Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৫ জুন, ২০১৬ ২৩:২৬
যে কারণে টার্গেটে বাবুলের পরিবার
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে জঙ্গি দমনে বিশেষ ভূমিকা রাখা চৌকস পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন এসপি বাবুল আক্তার। অপরাধ দমনে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক, আইজিপি ব্যাজ, বাংলাদেশ পুলিশ মেডেলসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মর্যাদাকর পদক। নগরীর সদরঘাটের থ্রিপল মার্ডার, বায়েজিদ বোস্তামীর ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেমকে খুনের পেছনে জঙ্গি সম্পৃক্ততার ক্লু উদ্ঘাটন এবং খোয়াজনগর ও হাটহাজারীর আমানবাজারের জঙ্গি আস্তানা আবিষ্কার অভিযানে নেতৃত্বে দেন বাবুল আক্তার। তার একের পর এক সিরিজ অভিযানের ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে চট্টগ্রামের জঙ্গি নেটওয়ার্ক। ফলে জঙ্গিদের টার্গেটে পরিণত হন বাবুল আক্তার ও তার পরিবার। বিভিন্ন সময় বাবুল আক্তার নিজের এবং পরিবার-পরিজনের জীবন নিয়ে শঙ্কার কথা বলতেন। গতকাল তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে বাবুল আক্তারের সেই শঙ্কাই সত্যিতে পরিণত হলো। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকলেও জঙ্গি দমনে অনড় ছিলেন বাবুল আক্তার। সহকর্মী থেকে শুরু করে সংবাদকর্মী— কারও সঙ্গে একান্তে কথা বললেই তিনি তার ও পরিবারের নিরাপত্তার শঙ্কা নিয়ে বলতেন। খুনের পর স্ত্রীর লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে দেখতে এলে সেখানে উপস্থিত পাঁচলাইশ থানার ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদকে উদ্দেশ্য করে বাবুল আক্তার বলেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম তারা (জঙ্গিরা) আমার ও আমার পরিবারের পিছু ছাড়বে না। বলার পরও কেন আমার পরিবারকে দেখে রাখা হয়নি।’ এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে সাহসী কাজ করে যাচ্ছেন বাবুল আক্তার। জঙ্গিদের আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছেন এ কর্মকর্তা। তাই পুলিশি অব্যাহত অভিযান বিভ্রান্ত করতে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। বাবুল আক্তারের এক সময়ের সহকর্মী সন্তোষ চাকমা বলেন, প্রায় সময় স্যার (বাবুল আক্তার) পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। তিনি বলতেন, আমাকে মারতে না পারলেও জঙ্গিরা স্ত্রী-সন্তানের ক্ষতি করতে পারে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর সদরঘাট থানাধীন শাহ করপোরেশনের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ছিনতাই ও থ্রিপল মার্ডার, ৪ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন বাংলাবাজার এলাকায় ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেমকে খুন, ৫ অক্টোবর কর্ণফুলী থানা এলাকায় অভিযান চলাকালে পুলিশের ওপর গ্রেনেড হামলা এবং জঙ্গি আস্তানা এবং ২৭ ডিসেম্বর হাটহাজারীর আমানবাজারে জঙ্গি আস্তানা আবিষ্কার অভিযানের নেতৃত্ব দেন বাবুল আক্তার। তার টানা অভিযানের ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে চট্টগ্রামের জঙ্গি নেটওয়ার্ক। ফলে জঙ্গিদের টার্গেটে পরিণত হন বাবুল আক্তার।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন মিতু : জঙ্গি দমনে স্বামী বাবুল আক্তারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ের নানামুখী হুমকির কারণে উদ্বিগ্ন ছিলেন দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত মাহমুদা খানম মিতু। উদ্বেগের কথা বিভিন্ন সময় প্রতিবেশীদের কাছে বলেছেন তিনি। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে জিইসি মোড়ের বাসা পরিবর্তনেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু বাসা পরিবর্তনের আগেই খুন হতে হলো তাকে। শারমিন আকতার নামে এক প্রতিবেশী বলেন, তিনি বেশ কয়েকবার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কয়েক দিন আগে বলেছিলেন, বাসা সবাই চিনে গেছে। বাসা বদলাতে হবে।

কে দিয়েছিল সেই এসএমএস? : বাবুল আক্তারের ছেলে আক্তার মাহমুদ মাহি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের ছাত্র। অন্যান্য দিন সকাল ৮টায় ক্লাস শুরু হলেও শনিবার রাতে এক এসএমএসের সূত্রে মিতু জানতে পারেন রবিবার স্কুলে অ্যাসেম্বলি হবে। তাই নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগেই ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে বের হন মিতু। পথে তাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়, এ ধরনের নির্দেশনামূলক কোনো এসএমএস দেওয়া হয়নি। তাই এই এসএমএস কারা দিয়েছে তা তদন্ত করা হচ্ছে।

মিতুও খুন হন অভিন্ন কায়দায় : অভিন্ন কায়দায় খুন হয়েছেন চট্টগ্রামে জঙ্গি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ও পুলিশ সদর দফতরে কর্মরত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গিদের হাতে যেসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সেসব খুনের সঙ্গে মিতু হত্যার মিল পেয়েছে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অন্যান্য এলাকায় খুনের ক্ষেত্রে প্রথমে ধারালো অস্ত্র এবং পরে গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করা হয়েছে। মিতু হত্যাকাণ্ডেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে দুর্বৃত্তরা। পালিয়ে যাওয়ার সময়ও ব্যবহার করে মোটরসাইকেল এবং কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেয় তিনজন।পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, টাঙ্গাইলে দর্জি নিখিল চন্দ্র জোয়ার্দার, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সন্তগৌরীয় মঠের অধ্যক্ষ যজ্ঞেশ্বর রায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকী, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেমকে খুন, আশুলিয়ায় পুলিশ হত্যা, দিনাজপুরে ইতালীয় এক পাদ্রীকে হত্যা চেষ্টার ঘটনার সঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডের অবিকল মিল রয়েছে।

সিএমপির উপকমিশনার (উত্তর) পরিতোষ ঘোষ বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে হত্যাকারীরা তিনজনই ছিল। মোটরসাইকেল নিয়ে তারা আগে থেকেই ওই এলাকায় অবস্থান করছিল বলে ভিডিও দেখে মনে হয়েছে।




up-arrow