Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৪ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৩ জুন, ২০১৬ ২৩:০৯
বাজেটের চাওয়া পাওয়া
প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রতিবছরের মতো এবারও এ নিয়ে চলছে চাওয়া-পাওয়ার নানা হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে কেউ কেউ বলছেন, এবার অতিরিক্ত কর চাপানো হয়েছে, যা আদায় করা কঠিন হবে। তবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, কষ্টসাধ্য হলেও এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
রুকনুজ্জামান অঞ্জন

একটি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পরপরই এটি নিয়ে শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন পেশাজীবীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ীরা চান ব্যবসাবান্ধব বাজেট, উদ্যোক্তারা চান দেশীয় শিল্পে সুবিধা আর চাকরিজীবীরা দেখেন তাদের বেতন-ভাতা-সুবিধা বাড়ছে কিনা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের চাওয়া থাকে আয়, কর্মসংস্থান বাড়ছে কিনা, জিনিসপত্রের দাম সহনীয় থাকছে কিনা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে কিছু কিছু করে সব খাতের চাওয়া পূরণের চেষ্টা রয়েছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। রয়েছে দেশীয় শিল্পে সুরক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টা।

তবে এই অল্প অল্প প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার শুল্ক বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কেননা প্রস্তাবিত বাজেটের ব্যয় মেটাতে গিয়ে যে বিশালাকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়েছে তা অর্জনের জন্য এ ছাড়া আর উপায়ও ছিল না তার।

ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন এক বছর পিছিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের খুশি করার চেষ্টা হয়েছে বাজেটে। তবে প্যাকেজ ভ্যাটের পরিমাণ বাড়ানোয় এ নিয়ে কিছুটা অসন্তোষও রয়ে গেছে তাদের। যদিও চূড়ান্ত বিচারে বর্ধিত এ ভ্যাটের চাপ জনগণের ওপরই বর্তাবে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক সব সময়ই সরকারের আনুকূল্য পেয়ে আসছে। এবারের বাজেটেও তাদের জন্য করপোরেট করহার ৩৫ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণে এ খাত থেকে কিছু রিটার্ন নেওয়ার চিন্তাও ছিল অর্থমন্ত্রীর। সেই চিন্তা থেকে তিনি রপ্তানি খাতের উেস কর বাড়িয়ে দেড় শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি নিয়ে অবশ্য রপ্তানিকারকদের কিছুটা উষ্মা দেখা যাচ্ছে। তবে পোশাক খাতের কমপ্লায়েন্স অর্জনে অগ্নিনির্বাপক উপকরণে শুল্ক প্রত্যাহার বহাল থাকায় পোশাকশ্রমিকদের সাধুবাদ পেতে পারেন অর্থমন্ত্রী। দেশীয় শিল্পে কিছু সুরক্ষা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। দেশের রাসায়নিক শিল্প খাতকে উৎসাহিত করতে কাগজ, সিরামিক ও রাবারশিল্পের কিছু উপকরণে শুল্ক কমানো হয়েছে। নির্মাণ খাত চাঙা রাখতে এ খাতে ব্যবহূত বিভিন্ন উপকরণ হোল্ডার স্টোন, ক্রাশ স্টোন, বার, অ্যাঙ্গেল, ফ্লাই অ্যাশসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডার ও বায়ো গ্যাস প্লান্টের উপকরণে শুল্ক কমানো হয়েছে। এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহূত উপকরণের শুল্কছাড় অব্যাহত রাখায় বেসরকারি খাতে অবকাঠামো সুবিধা বাড়বে। ফলে বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পরিবহন খাতের সুবিধায় মোটরসাইকেল সংযোজন শিল্প ও হিউম্যানহলার তৈরিতে ব্যবহূত মূলধনী পণ্যে শুল্কছাড় রয়েছে। বাজেটে কৃষি খাত তথা কৃষককে কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেছেন অর্থমন্ত্রী। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে ব্যবহূত বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ককর অব্যাহতি বহাল রয়েছে। চাল আমদানিতে শুল্কহার ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ প্রস্তাব করায় ধান উত্পাদনে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে এসব পণ্যের শুল্কছাড়ে অব্যাহতি বহাল রাখা হয়েছে। তবে মোবাইল ফোনের সিম ব্যবহার করে যেসব সুবিধা পাওয়া যায় তার ওপর সম্পূরক শুল্ক ৩ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মোবাইল ব্যবহারে ব্যয় বাড়বে। দেশে ছাত্র, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মোবাইল ফোন ও সিম ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা নেওয়ার প্রবণতা বেশি। ফলে এ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মাঝে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও বাজেটে বিশেষ সুযোগ রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী এতদিন শুধু বর্ধিত মূল বেতন পেয়ে আসছিলেন জনপ্রশাসনের কর্মচারীরা। নতুন বাজেট কার্যকর হওয়ার দিন অর্থাৎ এ জুলাই থেকে তারা বর্ধিত ভাতাও পেতে থাকবেন। বেসরকারি চাকরিজীবীদের নগদ কিছু না দিলেও ভবিষ্যতে তাদের কিছু দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ নিয়ে কাজও করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী বাজেট থেকে পাইলট ভিত্তিতে এর কার্যক্রম শুরু হতে পারে। বাজেট যদি হয় একটি বছরের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে এভাবেই সব খাতে কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অবশ্য এর বিনিময়ে অর্থমন্ত্রীরও কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। তার চাওয়া হচ্ছে, বাজেটের প্রস্তাব অনুযায়ী কর ও ভ্যাট দিয়ে সহায়তা করবেন ব্যবসায়ীরা। আর এ চাওয়া পূরণ হলে তবেই অর্থবছর শেষে প্রস্তাবিত বাজেটের চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটি সমন্বয় করতে পারবেন তিনি।




up-arrow