Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৪ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৩ জুন, ২০১৬ ২৩:৩০
লেখকের অন্য চোখ
দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল ট্যুরটা
সমরেশ মজুমদার
দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল ট্যুরটা

গল্পটা শুনেছিলাম এক ক্রিকেটার বন্ধুর কাছে। খেলোয়াড় হিসেবে সে রাজ্যস্তরে বেশ কয়েক বছর প্রথম সারিতে ছিল। রঞ্জিতে কয়েকটা সেঞ্চুরি আছে। প্রথমত বাংলার ক্রিকেট মহলের সঙ্গে জড়িত। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি তো বিয়ের পর দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাইতে বাংলা দলের সঙ্গে খেলতে যেতে প্রায়ই। তোমার বউ সঙ্গে যেতে চাইত না?

সে  মাথা নেড়েছিল, — না, হাঁপিয়ে উঠবে। পৌঁছানোর পরের দিন প্র্যাকটিস, সন্ধ্যার পরই ডিনার খেয়ে শুয়ে পড়তে হতো। তারপর ম্যাচ, মানে সকালে মাঠে গিয়ে সন্ধ্যায় হোটেলে ফেরা, ম্যাচ শেষ হলেই কলকাতায় চলে আসা। নো সাইট সিয়িং, নো মার্কেটিং। আর তিন দিন ধরে গ্যালারিতে বসে ক্রিকেট দেখার মতো বোরিং কাজ করার বাসনা ওর হয়নি।

—এই যে ওর সঙ্গে থাকতে না, অশান্তি হতো না?

—প্রথম প্রথম হতো। শেষে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। হয়তো ভেবেছিল স্বামী ইন্ডিয়ার হয়ে টেস্টে খেলবে। তা ছাড়া তখন বউ নিয়ে খেলতে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল না। বিদেশি টিমে কেউ কেউ বউ নিয়ে আসত বটে কিন্তু ইন্ডিয়ার ক্রিকেট বোর্ড তখন মনে করত বউ সঙ্গে থাকলে খেলোয়াড় মন দিয়ে খেলতে পারবে না।

—কিন্তু গাভাস্কার তো স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতায় খেলতে এসেছিলেন।

—তখন হাওয়া বদলাতে শুরু করেছে।

—এই যে এখন। বিদেশি টিমগুলোতে প্লেয়ারদের সঙ্গে তাদের স্ত্রীরাও এসেছিলেন, এতে সুবিধা হচ্ছে, না অসুবিধা?

—অসুবিধাগুলো কমে গেছে। রোজ দেশে ফোন করে বউকে ‘আই লাভ ইউ’ বলতে হচ্ছে না। যেসব কাজ নিজে করতে হতো তা বউ করে দিচ্ছে। বিরহ-টিরহ হচ্ছে না।

—কিন্তু স্বামীরা যখন প্র্যাকটিস করে, মাঠে খেলে, তখন নিশ্চয় ওরা বোর হয়ই?

—একদম না। বউগুলো নিজেদের মধ্যে দল তৈরি করে নেয়। নতুন শহরে এসে দ্রষ্টব্য স্থানগুলো দেখে বেড়ায়। তারপর রয়েছে শপিং, সময় কাটানোর জন্য যার তুলনা নেই। হয়তো প্লেন ভাড়াটা দিতে হয়, ফাইভ স্টারে থাকা-খাওয়া-ঘোরা তো বিনা পয়সায়।

—এই খেলোয়াড়দের স্ত্রীরা নিশ্চয়ই ক্রিকেট বোঝেন?

—বোঝা তো উচিত। বলা হয়, স্ত্রী সঙ্গে থাকলে খেলোয়াড়রা একাকিত্বে ভোগে না। তাদের মনে হয় সংসারেই আছে। ফলে খেলায় পুরোপুরি মন দিতে পারে।

—কিন্তু এই যে কাগজে পড়ি, খেলোয়াড়রা ভোর অবধি নাইট ক্লাবে হুই-হুল্লোড় করে, মারপিটও। তাদের স্ত্রীরা আপত্তি করেন না?

