্যবহার করতে হতো, এখন হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। উপরন্তু কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না। এর ওপর বড় বাজেটে ঘাটতির পরিমাণও বড় হয়েছে। ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা ঘাটতি ধরা হয়েছে নতুন বাজেটে, যা আগের মূল বাজেটে ছিল ৮৬ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। প্রত্যাশিত রাজস্ব না আসায় সংশোধিত বাজেটে এ ঘাটতি বেড়ে ৮৭ হাজার ১৬৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আগামী অর্থবছরে একইভাবে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব না পাওয়া গেলে ঘাটতি বাড়বে। সে ক্ষেত্রে বাড়বে অভ্যন্তরীণ তথা ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের পরিমাণ। নতুন বাজেটে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে ৩১ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এখন বাড়তি ঘাটতি মোকাবিলায় যদি সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায় তবে বেসরকারি খাতের ঋণ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ বিষয়টিও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ অবস্থায় সরকারের হাতে রয়েছে সরকারি বিনিয়োগ বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামগ্রিক বিনিয়োগের রাশ ধরে রাখা। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পদ্মা সেতুসহ সরকার যে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের সুফল মিলতেও অন্তত আরও দুই থেকে তিন বছর লাগবে। তাহলে কীভাবে অর্জন হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি? গতকাল ঘোষিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী উত্তর দিয়েছেন, তার মতে, সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ও বাস্তবায়ন বাড়বে। অন্যদিকে নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী আগামী অর্থবছর থেকে সরকারি কর্মচারীরা বেতন-ভাতা দুটোই পাবেন, যা ভোগ ও ব্যয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রপ্তানি বাড়ার আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। প্রবাসে শ্রমিক নিয়োগ বৃদ্ধির ফলে আশা করছেন প্রবাসী আয়ও বাড়বে। সর্বোপরি চলমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলেও আশা করছেন দশম বাজেট পেশ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অর্থমন্ত্রী। গত জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ৮৩ বছরে পা দিয়েছেন। আর এই বয়সেও তিনি অপরিসীম প্রাণশক্তিতে ভর করে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে, মধ্য আয়ের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেছেন তা শুধু সাহসী নয়, দুঃসাহসীই বলতে হবে। এই দুঃসাহসী লক্ষ্যমাত্রার বাজেট শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পারলে তাকে ধন্যবাদ দিতেই হবে।

 




up-arrow