বন্ধু হেসে ফেলল, যারা ওসব করে তারা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসে না।

বললাম, মহিলারা বেশ আছেন। স্বামীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া, আফ্রিকা বা ইংল্যান্ডে প্রতি বছর বেড়াতে যান।

—এ ব্যাপারে একটা গল্প আছে। একটা বিদেশি টিম এসেছে খেলতে। তাদের দশজন খেলোয়াড়ের মধ্যে ছয়জন স্ত্রী, আর চারজন বান্ধবী নিয়ে এসেছে। ব্যবহারে কোনো পার্থক্য নেই। ওরা বান্ধবীকে প্রায় স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে নিয়ে আসে। তা একদিন দিল্লিতে খেলা চলছিল। টেস্টের শেষ দিন। পরদিন দল দেশে ফিরে যাবে। দশজন মহিলা চা-বিরতিতে গল্প করছিলেন। একজন, যিনি ক্যাপ্টেনের স্ত্রী, বললেন— দেখতে দেখতে ট্যুরটা শেষ হয়ে গেল। কাল থেকে আবার সেই আগের জীবন।

ওপেনিং ব্যাটসম্যানের স্ত্রী বললেন, ঠিক বলেছ। ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়।

স্পিনারের স্ত্রী হাসলেন, মন খারাপ করার কী আছে? আড়াই মাস পরেই তো সাউথ আফ্রিকার ট্যুর। এবার গিয়ে জঙ্গলগুলো চুটিয়ে দেখে নেব।

ক্যাপ্টেনের স্ত্রী মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ রে। আমি আগে একবার দেখেছি, কিন্তু বার বার দেখলেও পুরনো হবে না।

উইকেটকিপারের বান্ধবী এই প্রথমবার ট্যুরে এসেছেন। মাত্র চার মাসের প্রেম। বললেন, ফ্যান্টাস্টিক। সাউথ আফ্রিকায় যাওয়ার ইচ্ছা অনেক দিনের। নাইরোবিতে খেলা থাকবে নিশ্চয়?

ক্যাপ্টেনের স্ত্রী বললেন, ওমা ! ওখানে তো থাকবেই।

ফাস্ট বোলারের বান্ধবী চুপচাপ শুনছিলেন। বললেন, কী জানি কী হবে!

উইকেটকিপারের বান্ধবী জিজ্ঞাসা করলেন, এ কথা বলছ কেন?

ফাস্ট বোলারের বান্ধবী বললেন, দ্যাখো, আমি এসেছি ওর বান্ধবী হিসেবে। এমন তো হতে পারে, সামনের মাসেই আমাদের বন্ধুত্ব ভেঙে গেল। তখন?

উইকেটকিপারের বান্ধবী বললেন, এমন তো হতে পারে ভেবে আমি ওকে না জানিয়ে কনসিভ করেছিলাম। জানার পর খুব গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল কিছুদিন।

ফাস্ট বোলারের বান্ধবী বললেন, দূর! ওই বাচ্চা দেখিয়ে সম্পর্ক বাঁধিয়ে রাখা যায় নাকি?

চার বান্ধবী উঠে গেলে ক্যাপ্টেনের স্ত্রী কপালে এবং বুকে আঙ্গুল ছোঁয়ালেন, থ্যাঙ্ক গড। আমরা বিবাহিত। নেক্সট ট্যুরে না নিয়ে গেলে ডিভোর্স করব। তখন কমপেনসেশন দেওয়ার ভয়ে হাতে-পায়ে ধরে নিয়ে যাবে। হুঃ!

ক্রিকেটার বন্ধু হাসল, কিন্তু মহিলার নেক্সট ট্যুরে যাওয়া হয়নি।

সে কী? কেন? খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য শুধু ক্যাপ্টেনশিপ থেকে বাদ নয়, দল থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ওর স্বামীকে।




up-arrow